দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে দলের সক্রিয়তা চাইলেন শেখ হাসিনা

আপডেট: অক্টোবর ২২, ২০১৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ণ


সোনার দেশ ডেস্ক
আওয়ামী লীগের ২০তম সম্মেলন উদ্বোধন করে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দলের নেতা-কর্মীদের সক্রিয়তা প্রত্যাশা করেছেন শেখ হাসিনা।
সিকি শতকের মধ্েয সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কী কী করছে, শনিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দলের সম্মেলনে তা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
ক্ষমতাসীন দলটির এবারের সম্মেলনের স্লোগানই ছিল- ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলেছি দুর্বার, এখন সময় বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার’।
আওয়াম বা জনগণের দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে তুলে ধরে তা নেতা-কর্মীদের মনে করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “জনগণের দায়িত্ব আমাদের।”
২০৪১ সালের মধ্েয দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়তে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার যে কাজ করছে, তা এগিয়ে নিতে নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে আর দারিদ্র্য থাকবে না। দরিদ্র্য বলে আর কিছু বাংলাদেশে থাকবে না।
তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতা, সংসদ সদস্যসহ দলের নেতা-কর্মীদের হতদরিদ্রদের তালিকা করার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “স্ব স্ব এলাকায় কতজন দরিদ্র্য, গৃহহারা মানুষ আছে, যাদের ধন নাই, বাড়ি নাই, নিঃস্ব-রিক্ত, প্রতিবন্ধী ও বয়োবৃদ্ধ আছে, তাদের তালিকা করেন, আমরা তাদের বাড়ি করে দেব।”
দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার প্রত্যয় জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ হবে ক্ষুধামুক্ত দেশ। কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ কোনো বৈষম্য থাকবে না। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় ব্যবস্থা নেব। শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাবে, বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হবে।
২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীতের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “প্রতিটি সেক্টরে যেন উন্নয়ন হয় সেজন্য ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। মাইক্রো ক্রেডিটের পরিবর্তে মাইক্রো সেভিং করে দারিদ্র্য দূর করতে সফল হচ্ছি।”
সমৃদ্ধ বাংলাদেশের লক্ষ্য নিয়ে ২০তম সম্মেলন করছে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া দলটি। সকালে বর্ণাঢ্য আয়োজনে সম্মেলন উদ্বোধন করেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের ছয় বছর পর ৩৫ বছর আগে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নেন শেখ হাসিনা। তারপর থেকে টানা দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন শেখ হাসিনা।
বিদেশে থেকে স্বজন হারানোর বেদনা তুলে ধরার সঙ্গে তার দেশে ফেরার আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের আত্মত্যাগও উঠে আসে বঙ্গবন্ধুকন্যার বক্তব্যে।
“আওয়ামী লীগের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। সে সময় যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা আমাকে দেশে আসার অনুমতি দেয়নি। কিন্তু তারা শত চেষ্টা করেও পারেনি। আওয়ামী লীগ আমাকে সভাপতি করে দেশে নিয়ে এসেছিল।”
“আমাদের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা আত্মত্যাগ, শত আঘাত ও শত ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে এই সংগঠনকে ধরে রেখেছে। আওয়ামী লীগ জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে বাংলাদেশে সকল অর্জন এনে দিয়েছে। আজকের বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।”
প্রতিবেশী দেশগুলোসহ বিদেশি অতিথিদের সামনে বক্তব্েয শেখ হাসিনা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তার সরকারের কঠোর অবস্থানের বিষয়টিও তুলে ধরেন।
“আমাদের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। জিরো টলারেন্স এগেইনেস্ট টেররিজম। আমরা জঙ্গিবাদকে কখনোই প্রশ্রয় দেব না। এ দেশের ভূ-খ- কেউ কোনো সন্ত্রাসী কর্মকা-ে ব্যবহার করতে পারবে না।”
নৌকা আকৃতির বিশাল মঞ্চে বক্তব্য রাখেন শেখ হাসিনা
বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ‘প্রাচ্য-পাশ্চাত্েযর সেতুবন্ধন’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও জানান তিনি।
সভাপতির ভাষণের পর সম্মেলন মুলতবি করেন শেখ হাসিনা। দুপুরে খাবারের বিরতির পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হয়। এই অধিবেশনেই দলের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ও নতুন নেতৃত্ব গঠিত হবে।
গত ৩৫ বছর ধরে নেতৃত্ব দিয়ে আসা শেখ হাসিনা সম্প্রতি বলেন, অবসরে যাওয়ার সুযোগ পেলে তিনি ‘খুশি’ হবেন। তবে দলীয় নেতারা বলে আসছেন, আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে শেখ হাসিনার বিকল্প নেই।
আলোচনা চলছে সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে। সভাপতির পর সাংগঠনিক দিক দিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই পদে গত দুই বারের সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামই থাকছেন, না নতুন কোনো মুখ দেখা যাবে- সে প্রশ্ন ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেও।
বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে পেয়ে উচ্ছ্বসিত আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতারা তাকে দলের আগামী কমিটিতে রাখার দাবি তুলেছেন।
শনিবার সকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের পর শুরু হওয়া কাউন্সিল অধিবেশনে বিকালে যোগ দেন শেখ হাসিনার ছেলে জয়।
মা শেখ হাসিনার তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকা জয় পিতৃভূমি রংপুর থেকে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর হয়েছেন।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে কাউন্সিল অধিবেশন চলার মধ্যে বিকাল সাড়ে ৩টায় উপস্থিত হন জয়।
জয়ের উপস্থিতির কথা আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ মাইকে ঘোষণা করলে প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষকরা সচকিত হয়ে ওঠেন তাকে দেখার জন্য।
এসময় জয় মঞ্চের সামনে বসে ছিলেন। তাকে মঞ্চে ওঠার অনুরোধ জানানো হয়। তখন তাকে মঞ্চে নিয়ে যান আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ।
মঞ্চে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মাঝের আসনে বসেন জয়।
প্রধানমন্ত্রীপুত্র বসার পর সৈয়দ আশরাফ মাইকে বলেন, “জয়, তুমি একটু উঠে দাঁড়াও। সবাই তোমাকে দেখতে চায়।”
তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা আমাদের শেষ ভরসা। আর এখানে আছেন আরেকজন শেষ ভরসা। তিনিই নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নেবেন।”
দুই বারের সাধারণ সম্পাদক আশরাফ বলেন, “জয় এসেছে। তার বন্ধুরা আসবে। সহপাঠীরা আসবে। দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
“আমাদের বয়স হয়েছে। খুব বেশি কিছু দেয়ারও নাই, শক্তিও নাই।”
“নতুনদের আসার সুযোগ করে দিতে হবে। তারা যেন এই এই আওয়ামী লীগকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে,” বলেন শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত আশরাফ।
কাউন্সিলে এসময় বিভিন্ন জেলা থেকে আসা প্রতিনিধিরা আলোচনা করছিলেন। জয় আসার পর তার কথাই প্রাধান্য পায় আলোচনায়।
সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, “জয়কে আমরা ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে দেখতে চাই।”
শেখ হাসিনার ছেলেকে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়ার দাবি জানিয়ে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন বলেন, “তাকে সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আনতে হবে।”
চট্টগ্রাম (উত্তর) জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম বলেন, “আমরা সজীব ওয়াজেদ জয়কে কেন্দ্রীয় কমিটিতে দেখতে চাই।”
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক বলেন, “আগামী দিনের নেতৃত্বে থাকবেন জয়।”
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী জয়কে কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ দেয়ার দাবি জানান আওয়ামী লীগের যুক্তরাষ্ট্র শাখার সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানও।
বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্রকে নেতৃত্বে আনার কথা বললেও শেখ হাসিনাকে তার নির্ধারিত কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিদায় না নেয়ার আহ্বান জানান।
“নেত্রী আপনি আমাদের মা। ১৬ কোটি জনতার মা। জয়ের দিকে তাকিয়ে আছে ১৬ কোটি মানুষ। যে আপনার অবর্তমানে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে পারবেন। তবে, যে যুদ্ধ আপনি শুরু করেছে, সে যুদ্ধ শেষ করে আপনাকে বিদায় নিতে হবে।”
খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হারুনার রশীদ শেখ হাসিনার তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টার পক্ষে সকলকে হাত উঁচু করতে আহ্বান জানিয়ে বলেন, “দেখেন সকলে হাত উঁচু করেছে। জয়কে সম্মানজনক পদ দেয়া হোক।”
এই পুরোটা সময় জয় মঞ্চেই ছিলেন। তিনি কিছুক্ষণ আশরাফের সঙ্গে এবং মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলছিলেন।  প্রথম দিনের অধিবেশন শেষে সন্ধ্যায় জয় তার মায়ের সঙ্গে কাউন্সিলস্থল ত্যাগ করেন।
দুপুরের পর কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগের জোট শরিক ১৪ দলের পক্ষ থেকে ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া এবং কমিউনিস্ট কেন্দ্রের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অসিত বরণ রায় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন।  এর আগে সকালে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বিদেশি অতিথিরা বক্তব্য রাখেন।
বিকাল ৫টার পর ২০তম সম্মেলনের কাউন্সিল অধিবেশন মুলতবি করেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
রোববার সকাল সাড়ে ৯টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে কাউন্সিল অধিবেশন পুনরায় শুরু হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, রোববার কাউন্সিলর এবং তৃণমূল নেতাদের কেউ আলোচনার জন্য তিন মিনিটের বেশি সময় পাবেন না।
তিনি জানান, রোববার গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্রের সংশোধন অনুমোদন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ড গঠনের পর বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত করা হবে।- বিডিনিউজ