তানোরে অজোপাড়াগাঁয়ে ইউসুফের ব্যতিক্রম সংগ্রহশালা ও বীজ ব্যাংক

আপডেট: জানুয়ারি ৯, ২০২০, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ

লুৎফর রহমানম, তানোর


তানোরে ইউসুফের ব্যতিক্রম সংগ্রহশালা ও বীজ ব্যাংক-সোনার দেশ

খুব বেশি দিনের কথা নয় আজ থেকে ৫০ বছর আগে গ্রামবাংলার বিভিন্ন খেলা-ধুলাই বিজয়ীদের মাঝে কাঠের উপর চাঁদী অথবা পিতলের টুকরা বসিয়ে সিলকাপ নাম দিয়ে তা পুরস্কার হিসেবে দেয়া হত। এই প্রজন্মের লোকেরা কখনো কি অনুমান করতে পারেন, শতশত বছর আগে মানুষ পাথর কেটে কিভাবে থালাবাসুন তৈরি করে তা ব্যবহার উপযোগি করে তুলত।
একদিন কলের গান মানুষের চিত্তবিনোদনের খোরাক জোগাত। বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তির যুগে নতুন প্রজন্ম কি জানে, সেই কলের গান যন্থটি দেখতে কেমন ছিল। অতীতের সব রাজা-বাদশারা কি ধরণের জিনিষপত্র ব্যবহার করতেন। এসব প্রশ্নের উত্তরে হয়তো অনেকেই বলতে পারেন হ্যাঁ জানি, ইতিহাস বইয়ে পড়েছি বা শহরের কোন জাদুঘরে দেখেছি। কিন্তু যখন কেউ অজপাড়াগাঁয়ের বহু মূল্যমান প্রত্নতাত্তিক নিদর্শন আর ঐতিহ্যবাহী নানা বস্তু নিয়ে একটা সংগ্রহশালা গড়ে তোলে, তখন তা দেখতে আপ্লুত হতে হয়।
তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউপির দুবইল গ্রামের ইউসুফ আলী মোল্লা তেমনই একজন মানুষ। তিনি পড়াশনা তেমন করতে পারেননি। মাত্র অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। নিজের সেই সল।পতা ঢাকতে বেছে নেন ব্যতিক্রমি এক পথ।
১৯৬৪ সালের এই ইউসুফ আলী মোল্লার পিতা মৃত আবদুর রহমান মোল্লা দুবইল গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পিতার প্রতিষ্ঠিত স্কুলের প্রথম ছাত্র তিনি ছিলেন। ওই স্কুলেই প্রাথমিক শিক্ষার পাঠদান শেষ করে চাঁদপুর জুনিয়ার হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের ইতি টানেন। এরপর বাবার সঙ্গে জমিতে হালচাষ করার পাশাপাশি দুঃখী মানুষের পাশে সব সময় তিনি দাঁড়াতেন।
বিপদগ্রস্ত যেকোন মানুষের জন্য তার পিতার বাড়ির দরজা সব সময় খোলা থাকতো। মানুষের প্রতি এমন ভালোবাসায় ইউসুফের পিতা নিজের ৪০ বিঘা জমির মধ্যে ২৫ বিঘাই বিক্রি করে দেন। তিনি তার পিতার পথ অনুসরণ করে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ১৫ বিঘা জমির ১২ বিঘাই বেচে দেন।
অবশেষে তিনি ছেলেকে নিয়ে মানুষের বাড়িতে কাজ করে তাকে সংসার চালাতে হয়েছে। কিন্তুু এসব ব্যস্থতার কোন কিছুই দমাতে পারিনি ইউসুফ মোল্লাকে। পড়াশোনা বেশি দূর করতে না পারা ইউসুফের প্রিয় বিষয় ইতিহাস ও ভূগোল। ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা তাকে আলোকিত করত, প্রণোদনা জোগাত। ছোটবেলা থেকেই শখের বশে তিনি বিভিন্ন্ জিনিষপত্র সংগ্রহ করতেন। এর সঙ্গে কিছু যুক্ত করে একটি সংগ্রহশালা গড়ে তোলা যায় এনমটি ভেবে ইউসুফ তার কর্ম তৎপরতা বাড়িয়ে দেন।
বিভিন্ন জেলা উপজেলার গ্রামগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকা ঘুরে ঘুরে ঐতিহ্যবাহী এসব জিনিষপত্র সংগ্রহ করেন। বর্তমানে তার সংগ্রশালায় রয়েছে প্রায় ২০০ রকমের জিনিষপত্র। এখানে সংরক্ষিত আছে দিনাজপুরের রাজা উদয় নারায়নের কারুকার্যখচিত পানের কোটা, রানীর সিঁদুরের কৌটা, চাপাইনবাবগঞ্জের কানসাটের কুঞ্জরাজার ব্যবহৃত হুক্কা, পানের থালা, দুটি কলের গান, শত বছরের পুরাতন মানুষের ব্যবহার্য পাথরের বিভিন্ন্ দেশের ধাতব মুদ্রা ও টাকাসহ শতশত বছর আগের মানুষের ব্যবহার্য পাথরের থালা-বাটি আদিবাসিদের ব্যবহার্য মাটির বয়াম পাথরের বাটি কানের দুল, মাদুলি, হাতের বাজু, মাটির খুটি, নকশি গ্লাস, কড়ির থালা, ছয় কেজি ওজনের পাথরের থালা, চিনামাটির কেটলি, ১৩৩২ সালের জায়নামাজ, ১৩০৭ সালের চিনামাটির থালা, ১২১৭ সালের কাঠির মালা, ব্রিটিশ আমলের ইতিহাস ও ভূগোল বই, চৌকিদারি আইনের বই, বিভিন্ন পুঁথিসহ নানা প্রত্নতাত্ত্কি নিদর্শন। এ ছাড়াও তার সংগ্রশালায় রয়েছে ১শ বছরে পুরাতন ধানের ২৫০ প্রজাতির বীজ ও বিভিন্ ফলজ ও বনজ গাছের চারা সংরক্ষনাগার। সেই সংগ্রহশালায় তিনি পুরানো হারিয়ে যাওয়া ধানগুলো সংরক্ষণ করে রেখেছেন। তিনি ২০১৩ সালে ইউসুফ আলী মোল্লার পুরিবেশের উপর স্বর্ণ প্রদক পেছেন।
এব্যাপারে ইউসুফ আলী মোল্লা জানান, তার এই সংগ্রশালার জন্য আরো দু-তিনটি র‌্যাক প্রযোজন, টাকার অভাবে তিনি তা কিনতে পারছেন না। তিনি আরো বলেন, আমার সংগ্রহশালায় বিরলপ্রজাতির ধান, যার একটি ধানে দুইটি চাল পাওয়া যায়।
এনিয়ে থানা কৃষকলীগের সভাপতি জাইদুর রহমান বলেন, ইউসুফ আলী মোল্লার এই ব্যতিক্রমধর্মী পদক্ষেপ নতুন প্রজম্মাকে উজ্জিবীত করবে। তার সংগ্রহশালা টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে ।