দহন প্রবাহ

আপডেট: মার্চ ২০, ২০২০, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ

আসমা ঊষা


যাতনা এঁকেছি বহু,
তুমিও দাও নি কম।
বয়েছে তপ্ত লহু,
দু’জন রুদ্ধ-দম।
যখন বেসেছো ভালো,
যখন চেয়েছো মোরে,
যে প্রেম প্রদীপে জ্বালো
আমারে প্রতিমা করে,
বুঝি নি,অবোধ ক্রূর।
দেখি নি, অন্ধ চোখ।
কাছে রয়ে তবু দূর
কেঁদেছে তোমার শোক।
তবুও বলো নি কভু
নিরবে পুজেছো খুব।
মরেছো, জানি নি তবু।
কোথা দিয়েছিনু ডুব!
তোমার ছিলাম হয়ে,
তোমারই হস্তে নীল,
তোমারে বক্ষে লয়ে
তেড়েছি অচেনা চিল,
ছুঁয়েছো গভীর তুমি,
ধরেছো গলিত কায়া,
মমতা এসেছে নুমি,
গেঁথেছে উভয় ছায়া,
আঁচড়ে দিয়েছো কেশ,
গ্রীষ্মে ফুঁয়েছো পিঠ,
আগলে ভূষণ-বেশ,
পিষেছো দস্যু কীট,
অসুখে করেছো সেবা,
একাকী বেঁধেছো হাত,
থাকতো অমন কে বা
জাগর দীর্ঘ রাত!
আমার বেণিতে থাকো,
আমার আঁচলে মাখা,
আমাতে সত্ত্বা ঢাকো,
আমি যে তোমাতে রাখা।
জগৎ চিনেছে ঠিক
অঘোষিত বন্ধন,
হাঁটিয়াছি নির্ভীক
ওতপ্রোত সারাক্ষণ।
কুট নজরের বিষে
ঘোষণার আগে ছেদ,
হারাইয়া ফের দিশে
লইয়া জাগদ ক্লেদ
ছিন্ন হওয়ার ভান,
ভুলের আদলে যেন।
টুটেছে ভাঙন বান,
তখনও বুঝি নি কেন!
আমার মূর্খ প্রাণ
জানে নি কে ছিলে মোর,
শ্বাস ছিলো যেই ঘ্রাণ
ছুটলে ধ্বসেছে ঘোর!
যে ব্যথা নিয়েছো একা,
যত কাঁদিয়াছো দুখে,
আমারে দিয়েছে দেখা
মরণ শুষেছি মুখে।
বেদনাক্লিষ্ট হিয়া
আমার হেলার দায়ে
টেনেছে নতুন প্রিয়া
মলম লাগাতে ঘায়ে।
তবুও আমারই ছিলে,
তবুও আছিলে পাশে,
পীড়নের সুরা গিলে
মরে মরে প্রতি শ্বাসে
করে গেছো উপাসন,
বুঝি নি দহন কিছু।
স্বার্থ অন্ধ মন
নিয়েছে মোহের পিছু।
দিন শেষে অতঃপর
যেদিন বুঝিনু প্রেম,
গড়েছো অপরে ঘর
ছাইয়ের পাত্রে হেম।
তবুও শুরুর কালে
যে দিন জেনেছো বোধ,
চুমেছো ওষ্ঠে ভালে
হীম আদরের শোধ।
কিন্তু নিয়ম ভবে
প্রকৃতিও ছল আঁকে।
হীম, হীম রয় কবে
যেখানে প্রণয় থাকে?
পরশ উষ্ণ হয়
দিবস রাত্র জুড়ে,
জাগে হারাবার ভয়
যদি চলে যাও দূরে!
আছে সতীনের ঘর,
আছে সময়ের ভুল,
গহীনে ভীতির ঝড়,
ভাঙে মোর তিন কুল!
যে তুমি চেয়েছো দেবী,
যে তুমি জড়াও প্রেমে,
সে দেবী তোমারে সেবি,
মর্ত্যে এসেছি নেমে।
এবার তাহারে ছাড়ো,
আমারে না পেয়ে যারে
টেনেছিলে, ক্ষতি তারও!
কেন বা ঠকানো তারে!
তখন তোমার জেদ,
তখন অহং জাগে,
একে একে সব ক্ষেদ-
‘কেন আসিনাই আগে,
কেন বাসিনাই ভালো,
যখন কেঁদেছো টুটে,
ছুঁয়েছো মরণ কালো,
কেন আসিনাই ছুটে!
কেন দেরি হলো এত!
কেন বা বছর গেলো?’
এভাবে প্রহর যেত…
ক্ষয় আমাদের পেলো!
ক্ষুব্ধ হয়েছো জানি,
তবুও ছাড়ো নি বটে,
দু’প্রান্তে টানাটানি
কত কিছু গেছে ঘটে।
চেয়েছি তোমার সুখ
আত্মাহুতির আড়ে,
আর দেখাবো না মুখ
যে মুখ শান্তি কাড়ে।
বিফল হয়েছি হায়
মরতে পারি নি আমি!
নুন নিয়ে কাঁচা ঘায়
যেচেছি তোমারে স্বামী।
চেয়েছি ছাড়িয়া দাও,
নতুবা গ্রহণ করো,
জানো নি তুমি কী চাও,
দ্বিধাদের করে জড়ো
দুই প্রান্তের মাঝে
দুলেছো প্রবল নিজে।
রাত্রি এনেছো সাঁঝে
সেচ নিষ্ফল বীজে।
বিপদে বন্ধুজন
কেহই ছিলো না পাশে,
গোপনে করেছে পণ,
হেসেছে সর্বনাশে,
শেকড় কেটেছে তলে,
চায় নি মোদের মিল,
ফেলেছে জটিল কলে,
তালকে করেছে তিল।
তবু বিধাতার চাওয়া-
ছেদ সয়ে বারবার,
বিদায় কসম খাওয়া,
তবুও মর্জি তাঁর-
অটুট বাঁধনে বাঁধা
আমরা হৃদয়দ্বয়!
অভিমানে কত কাঁদা,
তবুও ছিন্ন নয়!
কিন্তু এখনও কাছে
দায়ের মধ্যে দায়,
আরেক প্রেমিকা আছে
যে আজও তোমারে চায়।
বেদনা যতই দৃঢ়,
যতই মরণ আসে,
তবু চাই সুখ-চির
তোমার খেলার তাসে।
যদি সুখী হও তায়
তাহার আঁচলে ফেরো,
দূর হোক সব দায়,
দু’হাতে মিলন ঘেরো।
আমি চলে যাবো দূরে,
কাঁদবো না নীল চোখে,
না ডেকে করুণ সুরে
ফিরে যাবো সুরলোকে।
নতুবা বক্ষ চিরে
সত্য জানাও তারে,
ক্ষমা চাও নতশিরে,
যে প্রেমিক, সেই পারে।
দুইটি নৌকা নয়
এমন হয় না ভবে।
গোপনে যা কিছু হয়
পাপ নাম পায় তবে।
অথচ, এ পাপ কিসে?
পরশের নাম প্রেম!
প্রণয়ীরা হারাদিশে
যা করে, তা করলেম
যদি, তা কিসের পাপ!
কেন তা ঘোর অন্যায়?
এশকে রেখেছি ছাপ,
যে ছাপ আশেক দেয়।
শুধু এ চিলতে দোষ-
আরও এক ঘর আছে,
কুড়াবে ত্রিকাল রোষ,
সত্য রাখো নি কাছে।
হয়তো জানো, সে জানে,
তবুও তোমার দায়।
দৃঢ়স্বরে তার কানে
শোনাও ন্যায়ের রায়।
হয়, সে বালার হও,
নয় ত্যাগ দাও মোরে,
কী চাও পষ্ট কও,
বলো চিৎকার করে!
এই মর-মর প্রাণ
সইতে না পারে আর,
এইবার দাও ত্রাণ,
কী যে ছক বিধাতার!
যদি না বাসো রে ভালো
কেন রাখিয়াছো বেঁধে?
কেন এ আগুন জ্বালো
স্বয়ং দহিছো সেধে!
এ জনমে বলো কত
দহন কুড়াবো আর?
ক্রন্দন অবিরত
হয়ে গেনু ছারখার!