তীব্র শ্রমিক সংকট : বরেন্দ্র অঞ্চল ও চলনবিলে বোরো ধান নিয়ে বিপাকে চাষী

আপডেট: মে ১১, ২০২২, ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক ও জেলা প্রতিনিধি:


চৈত্রের শেষের দিক থেকেই পাকতে শুরু করেছে বোরো ধান। বৈশাখের প্রথম সপ্তাহ থেকে বরেন্দ্র অঞ্চল ও চলনবিল এলাকায় বোর ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়। এখন অধিকাংশ বোরো ধান পেকে গেছে।

কিন্তু বৃষ্টির বাগড়া ও শ্রমিক সংকটের কারণে ঘরে ধান তুলতে পারছে না অনেক চাষী। অনেক চাষীর জমির ধান পানিতে পচে গাছও বের হচ্ছে। এরমধ্যে আবারও ঘুর্ণিঝড় ‘অশনি’র প্রভাবে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে নতুন সংকটের মুখে পড়েছেন এ অঞ্চলের চাষী। পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলসহ চলনবিলে এখন ফলনহানি ও ঘরে ধান তোলা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার প্রায় ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৩১ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছিলো। এখন পর্যন্ত গড়ে প্রায় ২৬ থেকে ৩০ শতাংশ ধান ঘরে তুলতে পেরেছে চাষী। আর এখন পর্যন্ত যে ধান কৃষকরা ঘরে তুলেছেন সেখানে গড় ফলন এসেছে প্রায় সাড়ে ২০ মণ করে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গড় ফলন ২০ মণের নিচে নামার শঙ্কা প্রকাশ করছেন চাষী ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর।

চাষীরা বলছেন, কয়েকদিনের ঝড়ো বাতাস ও বৃষ্টিতে এ অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি ক্ষেতের কাঁঁচা-পাকা ধান নুয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেতে পানি জমে যাওয়ার কারণে জমিতেই ধান পচে নতুন গাছ জন্ম নিচ্ছে। লোকসানের মুখে বাড়তি খরচেও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। একমাত্র অবলম্বন কষ্টের ধান ঘরে তুলতে না পেরে বিপাকে তারা। পাঁকা ধান গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে চাষীর।
রাজশাহী জেলায় ৬৬ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো। তবে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম জমিতে আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে প্রাকৃতিক দূর্যোগের সম্মুখিন হয়ে ফলনহানির সঙ্গে নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে।

রাজশাহীতে শ্রমিক সংকটের কারণে অনেক চাষী নিজেই বাধ্য হয়ে ধান কাটছেন। এমনি একজন বাগমারার শাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাগমারার নাককাটি, সোনাবিল, বিলসেতি, হাগড়াকান্দি, জুকার বিলসহ কয়েকটি বিলে বোরো ধানের আবাদ হয়। ধান কাটার সময় হলেই এখন শ্রমিকের সংকট দেখা দিচ্ছে। প্রতি বছর এই সংকট প্রকট হচ্ছে। আগের চেয়ে দ্বিগুন ধান চাচ্ছে শ্রমিকরা। বিঘাপ্রতি চার-পাঁচ মণ ধান যদি শ্রমিকদের কাটতেই দিতে হয় তবে নিজে কিভাবে চলবো। তাই নিজেই ধান কাটতে নেমেছি। একা মানুষ কষ্টও হচ্ছে। কিন্তু কিছু করার নাই।

নগরীর বুধপাড়া এলাকার চাষী মোশারফ হোসেন জানান, তিনি এবার সাড়ে চার বিঘা বোরো ধানের আবাদ করেছেন। দু’সপ্তা আগেই ধান পেকে গেছে। কিন্তু শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছিলো না। দুই সপ্তাহ পরে সিরিয়াল ধরে রোববার (৮ মে) কিছু ধান কেটেছে। আর সোমবার (৯ মে) কিছু ধান কাটা হয়েছে। আবার যেখানে শ্রমিক থাকার কথা ছিলো ১০ জন। সেখানে চার জনকে পেয়েছি। শেষে নিজেকেও ধান কাটতে নামতে হয়েছে।

তিনি আরও জানান, এখন ধান বাড়িতে নিতে পারলেও মাড়াই হয় নি। আবহাওয়া ভালো না। শ্রমিকরা মাড়াই করতে অন্তত ১০ দিন সময় চেয়েছে। এরপর পালাই (ধান জড়ো করে রাখা) হাত দিবে। তবে ১৫ দিনের মধ্যেও পালাই হাত দিবে কি না, তা বুঝতে পারছি না। ধান কাটতেই একজন শ্রমিককে একবেলা ৪০০ টাকা করে দিতে হয়েছে। মাড়াই করতে আবারও ৪০০ টাকা করে দিতে হবে।

নাটোরের চলনবিলে এখনও ৭০ থেকে ৬৫ শতাংশ জমির ধান জমিতে আছে। চাষীরা আসন্ন ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কায় শ্রমিকদের আগাম মজুরিও দিয়ে রেখেছেন দ্রুত জমির ধান কেটে ঘরে তুলতে। তবুর চলনবিলের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, সিংড়া, তাড়াশ, চাট্মোহর ,ভাংগুড়া উল্লাপাড়া, রায়গঞ্জ ও ফরিদপুর উপজেলায় চাষীদের চোখে-মুখে দুঃচিন্তার কালো ছাপ।

চলনবিলের কিছু এলাকায় ইদের আগে ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে আধাপাকা, নরম দানা ও থোড় ধান মাটিতে পড়ে গেছে। কোনো কোনো এলাকায় পঙ্গপাল কারেন্ট পোকার আক্রমণে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাতে ফলন কম হলেও বেশিরভাগ অঞ্চলে বোরো ধানের বাম্পার ফলনের আশা করছিলো চাষিরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আশা ম্লান হতে বসেছে।

গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষকলীগের সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিবিদ আব্দুল আজিজ সরকার জানান, তিনি ৪০ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন । তার মধ্যে ২০ বিঘা জমির ধান কেটেছেন । বাকি ২০ বিঘা ২৯ জাতের ধান ১/২ সপ্তাহের মধ্যেই কাটা হবে। কিন্তু আবহাওয়া ও শ্রমিক সংকটের কারণে শঙ্কায় আছি। প্রতি বিঘা ধান কাটা বাবদ ৭ মণ ধান অথবা ৭ হাজার টাকা অথবা ৬/৭০০ টাকাতেও ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। শ্রমিকের বাজার কাছিকাটা, নয়াবাজার, মানিকপুরেও শ্রমিক না থাকায় চাষিরা বিপাকে পড়েছেন।

গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি অফিসার হারুনর রশিদ এবং কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার (এইও) মতিয়ার রহমান জানান, উপজেলায় ৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানে চাষ হয়েছে। এ পর্যন্ত ৩৫ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। এরমধ্যে পরিপক্ক দানার ধান ২০%, শক্ত দানার ধান ২৭ % এবং নরম দানার ধান ২১% জমিতে কাটতে বাকি আছে।

নরম দানার ধান এক সপ্তাহের মধ্যে কাটা যাবে। পরিপক্ক ও শক্তদানার ধান ঘুর্ণিঝড় ‘অশনি’র আঘাতের আগেই কেটে দ্রুত জমি থেকে সরিয়ে নেয়ার জন্য উপজেলা কৃষি অফিস থেকে সচেতনামুলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। শ্রমিক সংকটের মোকাবিলায় ১৫ টি কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার মেশিনে দ্রুততার সাথে কৃষকদের ধান কেটে প্যাকিং করে দিচ্ছে। তবে সেসকল জমিতে পানি জমে থাকবে সেখানে এই মেশিন কাজ করবে না।

নওগাঁতেও তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। জেলার অধিকাংশ জমির ধান নুয়ে পড়েছে। জেলার রাণীনগর উপজেলার সিংগাড়পাড়া গ্রামের ইসমাইল হোসেন প্রামাণিকের ছেলে কৃষক মোস্তাক আহমেদ। তিনি এবার বোরো মৌসুমে তার নিজস্ব ৩২ বিঘা জমিতে বিভিন্ন জাতের বোরো ধান চাষ করেছিলেন।

মাঠে ধানও ভালো হয়েছে কিন্তু শ্রমিক সংকটের কারণে তিনি এখন পর্যন্ত এক শতাংশ জমির ধানও কেটে ঘরে তুলতে পারেন নি। এছাড়া প্রায় ৬ বিঘা জমির ধান বৃষ্টির পানি জমে তলিয়ে থাকার কারণে জমিতেই পাঁকা ধানে চারা গাছের জন্ম নিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তিনি পুরো জমির ধান ঘরে তুলতে পারবেন কি না সেই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

নওগাঁয় প্রতি বিঘা জমিতে ধান চাষে মোট খরচ পড়ছে ১২-১৫ হাজার টাকা। আর দেরিতে ধান কাটার জন্য ফলন পাচ্ছেন প্রতি বিঘা জমিতে ১৫-২০ মণ হারে। এতে করে একজন কৃষককে লোকসান গুনতে হচ্ছে বিঘা প্রতি ৪-৫ হাজার টাকা। আবার যেগুলো ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে আছে সেগুলো থেকে ৪ ভাগের ১ ভাগ ধান পাওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এমন অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তুকির আওতায় না আনলে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক বিশেষ করে বর্গাচাষিরা ধান চাষ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কৃষক হিরো বাবু, মহসিন আলীসহ অনেকেই কান্নাজনিত কন্ঠে বলেন, সারা বছরের কষ্টের ধানের এমন অবস্থা দেখে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। অনেক কষ্টের ফসল আমরা ঠিক ভাবে ঘরে তুলতে পারছি না। পাঁকা ধান এখন আমাদের গলায় মরণ কাটার মতো। মাঠে শ্রমিক নাই।

রাণীনগর উপজেলার কালীগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাব চাঁন বলেন, অন্যান্য এলাকার চেয়ে আমার এলাকার কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এই সব ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি ভর্তুকির আওতায় না আনা হয় দেশ চরমভাবে ধান উৎপাদনের সংকটে পড়বে।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ শামসুল ওয়াদুদ বলেন, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৮৭ হাজার হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ শতাংশ ধান পাকলেও ধান কাটা হয়েছে ২৫ শতাংশ। আমরা কৃষকদের দ্রুত মাঠের ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছি।

কিন্তু শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকেরা ধান কাটতে পারছেন না এমন কথা শোনা যাচ্ছে। বাইরের জেলার শ্রমিক কম আসায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। অপরদিকে সকল কৃষক এক সঙ্গে ধান কাটা শুরু করায় এই শ্রমিক সংকট সৃষ্টির একটি অন্যতম কারণ।

তবে প্রতিটি উপজেলায় কম্বাইন হার্ভেস্টারের মাধ্যমে ধান কাটা-মাড়াই হচ্ছে।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোজদার হোসেন বলেন, রাজশাহীতেও বোরো ধান কাটার সময় শ্রমিক সংকট আছে। কিছু ধান কাটতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। তবে তা পর্যপ্ত না। নগরীতে অনেক উন্নয়ন কাজ হচ্ছে। সেখানে শ্রমিকরা কাজ করছে। এই সময়টায় যদি এই উন্নয়ন কাজ রাতে করা হয় বা কিছুদিনের জন্য যদি বন্ধ রাখা যায় তবে ধান কাটতে শ্রমিকের সংকট থাকবে না।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ খয়ের উদ্দিন মোল্লা জানান, এ অঞ্চলে শ্রমিক সংকট কিছুটা আছে। তবে কম্বাইন হার্ভেস্টারের মাধ্যমে অনেক জমির ধান কাটা হচ্ছে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগকালীন সংকট থাকেই। আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে জেলা অফিসাররা কাজ করছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ