তের বছর ধরে বাঁশ ও রশি ধরে দুশো মিটার দূরের মসজিদে যান ১১৫ বছরের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মুয়াজ্জিন

আপডেট: মে ১৪, ২০২৪, ৯:৩০ অপরাহ্ণ


নাটোর প্রতিনিধি:


উত্তরের জেলা নাটোর। প্রত্যন্ত অঞ্চল গ্রামীণ পাকা সড়ক দিয়ে যাতায়াত করা পথচারী কিংবা যানবাহনে চলাচলকারী যাত্রীদের হঠাৎ দাঁড়িয়ে দেখতে হবে, বাঁশ ও রশি বেয়ে রাস্তা পারাপার ও মসজিদে প্রবেশের দৃশ্য। জেলার বড়াইগ্রামে ১১৫ বছর বয়সী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মুয়াজ্জিন মো. আব্দুর রহমান মোল্লা। তিনি ১৩ বছর যাবৎ বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিটার রাস্তা বাঁশ ও রশি ধরে মসজিদে যান পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান দেয়ার জন্য। উপজেলার নগর ইউনিয়নের বড়দেহা গ্রামে তার বসবাস। চোঁখের দৃষ্টি শক্তি না থাকলেও মনের শক্তি ও মনোবল কমেনি তাঁর। মুয়াজ্জিনের এমন কার্যক্রমে খুশি পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসী।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ‘প্রায় ২০ বছর পূর্বে একটি দুর্ঘটনায় দুই চোঁখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেন আব্দুর রহমান মোল্লা। ২০ বছর পূর্বে থেকেই তিনি অন্ধ। পরিবারে রয়েছে দুই স্ত্রী ও ২৫ ছেলে-মেয়ে। তাদের মধ্যে ৬ সন্তান মারা গিয়েছে। বর্তমানে ১০ মেয়ে ও ৯ ছেলে এবং দুই স্ত্রী বেঁচে রয়েছেন। সব ছেলে মেয়েকেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। ছেলে-মেয়েদের মধ্যে শিক্ষক, কৃষি কর্মকর্তা, চিকিৎসক, বিজিবি, ব্যবসায়ী, কেউবা আবার নিজেদের জমি-জমা দেখাশোনা করেন। অন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ২০১১ সালে পবিত্র হজ্ব পালন করে এসেছেন।

হজ্ব পালন করে আসার পর হতে নিজ এলাকা বড়দেহা গ্রামে নিজের ৫ শতাংশ জমির ওপর ১টি পাকা মসজিদ তৈরি করেন। তিনি জমিটি রেজিস্ট্রি করে দেন মসজিদের নামেই। গ্রামের মানুষ ও ছেলে-নাতীদের নিয়ে ২০১১ সাল হতেই নিজের স্থাপন করা মসজিদে নামাজ আদায় শুরু করেন। সেই মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসাবেও তিনি আবার বিনাপারিশ্রমিকে দায়িত্ব পালন করছেন।’
আব্দুর রহমান মোল্লা’র ছেলে আলহাজ্ব মো. শফিকুল ইসলাম সাইফুল (মাস্টার) বলেন,‘২০ বছর পূর্বে একটি দুর্ঘটনায় তার বাবা অন্ধ হয়ে যায়। অন্ধ হওয়ার ৬ বছর পরে বাবাকে নিয়ে হজ্ব পালন করেন।

হজ্ব পালন করে আসার পর তার বাবা যে মসজিদ স্থাপন করেছেন সেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু বাড়ি থেকে মসজিদ প্রায় ২০০ মিটার দূরে। মসজিদে যাতায়াত কিভাবে করবেন, এমন প্রশ্ন তার বাবাকে তিনি জিজ্ঞেস করলে, আব্দুর রহমান মোল্লা ছেলেকে জানান, বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত বাঁশ ও রশি টেনে দিতে বলেন। বাবা’র পরামর্শ অনুযায়ী বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত বাঁশ ও রশি টেনে দেয়া হয়। প্রথমে প্রায় ১৫ দিন ছেলে ও নাতিরা বাঁশ ও রশি দেখিয়ে দিয়ে মসজিদ পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছে। এখন তিনি নিজেই মসজিদে যাতায়াত করতে পারেন।

ছেলে রফিকুল ইসলাম বলেন,‘তার বাবা’র বয়স চলছে ১১৫ বছর। এই বয়সে এসেও অন্ধ হয়ে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান দেন এবং নামাজ আদায় করেন। বাবা’র এমন মহৎ কাজে তিনিসহ তার পরিবারের সকলেই অনেক খুশি। তাছাড়াও তার বাবা তার সকল ভাই-বোনকে শিক্ষিত করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি তার বাবা’র জন্য সকলের কাছে দোয়াও চেয়েছেন।’
নাতী নাইম হোসাইন জানান, ১১৫ বছর বয়সেও যদি তার দাদা এভাবে মসজিদে যেতে পারেন, সে এই বয়সে কেন পারবে না। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি এখন নামাজে সময় দিচ্ছে বলেও জানায়।’

রাজশাহী নাজাত হাফিজিয়া কওমিয়া মাদ্রাসা’র প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হাফেজ মাওলানা মো. আব্দুল মজিদ বলেন,‘ আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াাসাল্লামের জন্য আজান দিতেন। আর তিনি ছিলেন অন্ধ। আব্দুর রহমান মোল্লা ১১৫ বছর বয়সে এসেও ইসলামের পথে যে মহতি কাজ করছে তার প্রতি মহান আল্লাহ পাক অবশ্যই সদয় হবেন। তার মনোবল অনেক দৃঢ়। তিনি অনেকের অনুপ্রেরণা হতে পারেন। তাকে দেখেও যারা নামাজে আগ্রহী হয়নি তারা অবশ্যই আগ্রহী হবেন।