তথ্য জানার তথ্য

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২২, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ

মো. তৌহিদুজ্জামান:


এমন একটা পরিস্থিতি কল্পনা করুন, যেখানে আপনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিষয়টি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্যই আপনার কাছে নেই। এ অবস্থায় আপনার পক্ষে কোনোভাবে যৌক্তিক কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া কি সম্ভব? চোখ বন্ধ করেই বলা যায় অসম্ভব। এটা শুধু আপনার জন্য অসম্ভব তাই নয় বরং পৃথিবীর কারোও পক্ষেই তা সম্ভব নয়।

জীবনের প্রতিটি ক্ষণেই আমরা আমাদের সমস্যা বা সম্ভাবনা বিষয়ে অসংখ্য সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি। বিষয়গুলো যত ক্ষুদ্রই হোক, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে আমরা এ সংক্রান্ত সম্ভাব্য সকল তথ্য যাচাই করি। যাচাইকৃত তথ্যের সঠিকতার উপর নির্ভর করে আমাদের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ও ফলপ্রসুতা। বস্তুত তথ্য ছাড়া জ্ঞানপূর্ণ সিদ্ধান্ত কল্পনাতেও আসে না।

ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে তথ্য এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তথ্যের স্বাধীনতা ও সেই তথ্যে অভিগম্যতাকে বিশ্বব্যাপী মৌলিক মানবাধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটা আসলে মৌলিক মানবাধিকারের চাইতেও বেশি কিছু, কারণ অন্য সকল মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যও তথ্যে প্রবেশাধিকার একান্ত অপরিহার্য। তাই জাতিসংঘের মতে, “তথ্য অধিকার হলো অন্য সকল স্বাধীনতার কষ্টিপাথর।’’

তথ্য অধিকার আমাদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার উপভোগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার উপভোগেরও সুযোগ তৈরি করে দেয়। তথ্যে অভিগম্যতা আইনের শাসনের রক্ষাকবচ, সুশাসনের হাতিয়ার। তথ্য-উপাত্ত ছাড়া সরকার যেমন কোনো বিষয়ে নাগরিককে অবহিত করতে পারে না, তেমনি নাগরিকও তথ্য ছাড়া সরকারকে জবাবদিহি করতে সক্ষম হয় না। নাগরিকের আস্থা ও অংশগ্রহণ বাড়াতে তথ্যে তার প্রবেশাধিকার একান্ত আবশ্যক।

এসব বিবেচনায় ২০১৫ সালে বিশ্বের ১৯৩ টি দেশের নেতারা ২০৩০ সালের মধ্যে তথ্যে নাগরিকের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে সম্মত হয়েছেন। এটিই জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ঠের ১৬.১০ লক্ষ্যমাত্রা। এ লক্ষ্যমাত্রাতে বলা হয়েছে, সদস্য দেশগুলো জাতীয় আইন ও আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী জনসাধারণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত ও মৌলিক স্বাধীনতার সুরক্ষা প্রদান করবে। লক্ষ্যটি বাস্তবায়ন পরিমাপের প্রস্তাবিত বৈশ্বিক সূচক (১৬.১০.২) অনুসারে জনসাধারণের তথ্যে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘভূক্ত দেশসমূহকে সাংবিধানিক, বিধিবদ্ধ বা নীতিগত নিশ্চয়তা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

খুশির বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ এ লক্ষ্য অনেক আগেই অর্জন করে ফেলেছে। ‘তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’ পাসের মাধ্যমে সরকার নাগরিককে আবশ্যিকভাবে তথ্য প্রাপ্তির শক্তিশালী আইনি ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। এ আইন অনুসারে, আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে, কর্তৃপক্ষের নিকট হতে প্রত্যেক নাগরিকের তথ্য লাভের অধিকার থাকবে এবং কোনো নাগরিকের অনুরোধের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাকে তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য থাকবে। এখানে কর্তৃপক্ষ বলতে দেশের ৮টি গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান ব্যতীত সকল সরকারি এবং সরকারি বা বিদেশী অর্থায়নে সৃষ্ট বা পরিচালিত সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হয়েছে।

এমন একটি নাগরিক বান্ধব আইনের বয়স ১৩ বছর অতিক্রান্ত হলেও তথ্যের বিশাল চাহিদার তুলনায় এ আইনের অধিনে তথ্য প্রাপ্তির আবেদন সংখ্যা এখনও কিন্তু বেশ কম। তথ্য অধিকার বিষয়ক জরিপগুলোতে উঠে এসেছে, ‘তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’ বিষয়ে সমাজের একটা বড় অংশের মানুষ এখনও অজ্ঞ। অথচ আইনটিতে নাগরিকের তথ্য প্রাপ্তির আবেদন প্রক্রিয়াটি খুবই সহজ করা হয়েছে। অল্প কিছু তথ্য মনে রাখলেই যে কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করে কাঙ্খিত তথ্য পাওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চাইতে আপনার প্রথম পদক্ষেপ হবে, আপনার কোন তথ্যটি প্রয়োজন সেটি ঠিক করা। এ তথ্যটি কোন কর্তৃপক্ষের (অফিসে) নিকট আছে সেটা জানতে হবে। এখন তথ্য প্রাপ্তির আবেদন ‘ফরম-ক’ পূরণ করে আপনাকে সংশ্লিষ্ট অফিসে সরাসরি বা ডাকযোগে জমা দিতে হবে। আপনি ই-মেইলেও আবেদন প্রেরণ করতে পারেন। এ ফরম তথ্য কমিশন (www.infocom.gov.bd), বাংলাদেশ ফরমস (www.forms.gov.bd) ও অন্য অনেক অফিসের ওয়েব সাইটে পাওয়া যাবে। অনেক অফিসেই এ ফরম রাখা থাকে, আর জেলা তথ্য অফিসে আপনি অবশ্যই এ ফরম পাবেন।

প্রত্যেক অফিসে তথ্য প্রদানের জন্য একজন কর্মকর্তা নিযুক্ত করা আছে, যাকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলা হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম আপনি সংশ্লিষ্ট অফিসের ওয়েবসাইট থেকে দেখে নিতে পারেন। অফিসের সিটিজেন’স চার্টার বা অন্য কোন প্রকাশ্য স্থানেও সেটি লেখা থাকে। তাছাড়া অফিসের কারো কাছে জিজ্ঞাসা করেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম জানা সম্ভব।

আবেদন ফরমের বরাবরে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম ও পদবী এবং দপ্তরের নাম ও ঠিকানা লিখুন। ১নং অংশে আপনার নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, বর্তমান ঠিকানা ও স্থায়ী ঠিকানা লিখুন। ফ্যাক্স, ই-মেইল, টেলিফোন বা মোবাইল নম্বর থাকলে লিখতে পারেন। ২নং অংশে আপনার চাহিত তথ্যটি সুনির্দিষ্ট করে লিখুন। প্রয়োজনে অতিরিক্ত কাগজ ব্যবহার করতে পারেন। অনেক সময় এমনভাবে তথ্য চাওয়া হয় যে, কর্তৃপক্ষ যাচিত তথ্য নির্দিষ্ট করতে পারে না এবং তথ্য প্রদানে বিরত থাকে। একটি বিস্তৃত পরিসরে কে কে, কখন কখন, কী কী এ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করলে যাচিত তথ্য নির্দিষ্ট করা অসম্ভব হয়ে পড়ে-এগুলো মাথায় রাখুন। কোন পদ্ধতিতে আপনি তথ্যটি পেতে ইচ্ছুক সেটা লিখবেন ৩নং অংশে। ছাপানো, ফটোকপি, লিখিত, ই-মেইল, ফ্যাক্স, সিডি বা অন্য কোনো পদ্ধতি আপনি উল্লেখ করে দেবেন। মনে রাখতে হবে তথ্য অধিকার আইনে তথ্য প্রাপ্তির জন্য মূল্য পরিশোধ করতে হয়। সাধারণভাবে এ৪/এ৩ সাইজের প্রতি পৃষ্ঠার মূল্য ২ টাকা হারে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে তথ্য সরবরাহের প্রকৃত মূল্য পরিশোধ করতে হবে। ৪নং অংশে তথ্য গ্রহণকারীর নাম ও ঠিকানা এবং ৫নং অংশে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সহায়তাকারীর নাম ও ঠিকানা লিখতে হবে। আবেদন ফরমের নিচে আপনার স্বাক্ষর ও তারিখ দিন।

তথ্য অধিকার আইনে একটি কর্তৃপক্ষের নোট সীট বাদে সকল তথ্যবহ বস্তুকে তথ্য হিসেবে অভিহিত করা হলেও বেশ কিছু তথ্য প্রদান কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়। যেমন যে তথ্য প্রকাশে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অখ-তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি সৃষ্টি হতে পারে বা বিদেশী দেশ, জোট বা সংগঠনের সাথে সম্পর্ক ক্ষুন্ন করতে পারে বা বিদেশী সরকারের নিকট থেকে প্রাপ্ত গোপনীয় তথ্য, কপিরাইট ক্ষুন্ন করে, কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত করে, ব্যক্তির জীবন বা শারীরিক নিরাপত্তা বিপদাপন্ন করে, ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা ক্ষুন্ন করে, জনগণের নিরাপত্তা বিঘিœত করতে পারে, প্রচলিত আইন প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত করে বা অপরাধ বৃদ্ধির করণ হতে পারে, আদালতে বিচারাধীন বিষয় এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা আছে বা আদালত অবমাননা হতে পারে, তদন্ত প্রক্রিয়া ও অপরাধীর গ্রেপ্তার ও শাস্তিকে প্রভাবিত করে, ব্যক্তির আইন দ্বারা সংরক্ষিত গোপনীয় তথ্য, ক্রয় কার্য বা সে বিয়য়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে উক্ত বিষয়ক তথ্য, পরীক্ষার প্রশ্ন ও প্রদত্ত নম্বর সম্পর্কিত আগাম তথ্য এবং এমন আরও কিছু তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়নি। এমন তথ্য না চাওয়াই ভালো।

আবেদন জমা দানের সময় সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে একটি প্রাপ্তি স্বীকার নিন, করণ তথ্য অধিকার আইনে আপনার চাহিত তথ্য কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট সময়ে প্রদানে বাধ্য। এক আবেদনে আপনি যদি একটি মাত্র অফিসের (তথ্য প্রদানকারী ইউনিট) তথ্য চান, তবে আবেদনের ২০ কার্যবিদসের মধ্যে কর্তৃপক্ষ আপনাকে তথ্য প্রদান করবে, আর একসাথে একাধিক অফিসের তথ্য চাইলে কর্তৃপক্ষ তথ্য দিতে আরও ১০ কার্যদিবস বেশি সময় পাবে। আপনার যাচিত তথ্য দেওয়া সম্ভব না হলে কর্তৃপক্ষ আপনাকে আবেদনের ১০ কার্যদিবসের মধ্যে অপরাগতার কারণ জানিয়ে নোটিশ প্রদান করবে। কর্তৃপক্ষের নিকট যাচিত তথ্য প্রস্তুত থাকলে আপনাকে ৫ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্যের মূল্য জমা দেওয়ার নোটিশ পাঠাবে। যাচিত তথ্য কারো জীবন-মৃত্যু অথবা কারাগার থেকে মুক্তি বা গ্রেপ্তার বিষয়ক হলে আপনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রাথমিক তথ্য পেয়ে যাবেন।

উল্লিখিত সময়ে আপনি যদি তথ্য বা তথ্য সরবরাহে অপরাগতার নোটিশ না পান অথবা প্রাপ্ত তথ্য আপনার বিবেচনায় ভুল বা অসম্পূর্ণ মনে হয়, তবে আপনার আপিলের সুযোগ রয়েছে। তথ্য প্রদানের নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হলে বা তথ্য প্রদান বিষয়ক কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়। আপিল করবেন যে অফিসে তথ্য চেয়েছেন সে অফিসের পরবর্তী উর্ধ্বতন অফিসের অফিস প্রধানের নিকট। যেমন উপজেলা পর্যায়ের কোনো অফিসে আপনি তথ্য চেয়ে আবেদন করলে আপিলের সময় ঐ অফিসের যে জেলা অফিস আছে তার অফিস প্রধান বরাবর আপিল করবেন।

আপিলেও যদি আপনি সন্তুষ্ট না হন তবে সবশেষে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করতে পারবেন। অভিযোগের ক্ষেত্রে আপিলের সিদ্ধান্ত প্রাপ্তি বা অপিল নিষ্পত্তির সময় শেষ হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যেই অভিযোগ করতে হবে। অপিল ও অভিযোগের জন্য পৃথক ফরম রয়েছে। এ ফরমগুলো তথ্য প্রাপ্তির আবেদন ফরম পূরণের মতোই পূরণ করতে হবে।

তথ্য প্রাপ্তির অনুরোধ ছাড়াই তথ্য অধিকার আইন আপনাকে তথ্য প্রাপ্তির সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এ আইনে কর্তৃপক্ষের জন্য স্বপ্রণোদিতভাবে তথ্য প্রকাশের নির্দেশনা রয়েছে। জনগণের তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে প্রতিটি সরকারি অফিস এখন তার ওয়েবসাইটে অফিস পরিচিতি, কর্মকর্তা-কর্মচারিদের তথ্যাদি ও তাদের দায়িত্ব, প্রদত্ত সেবাসমূহ ও তা পাওয়ার পদ্ধতি, বিভিন্ন আইন, আদেশ, নোটিশ, বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি, বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা, বাস্তবায়িত কার্যক্রম, বার্ষিক প্রতিবেদন এমন অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করছে। ওয়েব সাইট থেকে যে কেউ সহজেই এসব তথ্য জেনে নিতে পারেন। অফিসের নোটিশ বোর্ড, বিভিন্ন প্রকাশনা থেকেও পেতে পারেন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

উন্মুক্ত তথ্যের চাপে নানা অসঙ্গতি দূরীকরণে কর্তৃপক্ষের তৎপরতা আমাদেরকে আশান্বিত করে। তথ্য শক্তিহীনকে শক্তি যোগায়, বাকশূন্যকে দেয় জোরালো কণ্ঠস্বর। জনগণের তথ্য প্রাপ্তি ও সুশাসনের মধ্যে ইতিবাচক সহসম্পর্ক বিদ্যমান। নিজে তথ্য জানুন, অপরকে তথ্য জানার তথ্য (উপায়) জানান। তথ্য প্রযুক্তির যুগে জনগনের তথ্য অধিকার নিশ্চিত হোক।
লেখক: উপপ্রধান তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, রাজশাহী