তিক্ত অভিজ্ঞতায় পাশে দাঁড়ানোর প্রেরণা

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২০, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


আমরা ছয় বোন। আমার বাবার কোনো ছেলে সন্তান ছিলনা। সমাজের মানুষ আমার বাবাকে আটকুড়া বলেতো। তারা আমাদের দেখলে সবসময় খারাপ মন্তব্য করতো। এর কারণে বাবা-মা অনেক হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। নারীদেরকে সমাজ এমনভাবে উপস্থাপন করতো যেটা সহ্য করার মতো না। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আমার মা বাচ্চা নষ্ট করার পদক্ষেপ নিতেও বাধ্য হয়েছিল। তবে আল্লাহর কী নিয়ম যে বাচ্চাটাকে নষ্ট করতে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল সে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এই বোনই এখন আমাদের দেখাশোনা করেন।
এখনও এ দৃষ্টিভঙ্গির তেমন পরিবর্তন হননি। তৈরি হয়নি সচেতনতাও। বিশেষ করে গ্রামে এখনো অষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে নানা কুসংস্কার। যারা মুখে সচেতনতার খই ফুটায় তারাই দেখা যাচ্ছে গোপনে বাল্য বিয়ে দিচ্ছেন। আর তাই নারীদের জন্যে কিছু করবো এমন মানসিকতা নিয়েই ২৭ বছর থেকে এই এনজিওতে পড়ে আছি। তবে এই এনজিওতে এক সময় আমাদের দাতা বেশি ছিল। বেশকিছু প্রশিক্ষণ কোর্স চালু ছিল। তবে এখন আমাদের দাতা কম। বাংলাদেশ মধ্যমায়ের দেশে পরিণত হয়েছে। দাতাগোষ্ঠীও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। যার কারণে আমাদের কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছে। তবে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকার পরও যতটুকু পারছি নারীর ক্ষমতায়নসহ আরো কয়েকটি বিষয় নিয়ে কাজ করছি।
এমনিই তিক্ত অভিজ্ঞতা আর বাস্তবতাকে সামনে রেখে ভালোবাসা নিয়ে নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করার কথা জানাচ্ছিলেন, এনজিও প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ম্যাস এডুকেশন ইন সাইন্স সিএমইএস রাজশাহী দামকুড়া শাখার ইউনিট প্রধান ইসমত আরা নয়ন। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানে ১৩৫ জন কর্মকর্তা কাজ করতেন। তবে বর্তমানে কর্তব্যরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা মাত্র ৮ জন। এ অল্প সংখ্যক কর্মী নিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন ইসমত আরা নয়ন।
নাম না প্রকাশে করার শর্তে এখানে কাজ শিখতে আসা এক নারী জানান, তার বয়স ২২ বছর। তার ১০ বছরের মেয়ে ও এক ছেলে আছে। অনেক নির্যাতন সহ্য করেও স্বামীর সংসারে টিকে আছেন তিনি। কেননা তার যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেয়। তার মা মারা যাওয়ার পর বাবা আরেকটা বিয়ে করেছে। সৎ মা জোর করেই বাল্যবিয়ে দিয়েছিলেন। তাই এলাকায় ফ্রি ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা থাকায় সংসার সামলে সিএমইএস এ কাজ করছেন।
এই নারীর মতো আরো কয়েকজন অল্প বয়সী নারী এভাবেই তাদের নির্যাতানের কথা বলছিলেন। এদের কেউ সৎ মায়ের নির্যাতন, কেউ স্বামীর, কেউবা স্বামীর পরিবারের নির্যাতনের শিকার। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার এসব নারীরা অনেক সময় খুঁজে পাননা প্রতিবাদের ভাষা। আবার প্রতিবাদের ভাষা জানলেও অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে প্রতিবাদ করতে ভয় পাওয়ার কথাও জানান তারা।
ইসমত আরা নয়ন বলেন, প্রতিবাদ করে খুব বেশি লাভ হয়না। কেননা শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়না। আমরাও এক সময় প্রতিবাদ করেছি। তার ফলাফলে আরো দুর্ভোগ নেমে আসে। আমরা যে সচেতনতামূলক কাজগুলো করে থাকি সেখানেও আমাদের অনেক সমস্যার সম্মুখিন হতে হয়।
তিনি তার চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, কয়েক বছর আগে আমরা এক নারীর নির্যাতনের প্রতিবাদে কর্মসূচি চলাকালে সেখানেই আমাদের সামনেই নির্যাতিত সেই নারীর উপর সিগারেট ছুড়ে মারে। পরে তেমন কিছুই হয়নি। এরকম আরো অনেক ঘটনার কারণে মেয়েরা তেমন কিছুই করতে পারেনা।
তাই বাস্তবতা মেনে নিয়েই এসব নারীদেরকে স্বাবলম্বী করার জন্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আর এসব নারীদের পাশে থাকার প্রত্যয়ে পেশা হিসেবে না- এ কাজকে নেশা হিসেবে নিয়েছি। আজ তাদের মতো অনেক মেয়েই কাজ করছে। পরিবারে তার মর্যাদা বেড়েছে। এটাই আমার বড় পাওয়া।
এ বিষয়ে পবা উপজেলা ইউএনও শাহাদত হোসেন বলেন, পবা উপজেলাতে বাল্য বিবাহের পরিমাণ বেশি। এজন্যে আমরা সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছি। আর এসব বাল্যবিয়ের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদও হচ্ছে। তবে নির্যাতনের ঘটনায় আমরা অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। নির্যাতনের ঘটনায় কাউকে ছাড় দেয়া হয়না। আর নারীদের দক্ষ করে তুলতে আমরা ট্রেনিংয়ের আয়োজন করছি।