তানোরে বাড়ছে হাঁসের খামার

আপডেট: ডিসেম্বর ২১, ২০১৬, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

লুৎফর রহমান, তানোর



রাজশাহীর তানোরে অসংখ্য খাল-বিল ও নদী-নালা অবস্থিত। এসব নদী-নালা খরার মৌসুমে শুকিয়ে গেলেও বর্ষা মৌসুমে যৌবন ফিরে পায়। এসব জায়গায় হাঁসের খামারিরা গড়ে তুলেছেন তাদের স্বপ্নের হাঁসের খামার। তানোর অঞ্চলে প্রায় কয়েকশ হাঁসের খামার গড়ে উঠেছে। এসব খামারে অল্প খরচে যেমন হাঁস পালন করা সম্ভব হচ্ছে তেমন লাভবান হচ্ছে খামারিরা। অপর দিকে বেকারত্ব দূরিকরণেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
তানোর উপজেলার খাল-বিল নদী- নালা সংখ্যা অনেকটা বেশি। হাঁসগুলো সারা দিন নদী , পুকুর বা খালে-বিলেই চরে বেড়ায়। রাতে নেয়া হয় নদী ও বিলের পাড়ের অস্থায়ী খামারে। দিনভর নদী ও খালে ঘুরে ঘুরে প্রাকৃতিক খাবার খায়। বাড়তি খাবার দেয়ার তেমন প্রয়োজন পড়ে না।
খামারিরা জানান, আমাদের দেশের আবহাওয়া হাঁস পালনে খুবই উপযোগী। এ ছাড়া নদীও বিল কেন্দ্রিক খামারিদের হাঁস পালনে তেমন একটা খরচ নেই বললেই চলে। অল্প পুঁজি খাটিয়েই এই ব্যবসা করা যায়। লাভও ভাল। সমস্যা হচ্ছে হাঁসের মাংস ও ডিম মুরগির চেয়ে কিছুটা কম জনপ্রিয়। তবে বর্তমানে এটি অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এখন হাঁস পালন লাভজনক একটি ব্যবসা। অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে হাঁস পালনে এগিয়ে আসছেন এবং পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন হাঁস পালন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্য মতে, ছোট নদী ,পুকুর ও খাল-বিল ছোট-বড় মিলে ১১০টি হাঁসের খামার রয়েছে। এসব একেকটি খামারে ৪০০ থেকে দুই হাজার পর্যন্ত হাঁস রয়েছে। সব মিলিয়ে এক লাখের বেশি হাঁস রয়েছে খামারগুলোতে। খামার থেকে প্রতিদিন গড়ে ডিম পাওয়া যায় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার।
কামারগাঁ হাট পাশ ঘেষা পূর্বে তানোরের শিবনদী। নদীর পাশে অস্থায়ি খামার করে হাঁস পালন করেছেন কামারগাঁ গ্রামের বন্ধন ও মাছিপাড়া গ্রামের শ্রী কৃষ্ণ। কথা হয় তাদের সঙ্গে। বন্ধন জানালেন, হাঁস পালনের সফলতার কথা। প্রায় ৩ বছর আগে বাঁধের ধারে এসে বাড়ি করে নিজেদের বাড়িতে ৫০ টি হাঁস কিনে পালন করতে শুরু করেন। সে সময় গ্রামের পুকুর মাঠে-ঘাটে ছেড়ে চড়াতেন। সেই শুরু আর পেছনে ফিরতে হয় নি। বছর বছর বাড়তে থাকে তার  হাঁসের সংখ্যা। বর্তমানে তাদের খামারে হাঁসের সংখ্যা এক হাজার ৫০টি।
কৃষ্ণ জানান,  প্রতিদিন সকাল হলে নদী থেকে খাবার সংগ্রহ করে খাওয়ার জন্য বিলে হাঁস ছেড়ে দেয়া হয়। আর সে  শুধু দেখাশোনা করেন। রাত হলে তাদের খামারে উঠানো হয়। প্রতিদিন গড়ে তার খামারে ৫০০ থেকে ৬০০ ডিম পাওয়া যায়। প্রতিদিন বিভিন্ন উপজেলা থেকে পাইকাররা খামারে এসে ডিম কিনে নিয়ে যায়। ডিম বিক্রি করে কিছু টাকা হাতে রাখেন খামার পরিচালনার জন্য। বাকি টাকা পরিবারের কাছে লাগানো হয় বলে জানান তিনি ।
তিনি আরো বলেন, আমরা একসময় খুব অভাবি ছিলাম। অন্যের জমি বর্গা করতাম। হাঁসের খামার করে দিন ফিরেছে। হাতে সব সময় টাকা থাকে।
একই উপজেলার মোহর ও লছিরাম পুর গ্রামের কামাল সাজাহান নামের দুই জন খামার করেছেন চার বছর আগে। তারা জানান, পরিবার নিয়ে অভাব-অনটনের মধ্যে দিন কাটাতেন। এলাকায় কাজ না থাকলে রাজশাহী গিয়ে রিকশা চালাতেন। বছর পাঁচেক আগে একবার রাজশাহী থেকে বাড়িতে এসে অন্যদের হাঁসের খামার দেখে হাঁস পালনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। টাকা-পয়সা জোগাড় করে তিনি ৫০টি হাঁস কিনে শুরু করেন খামার। বর্তমানে তার খামারে হাঁসের সংখ্যা এক হাজার।
কামাল বলেন, বিলে হাঁস পালন করতে বেশি খরচ হয় না। পুঁজিও লাগে কম। মাত্র ৩০ টাকা দরে হাঁসের বাচ্চা কেনার পররেই শুরু করা যায় খামার। এখন আমি হাঁসের খামার ছাড়াও দুই লাখ টাকার মালিক। সংসারে কোনো অভাব নেই। ভালো আছি। সাধারণত বাড়ির আশপাশে খামার করে হাঁস পালন করলে মোট খরচের একটা বড় অংশ চলে যায় খাবারের পেছেন। এতে লাভ কমে যায়। কিন্তু কুপুর পাড়ে খামার করলে এত খরচ হয় না। পুকুরে পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া যায়, হাঁসগুলো সারা দিন ঘুরে সেই সব খবার খায়। আলাদা খাবার দিতে হয় সামান্যই। এছাড়া উন্মুক্ত পরিবেশে ও পুকুর ও খাল থেকে প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ায় আগাম ডিম দেওয়াসহ ডিমের পরিমাণ বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে খরচ কম, লাভ বেশি বলে তানোরে খামারের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে ।
তবে খামারিদের অভিযোগ, হাঁস খামারে ঠিকমত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের পরামর্শ পাওয়া যায় না। ভ্যাকসিনও বাজার থেকে কিনে এসে নিজেদেরই দিতে হয়।
তানোর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মুখলেছুর  রহমান জানান, সরকারিভাবে ভ্যাকসিন ফ্রি দেয়ার কোন সুযোগ নেই। আর জনবল কম থাকায় অনেক সময় খামারগুলোতে সঠিক সময়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। নদী বা বিলে প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ানো যায় বলে খরচ কম। সে কারণে হাঁস পালন ও খামারের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। হাঁস পালন করে অনেকে স্বাবলম্বীও হয়েছেন। তিনি আরো জানান, কার্তিক থেকে জৈষ্ঠ পর্যন্ত আট মাস টানা ডিম দেয় হাঁস। তবে আষাঢ় থেকে আশ্বিন চার মাস ডিম উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসে। তখন পুকুর ও নদীতে খাবারের সংকট থাকে।