তৈরি পোশাক: ফিনল্যান্ডে যেসব বিকল্প উপায়ে পরিবেশ-বান্ধব ফাইবার উৎপাদন করা হচ্ছে

আপডেট: অক্টোবর ১, ২০২২, ১:০৫ অপরাহ্ণ

তুলা ও সিনথেটিক উপাদান ছাড়াই এসব পোশাক তৈরি করা হচ্ছে।

সোনার দেশ ডেস্ক :


পেত্রি আলাভা ইস্ত্রি করা স্যুট আর চামড়ার জুতা পরে অফিসে যেতেন। তিনি একটি বৃহৎ অফিস পরিচালনা করতেন যা ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে বাগান করার সামগ্রী – সবকিছুই বিক্রি করে।
এখন তিনি একটি নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালান যেখানে তিনি গোল-গলার টি-শার্ট পরে যান, এবং তার এই শার্ট ফেলে দেওয়া পুরনো কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।

তার প্রতিষ্ঠান ‘ইনফিনিটেড ফাইবার’ নতুন প্রযুক্তিতে কাপড় তৈরি করার পেছনে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেছে। যেসব কাপড় আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেওয়া কিম্বা পুড়িয়ে ফেলার কথা সেগুলো কাপড় তৈরির নতুন ফাইবারে পরিণত করা হয় এই প্রযুক্তিতে।
নতুন ধরনের এই ফাইবারের নাম ইনফিন্না।

প্যাটাগোনিয়া, এইচ এন্ড এম এবং জারার মালিক ইনডিটেক্সের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ইতোমধ্যে এই ফাইবার দিয়ে কাপড় তৈরি করতে শুরু করেছে।

“এই ফাইবারের গুণগত মান ব্যতিক্রমধর্মী। দেখতে শুধু নয়, এটা স্পর্শ করতেও সুতার মতো প্রাকৃতিক বলে মনে হয়,” বলেন মি. আলাভা, “এবং এর ফলে বড় ধরনের বর্জ্য সমস্যারও সমাধান হচ্ছে।”

এক হিসেবে দেখা গেছে সারা বিশ্বে প্রতি বছর নয় কোটি ২০ লাখ টনেরও বেশি কাপড়ের বর্জ্য তৈরি হয়। এই হিসাবটি দিয়েছে অলাভজনক একটি প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফ্যাশন এজেন্ডা।

ধারণা করা হচ্ছে বর্তমানে যে পদ্ধতিতে কাপড় তৈরি করা হয় তা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিবছর কাপড়ের এই বর্জ্যের পরিমাণ বেড়ে ১৩ কোটি ৪০ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে।

ইনফিনিটেড ফাইবার কোম্পানিটি পুরনো ও ব্যবহৃত কাপড় দিয়ে যে ধরনের ফাইবার তৈরি করছে সেটা সাধারণ চোখে দেখতে ভেড়ার উলের মতো- নরম, তুলতুলে এবং ক্রিম কালারের।

মি. আলাভা বলেন, কয়েকটি ধাপে অত্যন্ত জটিল এক পদ্ধতিতে এই ফাইবার উৎপাদন করা হচ্ছে। প্রথমে পুরনো কাপড় কুঁচি কুঁচি করে কাটা হয়। এর ভেতর থেকে সিনথেটিক পদার্থ ও রঙ সরিয়ে ফেলার পর সবশেষে পুরনো কাপড় থেকে বের করে আনা সেলুলোজ দিয়ে নতুন এই ফাইবার তৈরি করা হয়।

পরে এই ফাইবার দিয়ে প্রচলিত উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শার্ট, ড্রেস থেকে শুরু করে ডেনিম জিন্সের মতো সব ধরনের কাপড় তৈরি করা হয়। এসব কাপড়ে তুলা এবং সিনথেটিক ফাইবারের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় নতুন এই ফাইবার।

মি. আলাভা বলেন, ১৯৮০-এর দশক থেকেই এধরনের ফাইবার তৈরির বিজ্ঞানের বিষয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে প্রযুক্তি খাতে দ্রæত অগ্রগতির ফলে এই ফাইবার দিয়ে কল-কারখানায় প্রচুর পরিমাণে কাপড় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।

এছাড়াও তিনি মনে করেন বড় বড় পোশাক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন, যেসব ম্যাটেরিয়াল বা উপকরণ দিয়ে কাপড় তৈরি করা হয়, সেগুলো পরিবর্তন করার ব্যাপারে সত্যিকার অর্থেই আরো বেশি মনোযোগী হয়ে উঠেছে।
কারণ বর্তমান প্রজন্মের ভোক্তারা কী ধরনের পণ্য ক্রয় করছে সে বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন।

“আমার বয়সী মানুষের চেয়ে তারা ভিন্ন ধরনের প্রাণী, ভিন্ন রকমের ভোক্তা,” হাসতে হাসতে বলেন তিনি।
এই প্রযুক্তির ব্যাপারে মি. আলাভার কোম্পানি এতোটাই আগ্রহী যে স¤প্রতি তারা বাণিজ্যিক-ভিত্তিতে কাপড় উৎপাদন করার জন্য একটি কারখানা তৈরিতে ৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করার কথা ঘোষণা করেছে।

লাপল্যান্ডে অবব্যহৃত একটি কাগজের কারখানায় এই ফ্যাক্টরিটি তৈরি করা হচ্ছে।
তাদের লক্ষ্য ২০২৫ সালে কারখানাটি পুরো মাত্রায় চালু হওয়ার পর বছরে ৩০ হাজার টন ফাইবার উৎপাদন করা। প্রায় ১০ কোটি টি-শার্ট তৈরি করতে এই পরিমাণ ফাইবারের প্রয়োজন হয়।

ইনফিনিটেড ফাইবার কোম্পানির সদর দপ্তরের খুব কাছেই আলতো ইউনিভার্সিটিতে ফ্যাশন গবেষণা বিভাগের শিক্ষক কিরসি নিনিম্যাকি বলেন, “আমার মনে হয় এর খুব বড় ধরনের প্রভাব পড়বে, যদি চিন্তা করে দেখেন যে বর্তমান বস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থায় কী বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদন করা হয়ে থাকে।”

“এসব বন্ধ করার ব্যাপারে এটা একটা দারুণ উদাহরণ,” বলেন তিনি।
এই ইনফিনিটেড ফাইবার কোম্পানির বিকাশ ফিনল্যান্ডের ভিশনের সাথেও জড়িত। কারণ রিসাইক্লিং-এর ব্যাপারে দেশটি ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় দেশ হয়ে উঠতে চায়।

এরকম একটি লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য দেশটির সরকার ২০১৬ সালে একটি পরিকল্পনাও প্রকাশ করে। বিশ্বে ফিনল্যান্ডই প্রথম দেশ যারা এবিষয়ে তাদের রোডম্যাপ তৈরি করেছে।

ইনফিনিটেড ফাইবার ছাড়াও আরো কয়েকটি ফিনিশ কোম্পানি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গ্যাস ও রাসায়নিক পদার্থের নির্গমন ও ব্যবহার কমানোর লক্ষ্যে নতুন ধরনের ফাইবার উৎপাদনের জন্য কাজ করছে।

এসব কোম্পানির একটি স্পিন্নোভা যা কাঠের পাল্প থেকে সংগৃহীত সেলুলোজ দিয়ে কাপড় তৈরির ফাইবার উৎপাদন করছে।
তারা সুজানো কোম্পানির সাথে মিলে, যেটি পাল্প উৎপাদনকারী বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ কোম্পানি, কাজ করছে। সুজানোর সদর দপ্তর ব্রাজিলে।

কোম্পানিটি বলছে তাদের কাছে যেসব প্রযুক্তি রয়েছে তার সাহায্যে তারা গমের খড় থেকে শুরু করে ফেলে দেওয়া চামড়ার মতো অন্যান্য উপকরণ দিয়েও কাপড় তৈরির নতুন ফাইবার উৎপাদন করতে পারে।

“বর্তমানে খুব অল্প পরিমাণে উৎপাদন করা হচ্ছে এটা ঠিক, কিন্তু আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে সুজানোর মতো কোম্পানিকে সাথে নিয়ে আগামী ১০ বছরের মধ্যে বছরে ১০ লাখ টন ফাইবার উৎপাদন করা,” বলেন জেন পরানেন, তিনি স্পিন্নোভার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন।

তবে এটা কিভাবে সম্ভব হবে সেবিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে তিনি কিছু উল্লেখ করেন নি। এজন্য কতো অর্থ ব্যায় হবে সেটা বলতেও তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ফিনল্যান্ডের বাইরে কোন দেশে প্রথম এরকম একটি কারখানা স্থাপন করা হবে সেবিষয়েও এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

তারপরেও স্পিন্নোভার উৎপাদিত সুতা সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বড় বড় ফিনিশ কোম্পানি ছাড়াও বিশ্বের নামী দামী ব্র্যান্ডগুলোও কাপড় তৈরিতে তাদের এই ফাইবার ব্যবহার করছে।

মি. পরানেন আশা করছেন তাদের উৎপাদিত ফাইবার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর না হওয়ায় এবং দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারার কারণে সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হবে।

তিনি মনে করেন ওয়াটারপ্রুফ কাপড় অর্থাৎ পানি-প্রতিরোধী কাপড় তৈরির প্রযুক্তির জন্য গোর-টেক্স কোম্পানি যে খ্যাতি অর্জন করেছে, তার স্পিন্নোভাও একইভাবে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠবে।

এধরনের সুতা উৎপাদনের জন্য ইউরোপের আরো অনেক কোম্পানি নতুন প্রযুক্তি তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে। তাদের মধ্যে রয়েছে সুইডিশ কোম্পানি রিনিউসেল এবং ব্রাইট ডট ফাইবার টেক্সটাইলস যারা ২০২৩ সালে নেদারল্যান্ডসে তাদের প্রথম কারখানাটি চালু করার পরিকল্পনা করছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাপড় তৈরির নতুন এই ফাইবারের সামনে রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ।
মিস নিনিম্যাকি বলেন পরিবেশ রক্ষার কথা বিবেচনা করলে পোশাক প্রস্তুতকারক খাত এদিক থেকে এখনও পর্যন্ত আরো অনেক শিল্পের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। তবে এবিষয়ে ধীরে ধীরে অগ্রগতি হচ্ছে, যার উদাহরণ হতে পারে স্পিন্নোভা ও ইনফিনিটেড ফাইবারের মতো কোম্পানি।

এসব কোম্পানি অন্যান্যদের জন্য আশা তৈরি করতে পারে।
“বর্তমানে আমরা যে পদ্ধতিতে কাপড় উৎপাদন করছি তা খুব সহজ। কোম্পানিগুলো ব্যাপক পরিমাণে পোশাক উৎপাদনের জন্য নতুন প্রযুক্তির দিকে ধীরে ধীরে সরে যাবে। কারণ বর্তমান পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য এখনও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়নি,” বলেন তিনি।

তবে তিনি আশা করছেন পরিবেশ-বান্ধব ও টেকসই পোশাক তৈরি করার ব্যাপারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে পোশাক প্রস্তুতকারকদের জন্য নতুন নতুন নীতিমালা তৈরি হওয়ায় বর্তমান “চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আসবে।”

আরো একটি বিষয় হচ্ছে নতুন প্রযুক্তিতে যাওয়ার জন্য পোশাক প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত যে বিপুল অর্থ খরচ করতে হবে, সেটা তারা ভোক্তাদের কাঁধের ওপর ছেড়ে দিতে পারবে কিনা, বিশেষ করে জীবনযাত্রার খরচ যখন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়ে গেছে।

এডিডাসের সর্বসা¤প্রতিক একটি হুডি যা স্পিন্নোভার ফাইবার দিয়ে উৎপাদন করা হচ্ছে, ফিনল্যান্ডে অনলাইনে তার দাম ১৬০ ডলার যা অন্যান্য হুডির চেয়ে ৪০ ডলার বেশি।

“ফ্যাশন একটি জটিল বিষয়। যদিও লোকজন বলে যে তারা পরিবেশের ব্যাপারে সচেতন, তারা কিন্তু সবসময় যৌক্তিক আচরণ করে না। এর সাথে দামের বিষয়টিও জড়িত,” বলেন মিস নিনিম্যাকি।

ইনফিনিটেড ফাইবার এবং স্পিন্নোভা বলছে তাদের ব্যাবসার পরিকল্পনা- নতুন প্রযুক্তি থেকে শুরু করে উৎপাদিত সামগ্রী সবই- সার্বিকভাবে পরিবেশের জন্য ভালো খবর, কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তন প্রতিরোধে যারা কাজ করেন তারা বলছেন এসবের ফলে কার্বন নির্গমন কতোটা হ্রাস পাবে তার হিসেব এখনই করা সম্ভব নয়।

“পাল্প এবং অন্যান্য বিকল্প ফাইবার বস্ত্র উৎপাদনের উপকরণে বৈচিত্র আনবে এবং তার ফলে তুলার ওপর চাপ কমবে। তবে এসব কিছুই নির্ভর করছে তারা কী ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করে, কী প্রক্রিয়ায় করে এবং কিভাবে তারা পোশাক-বর্জ্য ব্যবহার করছে ইত্যাদি বিষয়ের ওপর,” বলেন মাই সুওমিনেন, ডাব্লিউ ডাবিøউ এফের একজন অরণ্য বিশেষজ্ঞ।

তিনি মনে করেন বহু কোটি ডলারের ফ্যাশন শিল্পে শুধুমাত্র এধরনের ফাইবার যুক্ত করলেই সেটা জলবায়ুর পরিবর্তন ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট হবে না, যদি আমরা বর্তমান হারেই কাপড় উৎপাদন ও ক্রয় অব্যাহত রাখি।

“প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার যদি ব্যাপকভাবে কমানো না যায়, তাহলে পরিবেশের টেকসই উন্নয়ন হবে না,” বলেন তিনি।
তবে ফিনল্যান্ডের পোশাক শিল্পে এই ফাইবারকে ঘিরে বড় ধরনের আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছে নতুন ধরনের এই ফাইবারের ব্যবহার বাড়তে থাকলে তা জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবেলায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।

ইনফিনিটেড ফাইবারের প্রধান নির্বাহী পেত্রি আলভা মনে করেন যদি এই প্রযুক্তির পেছনে বিনিয়োগ অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে নতুন উদ্ভাবিত এই ফাইবার পোশাক খাতের মূলধারায় চলে আসবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ