ত্যাগ

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৭, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

আরাফাত শাহীন


পুকুরপাড়ে বড় তালগাছটির গোড়ায় অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে অন্তু। পুকুরের শান্ত পানির দিকে একধ্যানে চেয়ে থেকে কী যেন ভাবছে ও।হয়ত কোন জটিল সমস্যাই হবে। থেকে থেকে ওর ছোট্ট সুন্দর কপালটিতে চিন্তার ভাঁজ দেখা যাচ্ছে। তবে বারবারই ও সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
আগামীকাল ঈদ। ঈদুল আযহা। গ্রামে কুরবানির ঈদ নামেও পরিচিত। এদিন সারা পৃথিবীর মুসলিমগণ পশু কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের চেষ্টা করেন। অন্তু এসব জানে।ইসলাম শিক্ষা বইয়ে বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া আছে। এমনকি পশু কুরবানির প্রেক্ষাপট পর্যন্ত! অন্তুদের বাড়ীতেও আগামীকাল কুরবানি হবে। অন্তুর বাবা বেশ বড় সাইজের একটি গরু হাট থেকে কিনে এনেছেন। এমনিতে পশু জবাই করা অন্তুর পছন্দ নয়। তবে কুরবানিরর পশু জবাই করা ভিন্ন ব্যাপার। অন্তুর বেশ ভালোই লাগে।
অন্তু চিন্তা করছে ওর বন্ধু লাবীবের কথা। লাবীবরা এমনিতেই বেশ গরীব। কুরবানি করার সামর্থ্য ওদের নেই। প্রতিবছর কুরবানি করার পর অন্তু নিজে গিয়ে ওদের বাড়িতে গোশত দিয়ে আসে। লাবীবদের বাড়ির সবাই বেশ খুশি হয়। লাবীবের আম্মু এগিয়ে এসে বলেন,‘তুমি আবার কষ্ট করে এসেছো কেন বাবা? লাবীবকে খবর পাঠলে ও-ই গিয়ে নিয়ে আসতে পারত।’
-আমার একটুও কষ্ট হয়নি চাচী। আমার বরং বেশ ভালোই লাগে।
লাজুক মুখে জবাব দেয় অন্তু।
এরপর লাবীবের আম্মু অন্তুকে জোর করে ঘরে নিয়ে গিয়ে ঈদের দিনে যত প্রকার রান্না করবেন সব অন্তুর সামনে এনে সাজিয়ে রাখবেন। অন্তুর ভীষণ লজ্জা করে। পারলে ও তখুনি দৌঁড়ে পালিয়ে আসে। চাচী কষ্ট পাবেন এই ভেবে অন্তুকে সামান্য কিছু হলেও মুখে দিতে হয়। ফেরার পথে অন্তু জোর করে লাবীবকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে। অন্তুও ওদের বাড়িতে তৈরি সমস্ত খাবার লাবীবকে খাইয়ে তবে ছাড়বে। এমনই সম্পর্ক ওদের দুই পরিবারের মধ্যে।
লাবীবের আব্বু এবার মাটি কাটার কাজে মাদারীপুরের টেকেরহাট গিয়েছেন। এখনও ফিরে আসতে পারেন নি। কোনো একটা কাজে আটকে গিয়েছেন। তিনি আসতে না পারলে লাবীবের এবার একটা নতুন জামা কেনা হবে না। গত ঈদের পুরনো জামাটা দিয়েই এবারের ঈদ কাটাতে হবে। সকালে লাবীবের সাথে দেখা হয়েছিল অন্তুর। ওর মন খারাপ দেখে অন্তুই ওকে জিজ্ঞেস করেছিল,‘কীরে কী হয়েছে তোর? মন খারাপ করে আছিস কেন?’
-আব্বু এখনও কাজ থেকে ফিরে আসতে পারেন নি। ঈদের আগে ফিরে আসতে পারবেন কিনা
জানি না। আব্বু না এলে কেনাকাটা কিছুুই হবে না।
শুনেই মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল অন্তুর। সেই থেকে মন খারাপ হয়ে আছে ওর। কোনোকিছুতেই মন বসছে না। একমাত্র বন্ধুর মন খারাপ থাকলে ও কী করে স্বস্তিতে থাকতে পারে!
কোনোএকটা কাজে অন্তুর আব্বু পুকুরঘাটে এসেছিলেন। অন্তুকে মনমরা অবস্থায় তালগাছের গোড়ায় বসে থাকতে দেখে তিনি এগিয়ে এলেন। অন্তুর কাঁধে আলগোছে হাত রেখে বললেন,‘আমার বাবা এভাবে মন খারাপ করে বসে আছে কেন? কী হয়েছে বাবা?’ অন্তু চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকায়। তারপর হেসে জবাব দেয়। কিন্তু সে হাসিটাকে বড়ই বিষণ্ন মনে হয়।
-না আব্বু কিছুই হয় নি।
-তুমি আমার কাছে কিছু লুকোতে চেষ্টা করছো। কী হয়েছে খুলে বল। দু’জন মিলে একটা সমাধান বেরও করে ফেলতে পারি।
আব্বুর কথা শুনে অন্তু আশ্বস্ত হয়।আব্বু হয়ত ওর সমস্যার কোনো সমাধান বের করেও দিতে পারেন।
অন্তু বলে,‘আমার বন্ধু লাবীব….’
অন্তুর কথা শেষ হবার আগেই আব্বু বলে ওঠেন,‘কী হয়েছে লাবীবের?কোনো গুরুতর সমস্যা হয়েছে?’
-না তেমন কিছু হয় নি। ওর আব্বু এখনও বাড়ি ফেরে নি। তাই ঈদের জন্য কেনাকাটাও হয় নি কিছু ওদের। ওর নতুন কোনো জামাকাপড় নেই। তাই ওর মনটা ভীষণ খারাপ দেখলাম।
-চিন্তার কথা অবশ্যই। এভাবে মন খারাপ থাকলে তো ঈদের আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে। আমার হাতেও টাকাপয়সা নেই এখন…
-আচ্ছা আব্বু, আমি নিজে তো দুইটা জামা কিনেছি তার থেকে একটা জামা লাবীবকে দিয়ে দিলে হয় না? আমার জামা ওর গায়ে ঠিকঠাক লাগবে।
খুশিতে চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে অন্তুর। অবশেষে বেশ ভালো একটা আইডিয়া বের করতে পেরেছে ও। অন্তুর বাবা ছেলের সিদ্ধান্তে আনন্দিত হন। তার সন্তান এখনই ত্যাগের যে আদর্শ স্থাপন করতে যাচ্ছে এই বয়সে এসেও তিনি তা করতে পারেন নি। শুধু গরু কুরবানি দিয়েই ত্যাগী হওয়া যায় না। জীবন চলার পথেও বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।
অন্তুর বাবা বলেন, ‘তোমার সিদ্ধান্ত যথার্থ বাবা। একজন মানুষের মুখে হাসি ফোটানোতে যে সুখ তা অন্য কিছুতেই পাওয়া যায় না।’
-তাহলে আমি এক্ষুণি গিয়ে দিয়ে আসি।
-দাঁড়াও,আমিও যাব তোমার সঙ্গে।
একজন বালকের মুখে সীমাহীন আনন্দের হাসি দেখার তৃপ্তি থেকে তিনি কিছুতেই বঞ্চিত হতে চান না।
লাবীবদের বাড়িতে গিয়ে ওরা দেখতে পায় লাবীবের আম্মু রান্না করছেন আর লাবীর ঘরের দাওয়ায় বসে আকাশের দিকে চেয়ে পা দোলাচ্ছে। অন্তুদের দেখতে পেয়ে লাবীব দাওয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়াল আর লাবীবের আম্মু হন্তদন্ত হয়ে ওদের বসবার ব্যবস্থা করতে লাগলেন। অন্তুর আব্বু বললেন,‘ভাবী আপনি ব্যস্ত হবেন না। আমাদের বসার সময় অবশ্য নেই। অনেক কাজ বাকি পড়ে রয়েেেছ।’
লাবীব ততক্ষণে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসেছে। অন্তুর হাতে রঙিন একটা প্যাকেট দেখে ও বেশ কৌতুহলী হয়ে উঠেছে। অন্তুব আব্বু ডাক দিলে ও একেবার অন্তুর গা ঘেঁসে এসে দাঁড়াল। কেমন যেন লজ্জা লজ্জা লাগছে লাবীবের। অন্তুর হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে লাবীবের হাতে দিতে দিতে আব্বু বললেন,‘এটা তোমার জন্য ঈদ উপহার। ভিতরে একটি জামা আছে। কাল এটি গায়ে দিয়ে অবশ্যই আমাদের বাড়িতে যাবে। কেমন?’
লাবীব সঙ্কুচিতভাবে মাথা নাড়ে। ভীষণ লজ্জা লাগছে ওর। কী দরকার ছিল সকালবেলা অন্তুকে কথাটা বলার! আবার অন্তুর মত বন্ধু পেয়ে গর্বও হল ওর। এমন বন্ধু ক’জনের ভাগ্যে জোটে! শুধু নিজের সুখই নয়,বন্ধুর সুখের দিকেও খেয়াল রাখা মানুষ জগতে ক’জনই বা আছে!