দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে শ্রেষ্ঠত্বের হাসি অভিনন্দন, ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকুক

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২০, ২০২২, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের ফুটবল তথা ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা একটা দিন হয়ে থাকল সোমবার (১৯ সেপ্টেম্বর)। এদিন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এ দেশের ১৬ কোটি মানুষকে উৎসবের উপলক্ষ্য এনে দিয়েছেন নারী ফুটবলাররা। সাফ উইমেনস চ্যাম্পিয়নশিপের ২২ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিরোপা জিতে নিয়েছে লাল-সবুজের দল। দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব এখন অদম্য সাবিনা-মারিয়া ও সানজিদাদের। অবিস্মরণীয় এ অর্জনের পথে অবশ্য বন্ধুর এক পথ পাড়ি দিতে হয়েছে নারী ফুটবলারদের।
২০০৪ সালে বয়সভিত্তিক ফুটবল দিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে পা ফেলার পর গেল কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে সাফল্য পেয়ে আসছিল নারী ফুটবল দল। এ ছাড়া বয়সভিত্তিক সাফে শিরোপা জয়টাকে একরকম ডালভাত বানিয়ে ফেলেছিল এ দেশের কিশোরীরা। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় ভারতকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো অনূর্ধ্ব-১৫ সাফের শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশের স্বর্ণকিশোরীরা। তাদের সেই সাফল্যের শুরুটা বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন দিগন্তের সূচনা এনে দিয়েছিল। এরপর ২০১৮ সালে ভুটানে হওয়া অনূর্ধ্ব-১৮ নারী সাফেও চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ। সবশেষ ২০২১ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা জয় বাংলাদেশের বিজয়ের মুকুটে আরেকটি পালক যুক্ত করে। তবে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে ভালো খেললেও জাতীয় দলে তেমন আশাজাগানিয়া ফল আসছিল না। ২০১৬ সালে সাফ শিরোপার খুব কাছাকাছি গিয়েও স্বপ্নভঙ্গ হয়। ভারতের কাছে হারতে হয়। তবে সাবিনাদের আত্মবিশ্বাসটা বাড়ে গেল জুনে মালয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রীতি সিরিজ জয়ের পর। র‌্যাঙ্কিংয়ে ৬১ ধাপ এগিয়ে থাকা মালয়েশিয়াকে হেলায় হারিয়ে দেয় বাংলাদেশের মেয়েরা। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আগে এ সাফল্যটাই টনিকের মতো কাজ করল। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না নিয়েও কী দুর্দান্ত একটা টুর্নামেন্ট খেলল বাংলাদেশ। একটা পরিসংখ্যান দিলে তা স্পষ্ট হবে। নেপালে অনুষ্ঠিত সাফের ষষ্ঠ আসরের ফাইনালে স্বাগতিকদের ৩-১ গোলে হারানোর আগে গ্রুপপর্বে মালদ্বীপকে ৩-০, পাকিস্তানকে ৬-০, ভারতকে ৩-০ এবং সেমিফাইনালে ভুটানকে ৮-০ গোলে হারিয়েছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার নতুন চ্যাম্পিয়নরা গোটা টুর্নামেন্টেই থেকেছে অপরাজিত। আরেকটা চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে, গোটা টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ গোল দিয়েছে ২৩টি। বিপরীতে খেয়েছে মোটে একটি। বাংলাদেশের মেয়েদের দাপুটে এমন সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা ফুটবল টুর্নামেন্টের। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়েই মূলত আয়োজিত হয় এ টুর্নামেন্ট। একেবারে শৈশব থেকেই মেয়েদের পায়ে ফুটবল তুলে দেয়ার সেই তো শুরু। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০১০ সালে যাত্রা শুরু করে ছেলেদের বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। মেয়েদের বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেসা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের যাত্রা তার পরের বছর। এই টুর্নামেন্ট দিয়েই প্রতিবছর প্রচুর সংখ্যক নারী ফুটবলার উঠে আসছে। দেশের ফুটবলের উন্নয়নে বাফুফের (বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন) স্বদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও নারী ফুটবল নিয়ে কেউ অন্তত তেমন প্রশ্ন তুলতে পারবে না। নারী ফুটবলারদের এ দুর্বার জয়যাত্রার পেছনে লেপ্টে আছে বাফুফের অনেক দিনের সাধনা এবং খেলোয়াড়দের হাড়ভাঙা পরিশ্রম। যার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ছিলেন খোদ বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন এবং বাফুফের নারী উইংয়ের প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরন। এ ছাড়া গোলাম রব্বানী ছোটন সেই ২০০৮ সাল থেকেই নারী ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। এ তিনজনের ঐকান্তিক চেষ্টা আর হার না মানা পরিশ্রমের ফসল আজকের চ্যাম্পিয়নরা। নারী ফুটবলাররা দেশের মানুষের জন্য উৎসবের উপলক্ষ্য এনে দিয়েছে। অথচ মেয়েরা হাফ প্যান্ট পরে খেলবেন, একসময় অনেকেই তা মেনে নিতে চাননি। সমাজের সেই রক্ষণশীলতার পর্দা ছিঁড়ে এ দেশে প্রথম মেয়েদের ফুটবল অনুশীলন শুরু করেছিলেন প্রয়াত কোচ সাহেব আলী। আজ বেঁচে থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন তিনিই। অথবা যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এমন সাফল্য তাদের সবার প্রতি রইল শ্রদ্ধা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ