তুমি কে, আমি কে, বাঙালি , বাঙালি

আপডেট: মার্চ ১৫, ২০১৭, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন


‘তুমি কে, আমি কে, বাঙালি, বাঙালি’Ñ এটা হলো বাঙালি জাতির চেতনার উন্মেষের স্লোগান । জাতির স্মৃতির পাতায় এই স্লোগানটি  ক্রমেই বিবর্ণ হয়ে উঠছে। নতুন প্রজন্মর অনেকের কাছে এই স্লোগানটি এখনো অজানা। অজানা বলতে এই বুঝায়, কেন কি কারণে এই স্লোাগানটির উৎপত্তি হয়েছিল তা বিশদভাবে আজকের প্রজন্মের অনেকেই ভালো করে জানে না। এই শব্দ কয়টি কি শুধু মাত্র একটি স্লোগানের মাঝে সীমাবদ্ধ? এ স্লোগানটির অন্তর্নিহিত ব্যাপকতায় বাঙালি জাতির সম্মিলিত ঐক্য ঘটিয়েছিল। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ লাখো মানুষের ঐতিহাসিক মহাসমাবেশে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দৃপ্তকণ্ঠে বাংলার শত শত বছরের পরাধীনতার শিকল ভাঙ্গার ঘোষণা দিয়েছিলেন। লাখো মানুষের সেই সমাবেশটিতে প্লেকার্ড, ফেস্টুনের মূল উপজীব্য ছিল এই সেøাগানটি। এই সেøাগানটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আর্দশের পরিচয় বহন করে। ১৯৪৭ সালের তথাকথিত দ্বি জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে উপমহাদেশ যখন দ্বি খ-িত হয় তখন বাঙালিরা বুঝতে পেরেছিল এই বিভক্ত বাঙালি জাতি সত্তার পরিচয়কে নস্যাৎ করার আরেকটি হীন কৌশল হবে। কারণ দ্বি জাতিতত্ত্বের মূল ভিত্তিটা ছিল ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। বাঙালি জাতি হাজার বছর ধরে বিদেশি শাসকদের শাসনাধীন থাকলেও নিজেদের মাঝে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনটি ছিল অটুট। উপনিবেশিক শাসনামল শুরু হওয়ার পর থেকে বৃটিশরা ফরারফবফ ধহফ ৎঁষবং এই পদ্ধতিতে দেশ শাসন করতে শুরু করে। তখন বাঙালিদের মাঝে সাম্প্রদায়িক অসন্তোষ সৃষ্টি হয় আর বৃটিশ শাসনের শেষ দিকে এই সাম্প্রদায়িকতা অগ্নিরূপ ধারণ করে। আর তখন শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, বাঙালি হিন্দু-মুসলমান পরস্পরে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ফাটল দেখা দেয়। নিজেদের মাঝে সৃষ্টি হয় অবিশ্বাস আর দ্বন্দ্ব। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল সাম্প্রদায়িকতার রোষানলে দগ্ধ হয়। ধর্মের অজুহাতে এক বাঙালি অপর বাঙালির শত্রুতে পরিণত হয়। আর এই ব্যবস্থা সৃষ্টির পেছনে কাজ করে নবসৃষ্ট পাকিস্তানি শাসক শ্রেণি। নতুন এই শাসক শ্রেণি হিসাবে নিজেদের স্থান করে নেয়  ইংরেজদের পরিবর্তে উর্দু ভাষী পাকিস্তানিরা। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্ত হয় আর পূর্ব বাংলা পড়ে পাকিস্তানের অধীন। চেতনা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, ভাষা সবকিছুর সাথে অমিল একটি জাতির সাথে শুধুমাত্র একই ধর্ম পালন করা মানুষ হওয়ায় পূর্ব বাংলার অন্তর্ভুক্তি হয় পাকিস্তানের সাথে। তখন এই বাংলার নতুন নাম হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালে সৃষ্ট নতুন শাসক শ্রেণি ধর্মীয় বাতাবরণে বাঙালিদেরকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ শুরু করে। পাকিস্তানিরা শোষণের ফাঁদটা পাকাপোক্ত করতে সেই সময় রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে ধর্মের ব্যবহার শুরু করে। পাকিস্তানিদের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারÑ বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধের উপর আঘাত হানে। তাই দেখা যায়, ১৯৪৮ সাল থেকে বাঙালিরা অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্লাটফরম গড়ে তুলার চেষ্টা চালায়। রাজনৈতিকগতভাবে বাঙালিরা যে অসাম্প্রদায়িক তার প্রমাণ ঘটে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে। সাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ। বাঙালিরা অসাম্প্রদায়িক তাই  মুসলিম লীগ ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় পূর্ব পাকিস্তান অংশে। আর সেই সময়ে পাকিস্তানিরা বুঝতে পারে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্য। তাই তারা নানা ফন্দি করে বাঙালিদেরকে নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুত করতে চেষ্টা চালায়। পাকিস্তান শাসনামলে রবীন্দ্র সাহিত্য নিষিদ্ধ করা হয়। তাছাড়া বিভিন্ন অসাম্প্রদায়িক লেখা প্রবন্ধ, গল্প নাটক, কবিতা শাসক শ্রেণি প্রকাশ করতে বাধা সৃষ্টি করে। নানা ধরনের সাম্প্রদায়িকতার কৌশলে বাঙালিদের মাঝে পাকিস্তানি শাসকরা বিভক্তি তৈরির প্রচেষ্টা চালায়। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর শাসক শ্রেণি বাংলা হরফের বিলুপ্তির চেষ্টা চালায়। তৎকালীন পাকিস্তান শিক্ষা কমিশন বাংলা শব্দ লিখতে আরবি হরফের ব্যবহারের সুপারিশ করেন। বাংলার লোকগীতি, বাউলগান, লালন, রবীন্দ্র সংগীতসহ বাংলায় রচিত অসাম্প্রদায়িক কবিতা গান প্রচারে শাসক শ্রেণি  বাধা সৃষ্টি করে। বাংলা ভাষা এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে বিলুপ্ত করার প্রয়াসে ধর্মীয় বিষয়টিকে মুখ্য করে তুলে। কারণ সেই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে জনসংখ্যার বিবেচনায়  মুসলমান ধর্মপালনকারী জন্যসংখ্যা বেশি ছিল। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ ছিল মুসলমান ধর্ম পালনকারী। তাই শাসক শ্রেণি উভয়াংশের মেল বন্ধনের জন্য মুসলমান ধর্মকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার প্রয়াস চালায়। পূর্ব পাকিস্তানের ঐতিহ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি , কৃষ্টি, জীবনধারন প্রণালী, আচার-অনুষ্ঠান পালনের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সাথে  কোন মিল ছিল না। অমিল থাকা সত্বেও শাসক শ্রেণি নানাভাবে ধর্মীয় অনুভুতিকে রাজনৈতিক আদর্শে পরিণত করে। পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানিরা একটি তাবেদার শ্রেণির সৃষ্টি করে। আর পাকিস্তানের ওই তাবেদাররা মানুষের ধর্মীয় অনুভুতিকে কাজে লাগিয়ে এদেশের মানুষের মাঝে বিভক্তি রেখা তৈরি করে কায়েমি স্বার্থ হাসিল করার চেষ্টা চালায়। সাধারণ বাঙালিরা বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে। আর তখনই বাঙালিরা নিজেদের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। বাঙালিরা  নিজস্ব সত্তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্লাটফরমে এসে মিলিত হয়। আর বাঙালিরা জেগে উঠে নিজস্ব সত্তায়, অসাম্প্রদায়িক বাংলার চির চেনা রূপটি উদ্ভাসিত হয়। সকল বাঙালিকে ভোদাভেদ ভুলে সাম্প্রদায়িকতার আবরণ থেকে বের করে আনতে উচ্চারিত হয়, ‘তুমি কে, আমি কেÑ বাঙালি, বাঙালি’। আর এই সেøাগানের মধ্য দিয়ে সারা দেশের মানুষ বাঙালি জাতীয়তাবোধের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হয়। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলনের অন্তর্নিহিত ছিল এই সেøাগানটি। বাঙালি জাতীয়তাবোধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন করে। বাঙালির স্বাধীনতার মূল স্পিরিট ছিল অসাম্প্রদায়িকতা, আর ‘তুমি কে আমি কে বাঙালি বাঙালি’ এই স্লোগানটি অসাম্প্রদায়িকতার পরিচয় বহন করে। ১৯৭৫ সালের পটপরির্বতনের পর অসাম্প্রদায়িকতার স্থান দখল করে নেয় সাম্প্রদায়িকতা। ধর্মীয় বাতাবরণে বাঙালির সংস্কৃতির উপর ঝেকে বসে পাকিস্তানি আদর্শিক রাজনীতি ও সংস্কৃতি। পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো শুরু হয় বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বাদ দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা অনুশীলন করার পাঠসূচি। পাকিস্তানিরা নিজেরা যখন শাসক ছিল তখন তারা যা করতে পারে নাই তা এখন নেপথ্যে থেকে পাকিস্তানিরা  করতে শুরু করেছে তাদের রেখে যাওয়া এদেশের দোসরদেরকে দিয়ে। সম্প্রতি পাঠ্যপুস্তক থেকে বিশেষ করে হিন্দু ধর্ম পালনকারী বাঙালি লেখকদের লেখা বাদ দেয়া হয়েছে এই অভিযোগটি উঠেছে শিক্ষাঙ্গনে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন স্তরে সমালোচনা হলেও কর্তৃপক্ষ তাতে কোন প্রকার কর্ণপাত করছেন না। দেশের রাজনীতির মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ধর্ম। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন লাভের আশায় রাজনীতিতে সুনিপুন ভাবে পাকিস্তানি কায়দায় চলছে ধর্মের ব্যবহার। বর্তমানে  বাম নামধারী রাজনীতিবিদরাও একটু ভিন্ন কায়দায় ধর্মকে বর্ম করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ফায়দা লুটার চেষ্টায়। দেশে প্রকৃত প্রগতিশীল বাম আদর্র্শিক রাজনৈতিক প্লাটফরমের অভাব। সিপিবি নামে যে প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠনটি রয়েছে তাদের নৈতিক স্খলন ঘটেছে দেশের সকল রাজনৈতিক সংগঠনের থেকে সবচেয়ে বেশি। সংগঠনটির বর্তমান নেতৃত্ব ভবনের কর্তৃত্ব ধরে রাখার রাজনীতিতে ব্যস্ত।  ফলে বাঙালি সংস্কৃতি কি ঘটল তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। তবে তারা দু একটি বিবৃতি আর জনাদশেক মানুষ নিয়ে মাঝে মাঝে কর্মসূচি পালন করে বুঝাতে চেষ্টা করেন তারা অসাম্প্রদায়িক কিন্তু উদরে লালন করছে সাম্প্রদায়িকতা। এই কথিত বাম সংগঠনটির  সরকার বিরোধী কর্মসূচিতে লাভবান হয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠি। দেশের প্রধান দুই শাসক দলের মূল উদ্দেশ্য ক্ষমতায় যাওয়া। এখানে সাম্প্রদায়িক অসাম্প্রদায়িক বিষয়টি দল দুটির কাছে বিবেচ্য না। তাই ‘তুমি কে আমি বাঙালি বাঙালি’ এই স্লোগানটি রাজনৈতিক ময়দানে মরার খালে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তরেন পর সাম্প্রদায়িকতার উষ্ণ বীজায়ন ঘটেছে রাজনৈতিক মাঠে। তা অংকুরিত হয়ে এখন ডালপালা প্রসারিত করে মহীরুহে পরিণত হতে চলেছে। এ দেশের অনেক নাগরিকই আছেন যারা নিজেকে বাঙালি হিসাবে পরিচয় দেয়ার চেয়ে তিনি যে ধর্ম পালন করেন সেই ধর্মের মানুষ হিসাবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। তাই ক্ষমতায় যাওয়ার মানসে রাজনৈতিকরা আর রাজনীতিতে থেকে কোন ভাবেই ধর্মকে বাদ দিতে পারছেন না। দেশের রাজতৈকি দল গুলো এ ধর্মকে ব্যবহার করে হয়ত স্বল্পকালীন ক্ষমতার সাধ ভোগ করবেন। আর অন্তরালে উগ্রজঙ্গিরা সংগঠিত হবে ধীরে ধীরে ধর্মীয় বাতাবরণের রাজনীতির প্লাটফরমে তা এক সময় জাতির জন্য হয়ে উঠবে মহাদুযোর্গ। আর তখন এই দুযোর্গের অনলে পুড়বে আগামীর প্রজন্ম। কারণ বর্তমানে বাঙালি বা বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির চেয়ে মূল বিষয় হয়ে উঠছে সাম্প্রদায়িক চেতনার বিষয়টি। তাছাড়া এদেশে অনুপ্রবেশ ঘটছে বিদেশি সংস্কৃতির। পাঠ পুস্তকে বাঙালির ঐতিহ্যগত সংস্কৃতিকে বাদ দিলেও বিদেশি চ্যানেলের মাধ্যমে যে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটছে তার প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা নেই। ফলে ক্রমে ক্রমে বাঙালিরা তাদের মূল ধারার সংস্কৃতির বলয় থেকে একটু একটু করে সরে যাচ্ছে আর ওই স্থানটি দখল করে নিচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সিরিয়া, ইরাকের রাজনৈতিক অঙ্গনের দিকে তাকলে বুঝা যাবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি কি ভয়াবহ ফল বয়ে আনে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পুঁজিবাদের সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করে তাই সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে কোনদিন গণতান্ত্রিক শান্তিময় পরিবেশ থাকে না। পুঁজিবাদীরা তাদের মুনাফা নেয়ার জন্য অশান্তির পরিবেশ বজায় রাখে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনা হলো বাঙালি জাতিসত্তার প্রতীক। ১৯৪৮ থেকে ৭১ এই দীর্ঘ সময় বাঙালিদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনীতির অনুশীলনের ফসল ছিল ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়। বর্তমানের বিদেশি সংস্কৃতি এবং সাম্প্রদায়িকতার আগ্রাসন ঠেকাতে হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রয়োজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চা। অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্য প্রয়োজন বাঙালির বৃহৎ ঐক্য। তাই মুক্তিযুদ্ধের আর্দশের বাংলাদেশ গড়ার মানসে, ‘তুমি কে ,আমি কে বাঙালি, বাঙালি’ এই সেøাগানে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে, এদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে রাজনীতিতে ধর্মব্যবহার রোধ করতে হবে।
লেখক:- কলামিস্ট