দালাল বিষয়ক কথকতা

আপডেট: অক্টোবর ২১, ২০১৯, ১:২৩ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন

পূর্ব প্রকাশিতের পর)


আমি বৃদ্ধ মানুষ কোথায় যাবো, কার হাতে-পায়ে ধরবো, কোথায় লাইনে দাঁড়াবো, লম্বা লাইনে কী করে টাকা জমা দেবো ইত্যাদি নানা ঝামেলা। যে দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ বেকার সে দেশে ছাপোষা মানুষের সংখ্যাও নেহাৎ কম নয়। তাঁদের আমরা কী ভাবে সাহায্য করবো? তাদের সাহায্য সহযোগিতা করা আমাদের সকলেরই নৈতিক দায়িত্ব।
পূর্বেই বলা হয়েছে, বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে দালালদের দৌরাত্ম্য চরমে উঠে গেছে বলে খবরে প্রকাশ। সরকারি হাসাপাতাল হোক বা বেসরকারি হাসপাতাল হোক না কেন এই ব্যবসা বেশ লাভজনক ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন এগুলো নাকি রোগী ধরার ফাঁদে পরিণত হয়েছে। এ ব্যাপারে আমার অবশ্য কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। তবে বিভিন্ন ডাক্তাররের কাছে রোগী নিয়ে গিয়ে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তা সুখকর নয়। ডাক্তারদের ফি খুব যে বেশি তা নয়। তবে ডাক্তার সাহেবেরা মানুষের দেহকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বুঝতে বিভিন্ন টেস্টের জন্য যে ফিরিস্তি লেখেন তাতে খরচ হয়ে যায় বেশ কয়েক হাজার টাকা, যা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের খরচ করার সমর্থ থাকে না। এও শোনা যায় যে ডাক্তাররের নাকি রোগী ধরার জন্য দালাল বা এজেন্টের সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে থাকেন, কিছু সম্মানীর বিনিময়ে যা ডাক্তারি পেশার একটি আদর্শ বিরোধী নিন্দনীয় কাজ। তাঁরা কি তবে হিপোক্র্যাটিসের দর্শন ও চিন্তা ভাবনার কথা একেবারে ভুলে গেছেন এবং তাঁর দর্শন থেকে বিচ্যুতি হয়েছেন, যা কোনোক্রমেই কাম্য নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিপোক্র্যাটিস চিকিৎসকদের জন্য যে শপথবাণী রেখে গেছেন, “আমি আমার জীবন ও এই পেশাকে পবিত্র, সুন্দর, নির্মল করে রাখবো”, ইতিহাসে তা আজও অম্লান। তবে কেন তাঁরা এই লজ্জাজনক কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারছেন না।
এবার ধরা যাক পানি ও গ্যাস লাইনের সংযোগ নেয়ার ইতিবৃত্ত। গ্যাসের লাইন নিতে হলে তা নিতে হবে ঠিকাদারের মাধ্যমে। গ্যাস কোম্পানি সরাসরি কোনো লাইন দেবে না। একটা গ্যাসের লাইন নিতে কয়েক হাজার টাকা খরচ করতে হয়, যার তিন ভাগের এক ভাগও গ্যাস কোম্পানিতে জমা হয় না। সবকিছুই ঠিকাদার ও অন্যরা সম্মানী হিসেবে গ্রহণ করে। এই হাজার হাজার টাকা গ্রাহককেই দিতে হয়। এক্ষেত্রে আমরা কি বলবো, সাহায্যকারী, মধ্যস্থকারী, না দালাল। পরোক্ষভাবে কি বোঝায়, তা ব্যাখ্যা করার কোনো প্রয়োজন আছে কি? পানি সংযোগের ক্ষেত্রে একই নিয়ম অনুসৃত হয়।
আমার এক আত্মীয় ডাক্তারের সঙ্গে দেখা হলো। সে পি.এর এল শেষ করে পেনশনের কাগজপত্র তৈরি করছে, “কিন্তু No demand certificate” এর অভাবে তা দাখিল করতে পারছেন না। ডাক্তার মানুষ এমনিতেই ব্যস্ত, তার উপরে বিভিন্ন অফিসে ঘোরাঘুরি করার তার তো সময় নেই। আমরা যতদূর জানি যে প্রতিষ্ঠানে সর্বশেষ কাজ করেছে, সেখান থেকেই না দাবি সার্টিফিকেট নেয়া হয় বা দেয়া হয়। এখন নাকি নিয়ম হয়েছে একমাত্র সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্য কেউ এই সার্টিফিকেট দিতে পারবে না। না-দাবি সার্র্টিফিকেট ইস্যু করা একটি রুটিন ওয়ার্ক। এখানে মন্ত্রণালয়ে নথি পাঠানোর কোনো প্রয়োজন আছে কি? মন্ত্রণালয়ে কোনো নথি যাওয়া মানেই তো কয়েক মাসের ব্যাপার, বছরও লেগে যেতে পারে। ফাইলের পেছনে না ঘুরলে তো ফাইল আর নড়বে না। ফলে বাধ্য হয়েই ভুক্তভোগী অফিসার তৃতীয় ব্যক্তির সাহায্য নেবে, যাতে করে ফাইল এত টেবিল থেকে অন্য টেবিলে যেতে পারে। এখন এই ব্যক্তিকে আপনি কী বলবেন, দালাল, না সাহায্যকারী, না মাধ্যস্থতা কারী? যে নামেই আমরা তাদের আখ্যায়িত করি না কেন, তাদের যে প্রয়োজনীয়তা আছে, একথা অস্বীকার করি কী করে? পেনশনের টাকা তোলা হয়তো বা সহজ হয়েছে, কিন্তু পেনশনের, কাগজপত্র তৈরি করা তো ততো সহজ হয়নি।
অন্য এক ধরনের সাহায্যকারী বা দালাল আছ্নে যারা উচ্চ পর্যায়ে দালালি করেন। তাদের কাজ মন্ত্রণালয়েই বেশি থাকে। তা ছাড়া তারা বিভিন্ন দপ্তরে ও অধিদপ্তরে ঘুরে বেড়ায়। কারও কোনো জটিল সমস্যা থাকলে তা তারা সমাধান করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে এবং সফলও হয়। আমার জানামতে এক ভদ্রলোক কোনো এক স্বায়ত্বশাসিত অফিসে কাজ করতেন। দীর্ঘ ৩৫ বছর চাকরি করার পর তিনি অবসরে যান। কিন্তু পেনশনের টাকা তুলতে পাচ্ছেন না, তার বিরুদ্ধে নাকি মামলা আছে। তাও আবার দেওয়ানি, যার রায় হতে কয়েক বছর থেকে বিশ বছরও লেগে যেতে পারে। এখন কী করা যায়। তিনি পড়লেন মহা-বিপদে। একজন ভদ্রলোক তাঁকে বুদ্ধি দিলো একজন দালাল ধরতে, যারা এসব জটিল সমস্যার সমাধান করে ফেলে। যাকে ধরা হলো সে আবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আত্মীয়। লেনদেন সম্পর্কে আলোচনা চলতে লাগলো। ভদ্রলোক (দালাল) বললো, “আপনি তো ৯ লাখ টাকা পাবেন, তার মধ্যে থেকে আমাকে তিন লাখ টাকা দেবেন, আর আপনার থাকলো ৬ লাখ টাকা।” ভুক্তভোগী উত্তরে বললো, “দেখুন আমার ৩৫ বছরের সাধনার ফসল, এই টাকাটা, দয়া করে একটু কম করলে হয় না।” শেষমেশ ফাইনাল হলো দালালকে ২ লাখ টাকা দিলেই চলবে”। যেই কথা, সেই কাজ। দালাল ভদ্রলোক তার আত্মীয়কে দিয়ে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে ফোন করানো হলো এবং অফিস প্রধানকে ধমকও খেতে হলো। আদেশ দেওয়া হলো তিন দিনের মধ্যে তাঁর পেনশনের সমুদয় টাকা মিটিয়ে দিয়ে তাঁকে (বসকে) যেন ফোনে জানিয়ে দেয়া হয়। আর যায় কোথায়। এক সপ্তাহের মধ্যে ভদ্রলোক তাঁর ৯ লাখ টাকা পেলেও তার কাছে থাকলো ৭ লাখ টাকা। দালাল বাবুকে ধন্যবাদ। এই দালালকে আমরা খারাপ বলবো কী ভাবে। আমাদের দেশে মানুষকে হয়রানি করার প্রবণতা এতই বেশি যে দ্বিতীয় ব্যক্তির সাহায্য ছাড়া কোনো কিছু করা যায় না। কেউ তিলমাত্র মানুষকে সাহায্য করতে চায় না। আমাদের এই সংস্কৃতি থেকে অবশ্যই বের হয়ে আসতে হবে।
তহশীল অফিসে যান, সেখানেও দেখবেন আপনাকে সাহায্য করার জন্য লোক বসে আছে। আপনাকে একটা ফরম দেবে, আপনার অভিযোগ পত্র পেশ করার জন্য। ফরমটি এমনই যে, সেটা পূরণ করতে আপনার অন্যের সাহায্য নিতে হবে, আপনি যতই উচ্চ শিক্ষিত হন না কেন। যে ব্যক্তি আপনাকে ফরম পূরণের ব্যাপারে সাহায্য করলেন, সে তো বিনিময়ে কিছু আশা করে। তারও তো পেট পরন আছে, ঘর সংসার আছে। সে তো আর্থিক দিক থেকে তেমন সচ্ছল নয়। তাকে দোষ দিয়ে কী লাভ। নব্বই দশকের দিকে একটা টেলিফোনের জন্য কতই না ধরণা দিতে হয়েছে, তদবির করতে হয়েছে, সেটা লিখলে লম্বা ইতিহাস হয়ে যাবে। আমার বনানীর বাড়ি ভাড়া দেয়া হলো ১৯৯৪ সাল থেকে। ভাড়া নিলেন এক কোরিয়ান। তার তো টেলিফোন নেয়া অত্যন্ত জরুরি। আমাকে কিছু অগ্রিমও দেয়া হয়ছিল। সেখান থেকে পয়ত্রিশ হাজার টাকা কেটে রাখা হলো টেলিফোনের জন্য। ভদ্রলোকের অফিসে সকলেই ছিল বাঙালি। একজন এই টেলিফোনের সংযোগ নেয়ার দায়িত্ব নিলেন। দশ দিনের মধ্যে টেলিফোনের সংযোগ চলে এলো, যা আমি তিন বছর চেষ্টা করেও নিতে পারিনি। তখন অবশ্য সরকারের ঘরে জমা দিতে হতো, ১৮,০০০/- টাকা আর সেটের দাম ছিল ২০০০/- বাকী ১৫,০০০/০ টাকা অতিরিক্ত। এখানে দালালের তেমন প্রয়োজন না হলেও অতিরিক্ত টাকাটা এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছিলো। টেলিফোন আছে? উত্তর নেই। অতিরিক্ত টাকা দিলে টেলিফোন ঠিকই আছে। বর্তমানে অবশ্য টেলিফোন অনায়াসেই পাওয়া যায়। মোবাইল ফোনের দৌরাত্ম্যে ল্যান্ড ফোনের কদর অনেক কমে গেছে, যদিও ল্যান্ড ফোনের খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। (চলবে)
লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।