তাল তাল সোনা, প্ল্যাটিনাম মহাকাশে! খোঁজ-তল্লাশ, খননে নামছে ৩ সংস্থা

আপডেট: ডিসেম্বর ৯, ২০১৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ণ

সুজয় চক্রবর্তী



তাল তাল সোনা ছড়িয়ে রয়েছে মহাকাশে। ছড়িয়ে রয়েছে প্ল্যাটিনামও। আর মহাকাশে বিপুল পরিমাণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিরল, দুর্লভ, বহুমূল্য খনিজ পদার্থ। আর সে সব যে খুব দূরে রয়েছে, তা নয়। সেই সব সোনা, প্ল্যাটিনাম আর বহুমূল্য খনিজের তল্লাশে যে খুব একটা কল্পনাতীত দূরত্বে পাড়ি জমাতে হবে, এমনটাও নয়। ওই বিরল, বহুমূল্য পদার্থ রয়েছে আমাদের হাতের প্রায় নাগালেই। চাঁদে। কাছে-পিঠে থাকা বিভিন্ন গ্রহাণু বা অ্যাস্টারয়েডে।
মহাকাশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সোনা, প্ল্যাটিনাম সহ দুর্লভ, বহুমূল্য পদার্থগুলির সুবিশাল ‘খনি’গুলির খোঁজ-তল্লাশ আর সে সব পৃথিবীতে তুলে নিয়ে আসার অভিযানে নামছে এ বার তিনটি সংস্থা। আগামী বছর থেকেই শুরু হয়ে যাবে পর পর সেই সব অভিযান। ওই তিনটি মার্কিন সংস্থার অন্যতম- ‘মুন এক্সপ্রেস’। যার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অনাবাসী ভারতীয় নবীন জৈন। অন্য দু’টি সংস্থা- ‘ডিপ স্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ’ আর ‘প্ল্যানেটারি রিসোর্সেস’।
‘মুন এক্সপ্রেস’ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান নবীন জৈন ও খ্যাতনামা জ্যোতির্পদার্থবিদ নিল ডিগ্রেস টাইসন গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে এক যৌথ প্রেস বিবৃতিতে বলেছেন, ‘‘পৃথিবীর ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত যতগুলি সোনার খনির হদিশ মিলেছে আর আগামী ১০০ বছরে আমাদের এই বাসযোগ্য গ্রহে আরও যত সোনার খনি আবিষ্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে আর সেগুলি থেকে যে পরিমাণ সোনা উঠে আসতে পারে, তার চেয়ে অন্তত ৩০/৪০ গুণ বেশি সোনা রয়েছে আমাদের হাতের নাগালে থাকা কোনও একটি মাঝারি সাইজের গ্রহাণু বা অ্যাস্টারয়েডেই! আর আমরা যদি আমাদের নাগালে থাকা কোনও একটি মাঝারি সাইজের গ্রহাণুতে একটা পাঁচ তলা বাড়ির উচ্চতার ‘গর্ত’ খুঁড়তে পারি, তা হলে সেখান থেকে যে পরিমাণ প্ল্যাটিনাম পাওয়া যাবে, তা গোটা পৃথিবীতে যতটা প্ল্যাটিনাম রয়েছে, সেই ‘মজুত ভা-ার’-এর প্রায় ৩০ গুণ!’’
কোনও কল্প-কাহিনী নয়। নয় কোনও গল্পকথাও। এই স্বপ্নটা দেখেছিলেন ভারতের প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বিজ্ঞানী এপিজে আবদুল কালাম। তিনিই প্রথম বলেছিলেন, ‘‘চাঁদকে আমরা মানবকল্যাণের কাজে ব্যবহার করতে পারি। চাঁদ থেকে তুলে আনতে পারি বিপুল পরিমাণে খনিজ সম্পদ। আর সেই খনিজ সম্পদ দিয়ে আমাদের এই বাসযোগ্য গ্রহে খনিজ সম্পদের ঘাটতিটা পুষিয়ে নিতে পারি। এই ভাবে আমরা চাঁদেই গড়ে তুলতে পারি মানবসভ্যতার দ্বিতীয় উপনিবেশ।’’ অধ্যাপক কালামের সেই স্বপ্নটাকে ঘটনাচক্রে, শেষমেশ সত্যি করে তুলতে চলেছে অনাবাসী ভারতীয় নবীন জৈনের সংস্থা- ‘মুন এক্সপ্রেস’। যারা কোনও গ্রহাণু নয়, আমাদের বড় সাধের, বড় কাছের চাঁদ থেকে দুর্মূল্য, দুর্লভ খনিজ পদার্থ তুলে আনার অভিযানে নামতে চলেছে আগামী বছর থেকেই।
‘মুন এক্সপ্রেস’ সংস্থার ‘ডিপ স্পেস এক্সপ্লোরেশান’ বিভাগের চিফ অপারেটিং সায়েন্টিস্ট, আমেরিকার আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের লুনার অ্যান্ড প্ল্যানেটারি ল্যাবরেটরির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বিষ্ণু রেড্ডি আনন্দবাজারের পাঠানো প্রশ্নের জবাবে ইলিনয় থেকে লিখেছেন, ‘‘চাঁদে আমরা প্রথমেই কোনও খনন-কাজ চালাব না। মানে, যাকে আক্ষরিক অর্থেই বলে, ‘মাইনিং’, তা আমরা অভিযানের প্রথম দফায় শুরু করব না। কোন কোন জায়গায় ওই দুর্মূল্য, দুর্লভ খনিজ পদার্থগুলি রয়েছে বা সেগুলি পাওয়ার সম্ভাবনা কোন কোন জায়গায় সবচেয়ে জোরালো, পয়লা দফায় আমরা শুধুই চাঁদের পিঠে (সারফেস) সেই জায়গাগুলির সন্ধান করব। সেই জায়গাগুলিকে বেছে নেওয়াটাই (লোকেট) এখন আমাদের প্রাইমারি টার্গেট। তার পর প্রয়োজন হলে চাঁদের মাটি খোঁড়াখুঁড়িতে নামব আমরা। কারণ, চাঁদের পিঠেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে, সুবিশাল আর সুউচ্চ স্তূপের মতো জমা হয়ে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে দুর্মূল্য, দুর্লভ হরেক রকমের খনিজ পদার্থ। জন্মের পর থেকে গত আড়াইশো-তিনশো কোটি বছরে চাঁদের পিঠে আছড়ে পড়েছে যত উল্কাপি-, আছড়ে পড়েছে যত ছোট-বড় গ্রহাণু বা তাদের দেহ-খ-, সেগুলিই প্রচুর খনিজ পদার্থ জমা করে রেখে গিয়েছে চাঁদের পিঠে (সারফেস)। এমনকী, ১০ বা ১৫ কোটি বছর আগেও চাঁদের পিঠে যে দুর্মূল্য, দুর্লভ খনিজ পদার্থের সঞ্চয় হয়েছে কোনও ‘বহিরাগত অতিথি’র (উল্কাপি- বা গ্রহাণু বা ধূমকেতু) সৌজন্যে, মিলেছে সেই তথ্য-প্রমাণও। চাঁদের পিঠে কতটা দুর্লভ, বহুমূল্য খনিজ পদার্থ পড়ে রয়েছে, জানেন? ২০১৪ সাল পর্যন্ত যেটুকু হিসেব পাওয়া গিয়েছে, তাতে ১৪০ থেকে ৫০০ কোয়াড্রিলন (যার অর্থ, এক লক্ষ কোটি ডলারের এক হাজার গুণ) ডলার মূল্যের খনিজ পদার্থ জমা হয়ে রয়েছে শুধুই চাঁদের পিঠে। তা হলে ভাবুন! চাঁদের মাটি খুঁড়লে আরও কী অপরিমেয় খনিজের সন্ধান মিলতে পারে! কিন্তু অভিযানের পয়লা দফায় আর চাঁদের মাটি খোঁড়াখুঁড়িতে যাচ্ছি না। তাতে আইনকানুনের জটিলতা রয়েছে। খরচপাতিও কম হওয়ার কথা নয়! তবে প্রয়োজনে তো এক দিন নামতে হতেই পারে চাঁদের মাটি খনন-অভিযানে।’’
জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর সুনন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘এখনও অনেকেরই মনে হচ্ছে, এ সব গল্পকথা! সেটাই স্বাভাবিক। ‘পৃথিবী সূর্যের চার দিকে ঘোরে’ এই কথা প্রতার করে যাজকদের ‘অন্ধবিশ্বাসে’ সজোরে ঘা দেওয়ায় অন্ধই করে দেওয়া হয়েছিল গ্যালিলিও গ্যালিলিকে। সময়ের থেকে অনেকটা এগিয়ে থেকে একটি সত্য উচ্চারণের দায়ে! এখন প্রেক্ষিতটা পুরোপুরি ভিন্ন হলেও বিষয়টা সেই মহাকাশই। বিপুল পরিমাণে সোনা, প্ল্যাটিনাম সহ দুর্মূল্য, দুর্লভ খনিজ পদার্থ শুধুই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মহাকাশে! যাদের তুলে আনা গেলে পৃথিবীর অনেক সমস্যাই মিটে যেত। তা বিশ্বের দারিদ্র্য মোচনে কতই-না সহায়ক হয়ে উঠতে পারতো! খাদ্যাভাব, অপুষ্টি, প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব তখন প্রায় থাকতোই না বলে হয়তো ধনী আর দরিদ্রের ফারাকটাও তাতে অনেকটাই কমে যেতে পারতো! হয়তো পৃথিবীতে প্রয়োজন ফুরিয়ে যেত যুদ্ধেরও! ফলে, মহাকাশকে মানবকল্যাণের কাজে লাগানোর তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই, সেখানেও টানাপড়েন রয়েছে বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের। সেই টানাপড়েন চলছে। আরও বেশ কিছু দিন ধরেই চলবে। যত দিন না সেই লক্ষ্যে শুরু হবে কোনও মহাকাশ অভিযান। আর সেই মহাকাশ অভিযানগুলির মধ্যে কোনও না কোনওটি সফল হবে অনেকটাই। তবে আমার জোরালো বিশ্বাস, সেটা হবে ২০২০ বা ২০২২ সালের মধ্যেই। আরও নিখুঁত ভাবে বলতে হলে, মঙ্গল গ্রহের মাটিতে মানুষের পা পড়ার আগেই!’’
কেন এটাই হতে চলেছে একুশ শতকের সবচেয়ে মহান ‘স্পেস ওডিসি’?
আনন্দবাজারের প্রশ্নের জবাবে ইলিনয় থেকে পাঠানো ই-মেলে আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের লুনার অ্যান্ড প্ল্যানেটারি ল্যাবরেটরির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বিষ্ণু রেড্ডি লিখেছেন, ‘‘এলন মাস্কের মতো কিছু বহুদর্শী মানুষ যখন ‘লাল গ্রহ’ মঙ্গলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মানুষ পাঠানোর ‘স্প্রিন্টে’ নেমেছেন, তখন আগামী দিনের স্পেস এক্সপ্লোরেশনের আরও একটি নতুন দিকও উন্মোচিত হয়েছে। যার লক্ষ্যটা একটু ভিন্ন। তারা শুধুই মানুষকে মহাকাশে নিয়ে যেতে চায় না। তারা মহাকাশের বিভিন্ন প্রান্তে খোঁজ-তল্লাশ চালিয়ে চাঁদ আর আমাদের কাছে-পিঠের গ্রহাণু বা অ্যাস্টারয়েডগুলিতে জমে থাকা বহুমূল্য, দুর্লভ খনিজ পদার্থগুলি মানবকল্যাণের কাজে লাগাতে নিয়ে আসবে আমাদের এই বাসযোগ্য গ্রহে। ‘মুন এক্সপ্রেস’, ‘ডিপ স্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ’ আর ‘প্ল্যানেটারি রিসোর্সেস’ তেমনই তিনটি সংস্থা। ২০১৭ সাল থেকেই ওই তিন সংস্থার অভিযান শুরু হয়ে যাবে মহাকাশের বিভিন্ন প্রান্তে খনিজ পদার্থের সন্ধান আর তা উত্তোলন ও পৃথিবীতে নিয়ে আসার জন্য। ‘মুন এক্সপ্রেস’ মহাকাশযান পাঠাবে চাঁদে। প্রাথমিক ভাবে চাঁদের পিঠে কোথায় কোথায় দুর্মূল্য, দুর্লভ খনিজ পদার্থগুলি রয়েছে, সেই জায়গাগুলি খুঁজে বের করতে। আর ‘ডিপ স্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ’ ও ‘প্ল্যানেটারি রিসোর্সেস’-এর মতো সংস্থাগুলি যাবে গ্রহাণু বা অ্যাস্টারয়েডে, সোনা, প্ল্যাটিনাম সহ দুর্লভ, বহুমূল্য খনিজ পদার্থের উত্তোলের লক্ষ্যে। এই একুশ শতকের দ্বিতীয় শতাব্দীটাই কার্যত, হতে চলেছে মানবসভ্যতার ‘স্পেস এক্সপ্লোরেশনে’র একটি ‘মাহেন্দ্র-ক্ষণ’! শুধুই ‘পৃথিবীর বাসিন্দা’ বলে আমাদের পরিচিতির দিন বোধহয় আর বছরকুড়ির মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে আমাদের। আমরা আক্ষরিক অর্থেই, হয় উঠতে চলেছি, ‘ইন্টার-প্ল্যানেটারি হিউম্যান স্পেসিস’! যার মানেটা হল, আমরা আর ‘বিশ্ব-নাগরিক’ থাকব না। এ বার হয়ে উঠব ‘ব্রহ্মা–নাগরিক’!’’
( আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে)