তেজস্বিনী

আপডেট: ডিসেম্বর ৩০, ২০১৬, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

পথিক গুহ



কী দারুণ উলটপুরাণ! এ বার সাহিত্যে নোবেলজয়ী কর্তৃপক্ষের মুখের ওপর জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি প্রাইজ নিতে স্টকহল্ম যাচ্ছেন না। আর ১৯১১? ঘোষিত হয়েছে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নাম। এগিয়ে আসছে প্রাইজ দেওয়ার অনুষ্ঠান। এ দিকে সংগঠকরা মহা ফ্যাসাদে। নিজেদের সম্মান বাঁচাতে তাঁরা চাইছেন, পুরস্কার বিজেতাদের বিশেষ এক জন যেন না আসেন ওই অনুষ্ঠানে।
যিনি না এলে খুশি হবে নোবেল কমিটি, তিনি এক মহিলা। বিজ্ঞানী। বিখ্যাত। কারণ, মাত্র আট বছর আগে, ১৯০৩ সালে, তিনি পেয়েছিলেন সে প্রাইজ। সে বার ফিজিক্সে। এ বার মনোনীত হয়েছেন কেমিস্ট্রি প্রাইজের জন্য। অর্থাৎ, মাত্র আট বছরের ব্যবধানে দু’-দু’বার দুই আলাদা বিষয়ে নোবেল। এ হেন বিজয়িনীর তো মহাসমারোহে অভ্যর্থনা পাওয়ার কথা। তাঁকে কিনা চিঠি লিখে জানানো হল, আপনি পুরস্কার নিতে না এলে ভাল হয়!
কে তিনি? মারি স্ক্লোদাওস্কা কুরি। মাদাম কুরি। বিজ্ঞানজগৎ তাঁকে জানায় কুর্নিশ। সে তো তাঁর গবেষণার জন্য। তার বাইরেও তিনি এক প্রতীক। দুঃসহ বাধা ডিঙিয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছনোর। কট্টর পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর বিদ্রোহ ঘোষণার। নাঃ, ভুল হল। বলা উচিত ছিল, সমাজ-সংসারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমি-আমার-মতো স্টাইলে বেঁচে থাকার।
আশ্চর্য জীবন বটে! জন্ম পোল্যান্ডের ওয়ারশ’ শহরে। ১৮৬৭ সালের ৭ নভেম্বর। বাবা অ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার। মা মেয়েদের স্কুলে হেডমিস্ট্রেস। চাকরি খুইয়ে বাবা অচিরে বেকার। তিন বোন আর এক ভাইয়ের সংসারে অনটন। অগত্যা বাবা বাড়িকে বানিয়ে ফেললেন কিছুটা বোর্ডিং। স্কুলপড়ুয়া ছাত্রদের বাড়িতে রেখে কিছুটা রোজগার। সংসারে দারিদ্র, কিন্তু বাবা-মায়ের শিক্ষায় ছেলেমেয়ে সবাই ব্রিলিয়ান্ট। মারি তো ক্লাসে ফার্স্ট।
কয়েক বছর বাদে, এক বোন মারা গেল টাইফয়েডে। মা যক্ষ্মা রোগে। সংসারের হাল ধরতে হল মারিকে। কিন্তু লেখাপড়া চালিয়ে যেতেই হবে। ওয়ারশ’তে সে সুযোগ নেই। আছে প্যারিসে। খরচ? প্ল্যান আঁটলেন মারি। ডাক্তারি পড়তে বোন যাবে প্যারিস। খরচ জোগাতে রোজগারে নামবেন মারি। ডাক্তার হয়ে নিজে রোজগার শুরু করলে পড়াশুনো করতে দিদিকে প্যারিস নিয়ে যাবে বোন।
অষ্টাদশী মারি ওয়ারশ’ থেকে দূরে ধনী জোরাওস্কি পরিবারে গভর্নেস। দিনে ও-বাড়ির মেয়েদের পড়ানো, রাতে নিজের বইপত্র নিয়ে বসা। মন কেড়ে নিচ্ছে দুই বিষয়। গণিত। পদার্থবিদ্যা। ক্রমে মন কাড়ল এক যুবকও। জোরাওস্কি পরিবারের বড় ছেলে। বাদ সাধলেন পরিবারের কর্তা। বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাবাকে রাজি করাতে সময় চাইলেন ছেলেটি। পাঁচ বছর অপেক্ষা করলেন মারি। ধনী বাবার বাধ্য ছেলে ভঙ্গে দিলেন রণে। মারি চিনলেন সমাজ।
তত দিনে বোন প্যারিসে ডাক্তার। বিয়ে করেছেন এক ডাক্তারকে। সচ্ছল পরিবার। পড়াশুনা করতে মারির এ বার প্যারিস যাওয়ার পালা। গেলেন। ভর্তিও হলেন স্বপ্নের সোরবোন-এ। কিন্তু বেশি দিন থাকলেন না বোনের পরিবারে। জামাইটা বড় আমুদে। হইহুল্লোড় লেগেই থাকে। পড়াশুনোয় ডিসটার্ব হয়। বোনের বিলাসবহুল পরিবার ছেড়ে মারি গিয়ে উঠলেন কলেজের কাছে এক বাড়ির একখানা খুপরি ঘরে। সে-ঘর গ্রীষ্মে বয়লার, শীতে ফ্রিজ। রোজগার বলতে ল্যাবরেটরিতে কাচের পাত্র ধোয়ামোছার কাজ। পড়াশুনোয় মনপ্রাণ। রান্নার সময় নেই। পেট ভরাতে পাউরুটি আর শুকনো ফল। বা পাউরুটি আর এক টুকরো চকলেট। কষ্টের সেই দিনগুলো সম্পর্কে পরে স্মৃতিকথায় মারি-র মন্তব্য: ‘এ জীবন, কোনও কোনও দৃষ্টিকোণে বেদনাদায়ক হলেও, আমার কাছে প্রকৃত আনন্দের। আমি পেলাম মুক্তি আর স্বাধীনতার স্বাদ, যা দারুণ মূল্যবান। প্যারিসে আমি অজানা-অচেনা, হারিয়ে গেলাম বিশাল শহরে। কিন্তু সেখানে একা থাকার, অন্যের সাহায্য ছাড়া বেঁচে থাকার, অনুভূতি মোটেই হতোদ্যম করল না আমাকে, বরং এক প্রশান্তি আর তৃপ্তি ছেয়ে রাখল মন।’ ফল মিলল একাগ্র পড়াশুনোর। মারি ফিজিক্সের ডিগ্রিতে প্রথম। প্রথম ম্যাথমেটিক্সের ডিগ্রিতেও।
কেরিয়ার? ওয়ারশ’ ফিরে স্কুলে শিক্ষকতা? তা-ই হয়তো হত, যদি-না এক অধ্যাপক আলাপ করাতেন বিশেষ এক জনের সঙ্গে। পিয়ের কুরি। অধ্যাপক। গবেষণা করেন চাপের প্রভাবে ক্রিস্টালের তড়িৎ উৎপাদন এবং চুম্বকত্বের ওপর উষ্ণতার প্রভাব নিয়ে। চিন্তায় ঘোর প্রতিষ্ঠানবিরোধী। পড়াশুনো বেশির ভাগ বাড়িতে। পিএইচ ডি-র পিছনে ছোটেননি। মারির বয়স ২৬। পিয়ের ৩৫। তবু প্রথম দর্শনে মারির মনে হল, পিয়ের যুবক, চোখেমুখে সারল্য, দৃষ্টি কিঞ্চিৎ উদাসীন, আর হাসিটা ভরসা জোগায়।
জুলাই, ১৮৯৫। বিয়ে। মধুচন্দ্রিমা? যৌতুকের অর্থ দিয়ে কেনা হল দুটো সাইকেল। তাতে চড়ে যুগলে দেশভ্রমণ। দু’বছর পর জন্মাল প্রথম মেয়ে। আইরিন। সাত বছর পর দ্বিতীয় মেয়ে ইভ। মারি সহকর্মীদের নিন্দার শিকার। তিনি বাচ্চাদের চেয়ে বেশি সময় দিচ্ছেন ল্যাবরেটরিতে।
গবেষণার সময় বটে সেটা! পদার্থবিজ্ঞানে চলেছে ধুন্ধুমার কা-। জার্মান বিজ্ঞানী উইলহেল্ম রন্টজেন আবিষ্কার করেছেন এক বিচিত্র আলো, যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ভেদ করে যায় অনেক কিছু। জামাকাপড় কোন ছার! মহিলারা সন্ত্রস্ত। খুঁজছেন এমন অন্তর্বাস, যা আটকাবে সে আলো। সে কেমনধারা আলো, তা অজানা, তাই রন্টজেন নাম দিয়েছেন ‘এক্স-রে’। সে আবিষ্কারের কয়েক মাসের মধ্যে ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি বেকারেল পেয়েছেন আর এক খোঁজ। ইউরেনিয়াম মৌল আভা বা আলো ছড়ায়। আপনাআপনি। কেন? জানা নেই। কী সেই আলো? জানা নেই। আলো তো এনার্জি। বিজ্ঞানের অমোঘ নিয়মে তার জমাখরচ সমান হওয়ার কথা। কিন্তু এ তো কেবলই খরচ! বিজ্ঞান বুঝি রসাতলে।
১৬ ডিসেম্বর, ১৮৯৭। রহস্যভেদে নামলেন মারি। সঙ্গী হলেন পিয়ের। ইউরেনিয়ামের আলো বিকিরণের নাম দিলেন ওঁরা। রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি। আলো কেন? মারি বললেন, ওটা পরমাণুর ভেতরের খেলা। মারি-পিয়ের জানতে চান, শুধু ইউরেনিয়ামই কি আলো ছড়ায়? না কি তেমন মৌল আছে আরও? এটা-সেটা নিয়ে পরীক্ষা। শেষে এক পদার্থ। পিচব্লেন্ডি। যা থেকে ইউরেনিয়াম নিষ্কাশন করা হয়। কুরি দম্পতি দেখলেন, পিচব্লেন্ডি-র রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি ইউরেনিয়ামের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ, ওই জিনিসে লুকিয়ে আছে ইউরেনিয়াম ছাড়া অন্য কোনও মৌল, যা ছড়ায় রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি। কী সেই মৌল? খোঁজ পেতে চলল মরিয়া চেষ্টা। আগুন জ্বালিয়ে পেল্লায় কড়াইতে মানুষ-সমান খুন্তি নেড়ে টন-টন পিচব্লেন্ডি গলিয়ে মৌল খোঁজা। দিন-রাত লাগাতার। পরিত্যক্ত এক ছাউনি ঘর ধোঁয়াধুলোয় অন্ধকার। অবশেষে মিলল সেই মৌল। মারি-র মাতৃভূমির স্মরণে কুরি দম্পতি তার নাম দিলেন পোলোনিয়াম। কয়েক মাস পরে ও-রকম আরও এক মৌল। রেডিয়াম। ১৯০৩। রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি আবিষ্কার, তার ব্যাখ্যা এবং প্রবল গবেষণার জন্য ফিজিক্সে নোবেল প্রাইজ তিন জনকে। বেকারেল, পিয়ের এবং মারি। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে নোবেল কমিটির প্রেসিডেন্ট উদ্ধৃতি দিলেন বাইবেল থেকে। সেই যে ঈশ্বর বলছেন, পুরুষের একা থাকা ভাল নয়। আমি বানিয়ে দেব তার এক সাহায্যকারিণী। যেন সাফল্যে মারির ভূমিকা ছিল পিয়েরের সাহায্যকারিণীর, তার বেশি নয়।
১৯০৫-এর শেষ দিক থেকে পিয়ের অসুস্থ। হাড়ে হাড়ে ব্যথা। বেশি ক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। হাতে ঘা। মারিও অসুস্থ। তাঁরও অসুখ প্রায় একই রকম। আসলে দুজনেই রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি বা তেজস্ক্রিয়তার বিষে আক্রান্ত। ওঁরা না জেনে সমানে ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন ইউরেনিয়াম পোলোনিয়াম রেডিয়াম। পিয়ের, যিনি বলতেন রেডিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা ইউরেনিয়ামের চেয়ে লক্ষ গুণ বেশি, তিনি বন্ধুদের দেখাতে রেডিয়াম বুকপকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। আর মারি? ঘুমনোর সময় বিছানার পাশে কিছুটা রেডিয়াম-সমন্বিত যৌগ রাখতেন। যাতে তা অন্ধকার ঘরে আলো ছড়ায়। ১৮৯৭-এর ডিসেম্বর থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত কুরি দম্পতির তিনটে ল্যাবরেটরি নোটবুক এখনও যতেœ রাখা প্যারিসের ‘বিবলিয়োথেক ন্যাশনাল’-এ। ওগুলো থেকে এখনও ছড়াচ্ছে তেজস্ক্রিয়তা। এতটাই যে, আজ যদি কোনও গবেষক ওগুলো ঘাঁটতে চান, তা হলে তাঁকে মুচলেকা দিয়ে ঘোষণা করতে হয় তিনি বিপদ বুঝে কাজে নামছেন। তাই এখন গবেষকদের ধারণা শুধু তেজস্ক্রিয়তার বিষে মারা যেতে পারতেন পিয়ের এবং মারি।
অবশ্য পরোক্ষে তাতেই মারা গেলেন পিয়ের। হাঁটছিলেন খুঁড়িয়ে। ১৯০৬-এর ১৯ এপ্রিল রাস্তা পেরোতে গাড়ি চাপা। তক্ষুনি মৃত্যু। খবর পেয়ে মারি শোকে পাগলিনি। ডায়রিতে লিখলেন, ‘আমি ঘরে ঢুকলাম। এক জন বলল, ও মারা গেছে। কথাটার মানে কী? পিয়ের নেই। সেই যাকে সকালে বেরোতে দেখলাম। সে, যে সন্ধেয় ফিরে আমার হাতটা ধরত। তার মৃতদেহ দেখব? সব শেষ হয়ে গেল? তোমার নাম ধরে বার বার ডাকছি। পিয়ের, পিয়ের, আমার পিয়ের। হায়, ডাকে তুমি সাড়া দেবে না। …একাকিত্ব আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া যে আর কিছু রইল না আমার।’
১৯১১। নোবেল কমিটির বৈঠক। মনোনীত হবে রসায়নে পুরস্কার প্রাপক। উঠে এল মারির নাম। কারও কারও আপত্তি। মাত্র আট বছরের মধ্যে দু’বার নোবেল? আপত্তি টিকল না। যুক্তি জোরদার। ব্যক্তি নয়, নোবেল দেওয়া হয় কাজকে। আগের বার পেয়েছিলেন রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি ব্যাপারটা নিয়ে গবেষণার জন্য, এ বার দুই নতুন মৌলÍ পোলোনিয়াম ও রেডিয়াম আবিষ্কারের জন্য মারি পাবেন প্রাইজ।
আর ঠিক তার পরেই হইচই স্ক্যান্ডাল। কাগজে খবরে ছয়লাপ। বিধবা মারি কুরির প্রেমকাহিনি সবিস্তার। প্রেমিক? পিয়ের কুরির প্রিয় ছাত্র পল লঁজভ্যাঁ। বয়সে মারির পাঁচ বছরের ছোট এই পুরুষটি বড় বিজ্ঞানীও বটেন। বিবাহিত এবং চার সন্তানের বাবা লঁজভ্যাঁ দাম্পত্য জীবনে চরম অসুখী। স্ত্রী বিশাল ধনী পরিবারের মেয়ে। উদ্ধত, কটুভাষিণী। পরিবারে উত্তপ্ত কথা কাটাকাটি, এমনকী ফুলদানি ছোড়াছুড়ি, লেগেই থাকে। তিনি ও মারি নিজেদের দুঃখ নিয়ে আলোচনা করেন। তা থেকে ঘনিষ্ঠতা। প্রেম। নিভৃতে সময় কাটাতে দুজনে প্যারিসে এক অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করলেন। সেখানে ঘন ঘন সাক্ষাৎ।
খবর পেয়ে পুরুষটির স্ত্রী অগ্নিশর্মা। রাস্তায় মারিকে দেখে হুমকি দিলেন তাঁকে খুন করবেন। আর স্বামীকে বলে দিলেন, মারির সংস্রব ত্যাগ না করলে প্রেমকাহিনি কাগজে ফাঁস করবেন। লোকলজ্জার ভয়ে লঁজভ্যাঁ মেনে নিলেন স্ত্রীর নির্দেশ। নিভৃত সাক্ষাৎ বন্ধ।
তখন শুরু হল প্রেমপত্র লেখা। বেশির ভাগ মারির তরফে। ১৯১০-এর জুন মাসে দুই মেয়েকে নিয়ে এক সমুদ্রসৈকতে ছুটি কাটানোর ফাঁকে মারি লিখলেন, ‘প্রিয় পল, গতকাল সন্ধে এবং রাত শুধু তোমার কথা ভেবেছি। মনে পড়েছে আমাদের এক সঙ্গে সময়যাপনের স্মৃতি। যা আমার কাছে ছিল নিতান্ত সুখের। আমি এখনও দেখতে পাচ্ছি তোমার সুন্দর এবং নরম চোখ দুটি। কেবলই ভাবছি কবে আবার তোমার উপস্থিতির মিষ্টি মুহূর্তগুলো পাব।’ অথবা সেপ্টেম্বর মাসে: ‘আমরা একে অন্যের প্রতি গভীর ভাবে আকৃষ্ট। প্রয়োজন শুধু একটা সুন্দর জীবনের পরিবেশ।’ চিঠিটা দীর্ঘ। কারণ, এতে রয়েছে একাধিক উপদেশ। যেমন, দুর্বিষহ দাম্পত্যজীবনে ইতি টেনে এ বার লঁজভ্যাঁ-কে এগোতে হবে ডিভোর্সের দিকে। চার ছেলেমেয়েকে পাঠাতে হবে বোর্ডিং স্কুলে। স্ত্রী ওদের অভিভাবকত্ব দাবি করলে তা মেনে নিতে হবে। আর হ্যাঁ, এই স্ত্রীর সঙ্গে এক ছাদের নীচে কিছুতেই থাকা ঠিক হবে না। ও যে রকম ধূর্ত এবং শঠ, আরও এক বার গর্ভবতী হয়ে পলের তরফে ডিভোর্সের চেষ্টায় জল ঢেলে দেবে।
তাঁকে লেখা মারির সব প্রেমপত্র লঁজভ্যাঁ রাখলেন ওই ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্টে। এ দিকে বেলজিয়ামের ব্রাসেলস শহরে কনফারেন্সে আমন্ত্রিত হয়ে গেলেন মারি এবং পল। পলের স্ত্রী গুন্ডা ভাড়া করে তাঁদের অ্যাপার্টমেন্টের দরজা ভাঙালেন। পাওয়া গেল চিঠিগুলো। পলের স্ত্রী ডিভোর্সের মামলা রুজু তো করলেনই, চিঠিগুলো তুলে দিলেন মিডিয়ার হাতে। সুখাদ্য পেয়ে ট্যাবলয়েডদের জিভে জল।
শুরু হল প্রচার। বিদেশিনি দুশ্চরিত্রা এক বিধবা কিনা চার সন্তানের জননী নিষ্পাপ এক ফরাসি রমণীর ঘর ভাঙছেন! দেশের মানুষ দেখুক, নামী ল্যাবরেটরিগুলো কেমন পরিণত হয়েছে লাম্পট্যের আখড়ায়। মারির বিরুদ্ধে বিষোদ্গারে সবাইকে ছাপিয়ে গেলেন জার্নালিস্ট গুস্তাভ টেরি। চরিত্রহীন বিধবার খপ্পরে পড়া লঁজভ্যাঁ যে ফেঁসে গিয়েছেন, তা জানাতে টেরি লিখলেন, ‘মারি আর পারবেন না স্কার্টের আড়ালে তাঁর প্রেমিককে লুকিয়ে রাখতে।’
সহ্যের বাঁধ ভাঙল লঁজভ্যাঁর। নিতে হবে অপমানের বদলা। ডুয়েল! পিস্তল নিয়ে দুজনে হাজির মাঠে। চার দিকে রুদ্ধশ্বাস জনতা। প্রাণ যাবে কার? গেল না কারও। প্রথমে টেরি। লঁজভ্যাঁর বুকের বদলে তিনি পিস্তল তাক করলেন মাটির দিকে। তা দেখে বিজ্ঞানীও পিস্তল নামিয়ে রাখলেন। পর দিন টেরি কাগজে লিখলেন, ‘ফরাসি বিজ্ঞানকে এক মূল্যবান মস্তিষ্কের সেবা থেকে বঞ্চিত করতে আমার বিবেকে বাধছিল।’ আর লঁজভ্যাঁ? তিনি প্রাণে বাঁচায় মারি চাইলেন যেন তাঁর ডিভোর্স তাড়াতাড়ি হয়। লঁজভ্যাঁ অরাজি। জানালেন, নিজের সন্তানদের মাকে ছাড়তে পারবেন না তিনি। মারি সংস্রব ত্যাগ করলেন লঁজভ্যাঁর। এ রকম সময় স্টকহল্ম থেকে চিঠি। লিখেছেন নোবেল কমিটির প্রভাবশালী সদস্য সেই রসায়নবিদ, যিনি কমিটির মিটিং-এ জোর সওয়াল করেছিলেন মারিকে দ্বিতীয় নোবেল দেওয়ার পক্ষে। বলেছিলেন, ব্যক্তি নয়, নোবেল দেওয়া হয় সাফল্যকে। কাগজে কাগজে প্রকাশিত লেখা পড়ে তিনিই এ বার বিরূপ। লিখলেন, আগে সব জানলে কমিটি প্রাইজ দিত না মারিকে। এখন তিনি যেন প্রাইজ নিতে স্টকহল্ম না আসেন। মারি ক্ষুব্ধ। জবাবে লিখলেন, ‘প্রাইজ তো দেওয়া হয়েছে পোলোনিয়াম এবং রেডিয়াম আবিষ্কারকে। আমি মনে করি আমার গবেষণা ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে না। কারও বিরুদ্ধে কুৎসা তার গবেষণার মূল্যায়নে ছায়া ফেলুক, এ আমি নীতিগত ভাবে মানি না।’ প্রাইজ নিতে মারি গেলেন স্টকহল্ম। আর হ্যাঁ, তা নেওয়ার পর বক্তৃতায় স্পষ্ট ব্যাখ্যা করলেন যে-কাজের পুরস্কার, তার কতটা করেছেন তিনি, আর কতটা তাঁর স্বামী।
লঁজভ্যাঁ-কিস্সায় যে কালি লাগল মারির ভাবমূর্তিতে, তা মুছল না দ্বিতীয় নোবেলেও। মুছল কয়েক বছর পরে। যখন লাগল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। আহত ফরাসি সেনাদের চিকিৎসায় ১৮টা ভ্যানে এক্স-রে মেশিন নিয়ে মারি ছুটে বেড়ালেন লড়াইয়ের ময়দানে ময়দানে। ১৯৩৪-এর ৪ জুলাই মৃত্যুর আগে মারি দেশে-বিদেশে সেলেব্রিটি। মৃত্যু? লিউকিমিয়ায়। তেজস্ক্রিয় পদার্থ ঘাঁটাঘাঁটির পরিণাম। এত বছর যে বেঁচে ছিলেন সেটাই বিস্ময়ের। চলে গেলেন ৬৬ বছর বয়সে। আর একটা বছর বাঁচলে দেখতে পেতেন মেয়ে আইরিন এবং জামাই ফ্রেডেরিখ পাচ্ছেন নোবেল প্রাইজ। সেই রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি গবেষণারই সূত্রে!
(আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে)