দারিদ্র দমাতে পারেনি ওদের ৪ জনকে

আপডেট: June 3, 2020, 12:04 am

আমানুল হক আমান, বাঘা :


বাম থেকে রিশা, অনিক, মুসা, সৌরভ-সোনার দেশ

নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ওরা এগিয়ে গেছে সামনে। পেটের ক্ষুধার কষ্ট, আর্থিক অনটন দারিদ্র্যের দৈন্যতা দমাতে পারেনি ওদের ৪ জনের মনোবল। অভাব অনটনের সংসারেও কঠিন ব্রত ছিল পড়াশোনা চালয়ে যাওয়ার। পণ ছিল যে করেই হোক এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করতে হবে। তাই সব বাধা পেরিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে সাফল্যের সারথি ওরা ৪ জন। তবে চরম দারিদ্র্যের কারণে নিজেদের ভবিষৎ নিয়েও শঙ্কিত ওরা।
রিশা খাতুন : নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শুধু এসএসসিতে নয়, অষ্টম শ্রেণিতেও গোল্ডেন এ-প্লাস ও পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল রিশা। নিজের আগ্রহ, মা-বাবার অনুপ্রেরণা আর শিক্ষকের সহযোগিতায় ফলাফল ভালো করে এবার উপজেলার দাদপুর গড়গড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে। অভাবের বাধ ভেঙ্গে সাফল্যের চ্যালেঞ্জ এখন সামনের দিকে। নিজেকে আলোকিত করে হাঁসি ফুটিয়েছে মা-বাবার মুখে। দুশ্চিন্তা এখন ভালো কলেজে ভর্তি নিয়ে।
কৃষক পরিবারের গৃহিণী মা নুরুন্নাহার জানান, জায়গা জমি বেশি নাই। চার সদস্যর সংসার চলে স্বামীর উপার্জনের টাকা দিয়ে। রিশার পড়ালেখার জন্য বাড়তি কোনো টাকা দিতে পারেনি তার বাবা। এজন্য গরু পালন আর হাতের কাজ করে পড়ালেখার খরচ যোগাতে হয়েছে। সুযোগ বুঝে রিশা নিজেও টিউশন করেছে। এর ফাঁকে আমার কাজেও সহযোগিতা করতে হয়েছে রিশাকে। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে মেয়ের পড়ালেখা নিয়ে শঙ্কিত মা-বাবা। তবে নিজের ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে চিকিৎসক হতে চাই রিশা। উপজেলার চকএনায়েত গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম পটলের এক ছেলে এক মেয়ের মধ্যে রিশা বড়। তার ছোট ভাই চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র।
উপজেলার দাদপুর গড়গড়ি উচ্চ বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক এমদাদুলল হক জানান, শিক্ষক আর শিক্ষার্থীদের আগ্রহে ফলাফল ভালো করেছে আমার প্রতিষ্ঠান।
অনিক ইসলাম : রাত জেগে লেখাপড়ার সময় ঘুম হওয়ার ভয়ে অনেক সময় হোমিওপ্যাথি ওষুধ সেবন করেছে অনিক। সে অদম্য ইচ্ছার কারণে ছুটির দিনে বাবার সাথে শ্রমিকের কাজ আর টিউশনি করেছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে উপজেলার বেলগাছি গ্রামের দিনমজুর সায়নাল উদ্দীনের ছেলে অনিক ইসলাম। সে ইসলামী একাডেমী উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি ও কৃষি কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল অনিক। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়িয়ে নিজের পড়ার খরচ চালিয়েছে। এভাবেই পড়াশুনা করে অষ্টম শ্রেণিতে গোল্ডেন এ প্লাস ও পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল। বাবার সম্বল বলতে তার দাদার বাড়ি-ভিটার ৫-৬ কাঠা জমি। আর্থিক দৈন্যতার কারণে নিজের দায়িত্ব নিজে নিয়েই শুরু করে লেখাপড়া। হাঁস মুরগি পালন করে খরচ যুগিয়েছে গৃহিণী মা ময়না বেগম। দুই ভাইয়ের মধ্যে অনিক বড়। তার ইচ্ছা চিকিৎসক হওযার।
সৌরভ : খানপুর জেপি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এবার গোন্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে সৌরভ। সে উপজেলার চাদপুর গ্রামের দিনমজুর আমিরুল ইসলামের ছেলে। অষ্টম ও পঞ্চম শ্রেণিতেও গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছিল।
এ বিষয়ে মা অমেনা বেগম জানান, কোনো কোনো দিন সকালে নাস্তা করার মতো খাবার থাকে না ঘরে। এ জন্য বহুবার তাকে না খেয়ে স্কুলে যেতে হয়েছে। নিরূপায় হয়ে কোনো কোনো সময় পাশের বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ করতে হয়েছে। অর্থাভাবে এসএসসি পাসের পর লেখাপড়া বন্ধ করে মেজো মেয়ে লুবনাকে বিয়ে দিয়েছি। নানা দুর্ভোগের মধ্যেও পড়াশোনা থেকে পিছপা হয়নি সৌরভ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সৌরভের মা অভিভুত হয়ে কষ্টের এসব কথা জানিয়ে বলেন, দরিদ্র পিতার বোঝা হলেও ছোট বেলা থেকে তার গর্ভের ছোট ছেলে সৌরভের লেখাপড়ার আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। কিন্তু তার বাবা লেখাপড়ার জন্য কোনো টাকা পয়সা দেয়নি। তার বাবার উপার্জনের টাকা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে। বিদুৎ চলে গেলে অর্থাভাবে বাড়তি আলো জ্বালাতে পারিনি। বাড়ি ভিটার ৬-৭ কাঠা জমিই সম্বল। ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার কথা জানান সৌরভ।
খানপুর জেপি উচ্চ বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমান জানান, ফলাফল ভালো করে শুধু মা-বাবারই নয়, প্রতিষ্ঠানেও মুখ উজ্জ্বল করেছে। তবে প্রবল ইচ্ছা শক্তি থাকলে ভবিষতে অর্থের কাছে হার মানতে পারে হতদরিদ্র মেধাবীরা।
আব্দুল্লাহ আল মুসা : বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোন্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে আব্দুল্লাহ আল মুসা। সেও ইসলামী একাডেমী উচ্চ বিদ্যালয়,কারিগরি ও কৃষি কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল।
তার মা লাভলি বেগম জানান, কখনো কখনো তার বাবা কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে বলতেন বাজার থেকে কিছু কিনে খেয়ে নিও। ওই টাকা খরচ না করে যক্ষের মতো আগলে রাখতো মুসা। এভাবে টাকা জমিয়ে খাতা ও কলম কিনতো সে। এক ছেলে এক মেয়ের মধ্যে ছোট মুসা। আর্থিক সংকটের কারণে বড় মেয়ে ইসরাত জাহানকে এইচএসসি পাশ করার পর বিয়ে দিয়েছেন। হাঁস মুরগি পালন করে দুইজনের লেখা পড়ার খরচ জুগিয়েছেন।
মুসা জানায়, অস্বচ্ছল সংসারে সুযোগ বুঝে ছুটির দিনে বাবার সাথে মাঠে শ্রমিকের কাজও করতে হয়েছে। বাড়িতে হাতের কাজ করে মা যে টাকা পেয়েছে, তাই দিয়ে লেখা পড়ার খরচ চালিয়েছি।
উচ্চ শিক্ষা নিয়ে চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা তার। সে বাঘা পৌরসভার মর্শিদপুর গ্রামের দিনমজুর ইনছার আলীর ছেলে। সম্বল বলতে বাড়ি ভিটার সাড়ে ৭ কাঠা জমি।
ইসলামী একাডেমী উচ্চ বিদ্যালয়,কারিগরি ও কৃষি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ জানান, মেধার কারণে স্কুল থেকে তাদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠান থেকে ১২৩ জন পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ১২২ জন। এর মধ্যে গোল্ডেন এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৪ জন। উপজেলায় প্রথম স্থানে আছে এই প্রতিষ্ঠান।
বাঘা দরগা মেডিকেল হলের চিকিসৎক আবদুল লতিফ মিঞা জানান, ওই ৪ জনই দরিদ্র এবং মেধাবী। তাদের বাড়ির ভিটা ছাড়া কিছুই নেই। এই মেধাবীদের কাজে লাগাতে হলে কোনো সুহৃদয় ব্যক্তিকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।