তানোরে পিডিবি লাইনম্যানের মিটার বাণিজ্যে অসহায় গ্রাহক

আপডেট: আগস্ট ২৬, ২০১৭, ১:৩১ পূর্বাহ্ণ

ইমরান হোসাইন, তানোর


রাজশাহীর তানোরে পিডিবির ডিজিটাল মিটারে লস ইউনিট বিলের নামে বেপরোয়া বাণিজ্য শুরু করেছেন লাইনম্যান ফারুক আহম্মেদ। তার চাহিদামতো গ্রাহকরা টাকা না দিলে মিটারে ক্রটি আছে বলে পরিবর্তনের জন্য চাপ দেয়া হয়। এ কারণে কেউ অসম্মতি জানালে বিদ্যুৎ চুরির মামলার ভয় দেখান তিনি।
ফলে নিরুপায় হয়ে তানোর পৌর এলাকার জিওল গ্রামের শাফিউল নামের এক অটোচালক চলতি মাসের ২১ আগস্ট তানোর পিডিবির (নেসকো লি.) আবাসিক প্রকৌশলী, রাজশাহী পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বরাবর অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের পর গত ২৩ আগস্ট তানোর পিডিবির আবাসিক প্রকৌশলী আবু সাঈদ অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য অনুরোধ করেছেন। কিন্তু অভিযোগকারী শাফিউল ইসলাম রাজি না হওয়ায় গতকাল শুক্রবার সকালে তার মিটার দেখে গেছেন। কিন্তু আর্থিং সংযোগ দেয়া হয় নি।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, তানোরে পিডিবির আওতায় সাড়ে ছয় হাজার গ্রাহক সংখ্যা রয়েছে। এরমধ্যে প্রায় তিন হাজার গ্রাহক লাইনম্যান ফারুকের খপ্পড়ে পড়েছেন। ফলে গ্রাহককে প্রতিমাসে গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত ঘুষের টাকা। এমনিতেই বেশ কয়েক মাস বিদ্যুতের অসহনীয় লোডশেডিঙে মহাযন্ত্রণায় ভুগছেন গ্রাহকরা। এরমধ্যে শুরু হয়েছে লাইনম্যান ফারুকের ‘লস ইউনিট’ বিলের ব্যবসা। ফলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন গ্রাহক।
এনিয়ে অভিযোগকারী শাফিউল ইসলাম জানান, তার বাড়ির মিটার বাবার নামে রয়েছে। ব্যাটারিচালিত অটোগাড়ি ক্রয়ের পর আবাসিক প্রকৌশলীর পরামর্শে মিটার লোড বৃদ্ধি করা হয়। চলতি বছরের ১৭ মে অভাবের তাড়নায় গাড়িটি বিক্রি করে দেয়া হয়। পরে ইমাম প্রশিক্ষণে যান তিনি। এ অবস্থায় তার মেয়ে অসুস্থ হলে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ফলে বাড়ি ছেড়ে পরিবার নিয়ে ১৫ দিন ধরে হাসপাতালে অবস্থান করেন। এ কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমে যায়। গত জুন ও জুলাই মাসে বিল কম হয়। কিন্তু চলতি মাসের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত বিদ্যুৎ খরচ হয় চার হাজার ৫৬০ ইউনিট। অথচ বিল দেয়া হয় ৪ হাজার ৫৯০ ইউনিটের। এখানে ৩০ ইউনিট বিল ব্যবহার না করলেও বিল দেয়া হয়। এ অবস্থায় তানোর পিডিবি অফিসের লাইনম্যান পরিচয়ে মোবাইল ফোনে তাকে অফিসে দেখা করতে বলেন। চলতি মাসের ৯ আগস্ট তিনি অফিসে যান। লাইনম্যান ফারুক তাকে দেখে মিটারে ক্রটির নামে ৫ হাজার টাকা দাবি করে মামলার ভয় দেখান। ফলে তিনি নিরুপায় হয়ে অনৈতিক অর্থ দাবির ব্যাপারে ও তাকে হয়রানির কারণে অভিযোগ করেছেন।
তিনি আরো জানান, শুধু তার কাছে নয়, ল্যাইনম্যান ফারুক এভাবে বুরুজ গ্রামের আনারুলের কাছে দুই হাজার টাকা ও রিয়াজের কাছে সাত হাজার টাকা দাবি করেছেন। রিয়াজ কিছু টাকা দিয়েছেন। লাইনম্যান ফারুককে তার চাহিদামতো টাকা দিয়ে অনেক গ্রাহক অ্যানালগ মিটার ব্যবহার করছেন। কিন্তু ডিজিটাল মিটারে গ্রাহকের কাছে অনৈতিক সুবিধা দাবি করে ‘কারো পৌষ মাস আর কারো সর্বনাশ’ ডেকে আনছেন। এতে লাইনম্যান ফারুকের পকেট ভারী হলেও সর্বস্বান্ত হচ্ছেন পিডিবির গ্রাহকরা।
তানোর পৌর এলাকার আমশো গ্রামের গ্রাহক ধলু মোল্লা জানান, লাইনম্যান ফারুক লস ইউনিটের নামে ভালো মিটার পরিবর্তনের তাগিদ দিচ্ছেন। সেই সঙ্গে টাকাও দাবি করছেন। তার এ ধরনের তাগিদ ও দাবি শুধু মৌখিকভাবে দেয়া হয়। অফিসিয়াল নোটিশের মাধ্যমে জানানো হয় না। লাইনম্যান ফারুকের মিটার বাণিজ্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন গ্রাহকরা। তিনি পিডিবির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লাইনম্যান ফারুককে অবিলম্বে অপসারণের দাবি জানান। তিনি আরা জানান, বেশ কয়েক মাস ধরে লোডশেডিং বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে গ্রাহকরা অস্বস্তি বোধ করছেন। কিন্তু লোডশেডিং থাকলেও বিলের পরিমাণ কমছে না। মনে হয় যতো লোডশেডিং বিদ্যুৎ বিল ততই বেশি।
তানোর কুঠিপাড়া গ্রামের গ্রাহক হাকিম জানান, দশ বছর আগে বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়া হয়। প্রথমে অ্যানালগ মিটার ব্যবহার করেছেন বেশ কয়েক বছর। তার গ্রামের বাসিন্দা তানোর পিডিবি অফিসের মাস্টার রোল কর্মচারী হান্নান ডিজিটাল মিটার স্থাপনের জন্য চাপ দেন। নিরুপায় হয়ে তিনি ডিজিটাল মিটার স্থাপন করেছেন। গত চার বছরের মধ্যে তিনটি মিটার পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ অফিসের মাস্টার রোল কর্মচারীর বাড়িতে ১০ বছর ধরে আজো অ্যানালগ মিটার ব্যবহার করা হচ্ছে।
তানোর ‘বাজারের কথা’ ইলেকট্রনিক্সের প্রোপাইটার শরিফুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎ অফিসের বর্তমান লাইনম্যান ফারুক মিটার বিক্রির কমিশন দাবি করেন। তাতে তিনি রাজি না হওয়ায় গ্রাহকের মিটারের ত্রুটির নামে রাজশাহী সদর থেকে তার পছন্দের সিটিজেন, স্মার্ট ও স্টার নিউমডেল মিটার ক্রয়ের জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন। কেউ তার পছন্দের মিটার না নিয়ে তানোর বাজার থেকে ইস্টার্ন মিটার ক্রয় করে সরবরাহ করলে ক্রটিপূর্ণ মিটার বলে ফেরৎ দিচ্ছেন। এভাবে তার দোকান থেকে ক্রয় করা গ্রাহকের প্রায় পাঁচ শতাধিক ইস্টার্ন মিটার ফেরৎ দেয়া হয়।
জানতে চাইলে লাইনম্যান ফারুক আহম্মেদ জানান, গ্রাহক সাফিউলের মিটারে আর্থিং নেই। এ কারণে ইউনিট ব্যবহারের জন্য পাঁচ হাজার টাকা জমা দিতে বলা হয়েছে। তিনি কোন অনৈতিক সুবিধার জন্য এমনটি করেন নি বলে দাবি করেন। কিন্তু তার পছন্দের মিটার ছাড়া অন্য মিটার ক্রয় করে সরবরাহ করলে তা ফেরৎ দেয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যান এই লাইনম্যান।
এ বিষয়ে তানোর পিডিবির আবাসিক প্রকৌশলী আবু সাইদ বলেছেন, গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহারে সমস্যা রয়েছে। লোডশেডিং ব্যাপারটি অস্বীকার করার কিছু নেই। তবে, লাইনম্যান ফারুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান এই প্রকৌশলী।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ