দালাল বিষয়ক কথকতা

আপডেট: অক্টোবর ২০, ২০১৯, ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


দালাল শব্দটির প্রতি আমাদের সবারই যেন এলার্জি আছে। দালালের অভিধানিক অর্থ হলো কমিশনের বিনিময়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে ক্রয়-বিক্রয়ে সাহায্য করে, ব্যবসা বাণিজ্যে যে ব্যক্তি মধ্যস্থতা করে, ক্রেতা বা মালপত্র সংগ্রহকারী, অন্যায়ভাবে সহায়তা করা, অসঙ্গতভাবে পক্ষ সমর্থনকারী, গায়ে পড়ে মধ্যস্থতা সাজা (যেমন তোমাকে আর দালালি করতে হবে না) ইত্যাদি। এই উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ুন আহমদ তাঁর রচিত একটি নাটকে লিখেছিলেন, “পুলিশ খুব ভাল জিনিস”। তাঁর কথার সূত্র ধরেই আমিও বলতে চাই” দালাল খুব ভাল জিনিস।” এই দালাল ভাল, কিম্বা মন্দ তার বিচার বিশ্লেষণ পরে করতে চাই। বরং দালাল শব্দটির সঙ্গে আমি কিভাবে পরিচিত হলাম, সে সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করাই শ্রেয় মনে করি।
আমাদের গ্রাম থেকে দু’কি.মি. দূরে একটি গ্রাম আছে। সেখানে বাস করতেন এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। আমার দাদীকে তিনি বুবু বলে ডাকতেন। আমার দাদী একদিন বললেন, “এই পলাকটি আমার দূর সম্পর্কীয় ভাই। তার নাম গফুর দালাল।” ১৯৩৫ সালের কথা। দালাল কথাটা আমি তখনই শুনলাম, যখন আমার বয়স মাত্র ৫ বছর। গফুর দালাল নামটি আমাদের এলাকায় অতি পরিচিত নাম। তিনি ছিলেন আম কেনা-বেচার দালাল। আমের মৌসুমে অর্থাৎ জুন ও জুলাই মাসে তাঁর কদর ও ব্যস্ততা থাকতো অনেক বেশি। তখন মহানন্দা ছিল এক প্রমত্তা নদী। বর্ষাকালে প্রচুর পানি থাকতো এবং থাকতো মাছ। অবিভক্ত বাংলায় মালদহ জেলার ভোলাহাট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চল সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের আমের জন্য খ্যাত ছিল, যা এখনও আছে। মালদা জেলার আম বেশির ভাগই চলে যেতো কলকাতা ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে। তখন নবাবগঞ্জের সবকিছুই ছিল কলকাতামুখি। কালেভদ্রে আমরা ঢাকার নামটা শুনতাম। কেননা তখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার কোনো মানুষই ঢাকার দিকে যেতো না। যাবেই বা কেন? তখন তো ঢাকা ছিল একটা ছোট শহর। লোকসংখ্যা একেবারেই কম। যাতায়াত ব্যবস্থাও ততো উন্নত ছিল না। একমাত্র আমের মৌসুমে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে অসংখ্য নৌকা আসতো চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম কিনতে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই আম ছিল ঢাকার নবাবদের অত্যন্ত পছন্দের ফল। নৌকাগুলো উজানে আসতো বিধায় সেগুলো আসতো সুবিধা মতো পালতুলে এবং গুন টেনে। গফুর দালাল ও তার সহযোগীরা নদীর পাড় থেকে চিৎকার করে নৌকাগুলো থামাবার চেষ্টা করে।” ও ভাই ব্যাপারি নৌকা ভিড়াও, ও ভাই ব্যাপারি নৌকা ভিড়াও। এ পালিতে আমের দর খুব ভাল আছে।” মাঝির কাছ থেকে উত্তর আসতো, “ক্যারাইয়া, অর্থাৎ ভাড়া। ব্যাপারি আগেই নবাবগঞ্জ বা মালদা এলাকায় চলে এসেছে এবং এই নৌকাগুলো সেই গন্তব্যে যাবে এবং সেগুলো আগেই ভাড়া করা হয়ে গেছে। তাদের ডাকা-ডাকি করে কোনো লাভ নেই।
অবশ্য বেশ কিছু নৌকা নবাবগঞ্জের ঘাটেও ভিড়তো। গফুর দালাল ঘাটেই থাকতেন। দীর্ঘদিন দালালি পেশায় নিয়োজিত থাকায় তাঁর সঙ্গে মোটামুটিভাবে ব্যাপারিদের পরিচয়ও হয়ে গিয়েছিল। তিনি ব্যাপারিকে একাধিক বাগানের আম দেখাতেন। দাম-দর ঠিক হলে বাগান থেকে আম পাড়া হতো অতি যত্নে। সেগুলো টাপরওয়ালা গরুর গাড়িতে করে নৌকায় উঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা ছিল। নৌকাগুলো ছিল মধ্যম আকারের। আম ভর্তি নৌকা মহানন্দায় ভাসিয়ে দেয়া হলে তা ভাটিতে চলতে আরম্ভ করতো। এরপর নৌকাগুলো বিভিন্ন নদীর ভেতর দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে যেতো কয়েক দিনের মধ্যে এবং এর মধ্যে আমগুলোতে রং ধরে যেতো। সাধারণত ভাল জাতের আমগুলোই ঢাকুয়ালেরা কিনতো, যেমন গোপালভোগ, খিরসাপাত, ল্যাংড়া, ফজলি ইত্যাদি। এগুলোর দর ছিল শতকরা ৩ টাকা, তবে ফজলি আম বড় আকারের বিধায় এগুলোর দাম ছিল শতকরা ৫ টাকা। অন্যান্য গুটি আম ১ টাকা বা ২ টাকায় এক শত পাওয়া যেতো। এই দালালির কাজ করে গফুর দালাল কিছু কমিশন পেতেন বাগানের মালিকদের কাছে এবং কিছু পেতেন ব্যাপারিদের কাছ থেকে। আম গণনার সময় প্রতি একশত আম গনা শেষ হলে, তিনি এক গন্ডা (এক হালি) আম নিজের জন্য রেখে দিতেন। তখন এই রেওয়াজ ছিল এবং একে বলা হতো শেলিহার আম। আমার আব্বা গফুর দালালকে মামু বলে সম্বোধন করতেন। ফলে আমার আব্বাও মাঝে মধ্যে আম গণনা করে তিনি তাঁর মামুকে সাহায্য করতেন। বিনিময়ে তিনি কোনো কমিশন নিতেন না, তবে গনণার সময়ের আমের কিছু অংশ পেতেন।
গফুর দালাল বেশ চালু মাল ছিলেন। কথা-বার্তায়, চাল চলনে সকলকে মুগ্ধ করে দিতেন। হালকা অবয়বের মানুষ কিন্তু তিনি বিয়ে করেছিলেন একের পর এক ৯ জন নারীকে। তাঁর স্ত্রীদের কেউ কেউ অকাল মৃত্যুবরণ করেছিল, কেউ আবার তালাক হয়ে গিয়েছিল। দালালদের এ ধরনের গুণ থাকতেই হয়। যেমন বিয়ের ঘটক। তারা কিভাবে কথা বেচে খায়। তিলকে তাল করতে পারে। এ ধরনের অসংখ্য দালালকে আমি দেখেছি। যেমন গরুর দালাল, জমি বেচাকেনার দালাল, বিভিন্ন অফিসে আদালতে দালাল। তাদের প্রয়োজন আছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। এদেরকে একেবারে অবজ্ঞা করা যাবে না।
তবে সব থেকে পীড়া দিতো জীবন বিমার দালালেরা। তারা অবশ্য নিজেদের বিভিন্ন বিমা কম্পানির এজেন্ট বলে পরিচয় দিতেন। আমরা বলতাম, “হলো একই কথা।” আমরা চাকরিতে যোগদানের সঙ্গে সঙ্গে তারা এসে হাজির। তারা বলতেন, “দেখুন জীবন বিমার কয়েকটি সুবিধা আছে, যেমন এটা হলো forced saving, দ্বিতীয়ত “Òto accummulate bit by bit  Ges to cover the risk of life। তাঁরা ইংরেজি, বাংলা, উর্দু সব ভাষাতেই কথা বলতে পারতেন। তাঁদের মানুষকে বোঝানোর শক্তি ছিল অপরিসীম, তা না হলে কি এ পেশায় কেউ নিয়োজিত হয়। পোশাক-পরিচ্ছদেও থাকতেন কেতা দুরস্ত। এক ভদ্রলোক বিমা কোম্পানির এক এজেন্টের উপর বিরক্ত হয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে বলছেন, “ওই শালা দালালদের পারা যায় না। প্রতিদিন এসে আমার হাড় মাস খেয়ে ফেললো”। সেই এজেন্ট কথাটা শুনে ফেলে, আবার তাঁর বাসায় প্রবেশ করলেন এবং বললেন, “সত্যি সত্যি আমি আপনার শালা, আর আপনি আমার দুলা ভাই। তাই আমি বলছি দুলা ভাই, একটা জীবনবিমা করেন। আমি খুশি হবো”। ভদ্রলোক বলে ফেললেন, “এ শালাকে তো আর পারা গেলনা।” পরে জীবনবিমা করতে বাধ্য হলেন। দালালেরা এই রকমই।
বিদেশ থেকে জাহাজে করে মাল আসলে তা চট্টগ্রাম বা মংলা বন্দর থেকে খালাস করা হয়। সেখান থেকে মাল ছাড়াতে আমাদের Clearing ও Forwarding agent দের মাধ্যমে যেতে হয়। এ কাজের জন্য অবশ্যই তাদের খরচাপাতি দিতে হয়। অন্যদিকে আমার বিরুদ্ধে কেউ মামলা করলে আমি হই বিবাদি, আর আমি যদি কোন মামলা করি তা হলে আমি হই বাদি। বাদি হোক বা বিবাদি হোক, উভয় পক্ষকেই আইন উপদেষ্টার সহায়তা নিতে হয়। তাঁরা আমার পক্ষে কাগজপত্র তৈরি করেন, যুক্তিতর্ক খাড়া করেন, আমার জন্য লড়াই করেন এবং সেটা আইনসিদ্ধভাবেই করেন। বিনিময়ে কিছু সম্মানী পান মাত্র। ইদানিং বেশি করে আলোচিত হচ্ছে পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসে দালালদের উপদ্রব নিয়ে। অন্যদিকে হাসপাতাল ও প্রাইভেট ক্লিনিকের আশে-পাশে দালালদের দৌরাত্ম্য। গ্রাম থেকে আসা খেটে খাওয়া মানুষেরা অধিকাংশই নিরক্ষর। আমি সেই পঞ্চাশ দশক থেকে দেখে আসছি, তাদের সাহায্য করার জন্য সারি ধরে কিছু মানুষ বসে আছে। পাসপোর্ট বা ভিসা করার জন্য যে ফরম যথাযথভাবে তারা পূরণ করে দিচ্ছে। আমরা উচ্চশিক্ষিত হলেও তাদের কাছে তালিম নিতে হয়। বর্তমানে অবশ্য ট্রাভেল এজেন্টেরাই ভিসা নেয়ার যাবতীয় ব্যবস্থা করে দেয়। আগের দিনে মানি অর্ডার ফরমও তারা পূরণ করে দিতো। কাজেই এই দালাল বা এজেন্টদের একেবারে অবজ্ঞা করা যাবে না। চিকিৎসা ক্ষেত্রে দালালদের দৌরাত্ম্য অবশ্য দুঃখের ও লজ্জার। যেখানে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা, সেখানে তো তৃতীয় কোনো ব্যক্তির প্রবেশের সুযোগ নেই। এখানে তো কোনো মধ্যস্থতাকারী বা সাহায্যকারীর প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। এখানে সম্পর্ক থাকবে ডাক্তার ও রোগীর এবং সেটা হবে মধুর সম্পর্ক। রোগীর সঙ্গে যারা আসবে তারাই হবে সাহায্যকারী। জোর করে হাসপাতালে ঢুকিয়ে নেয়া, দীর্ঘদিন ধরে তার চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া (প্রয়োজন না থাকলেও) একটি নীতি বিগর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ। দালাল সম্পর্কে আমার ধারণা এই টুকুই। দালাল ব্যতিরেকে আমাদের চলবে কি না তা ভাববার বিষয়। দালাল থাকবে কী থাকবে না, থাকলেই অন্য নাম থাকবে কি না সেটাও চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। এটা তো একটা পেশা। এ পেশায় বেশকিছু লোক নিয়োজিত আছে।
দালাল নিয়ে আমরা যতই ত্চ্ছু তাচ্ছিল্য বা ঠাট্টা-তামাসা করি না কেন দালাল ছাড়া কি আমাদের চলবে? যে দেশের বিভিন্ন অফিস আদালতে বিশেষ করে কোনো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে গেলে সামান্যতম সহানুভূতি বা সাহায্য সহযোগিতা পাওয়া যায় না সেখানে দালাল বা মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তি না হলে কী করে চলবে। ২৪ এপ্রিল তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকে মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রী আ.হ.ম. মোস্তফা কামাল বলেছেন, “রাজউকের কাজে মানুষ সন্তুষ্ট নয়। তাদের কাজ মানুষকে কষ্ট দেওয়া।” তিনি তো রাজউকের কথায় বলেছেন। অন্যন্য অফিসে কী হচ্ছে? তার খবর কী আমরা রাখি? আমার বয়স ৮০ বছর পেরিয়ে গেলেও আমি বিভিন্ন অফিসে এখনও যাওয়া আসা করি এবং কাছে থেকে সব কিছুই পর্যবেক্ষণ করি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে। সেখান্ থেকে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা অর্জন করি, তবে সেগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করি, তার পরই না আমার অভিজ্ঞতার আংশিক কিছু আপনাদের জন্য পরিবেশন করি মাত্র। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য আমার কিছু নেগেটিভ দিক আছে, যেমন বয়সে বৃদ্ধ, রোগা, গায়ের রং কালো এসব মিলিয়ে কোনো অফিসে গেলে কারও দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হই। ফলে আমার ভোগান্তির তুলনামূলক ভাবে একটু বেশি হয়।
এই ভোগান্তির কথা আরও দু/একটা বলতে চাই। আমি ১৯৯৪ সালে হাউস বিল্ডিং ফাইনান্স করপোরেশন থেকে ১২ লক্ষ টাকা লোন নিয়েছিলাম বাড়ি করার জন্য, শোধও হয়ে গেছে। ২০১১ সালের কথা। কিস্তি পরিশোধের বই শেষ হয়ে গিয়েছিলো। গেলাম পুরান পল্টন এইচবিএফসি ভবনে বই সংগ্রহের জন্য। সেখান থেকে বলা হলো, বর্তমানে এই অফিসের বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। আপনার বাসা যেহেতু বনানী, আপনাকে উত্তরার স্টাফ রোডের অফিস থেকে এই বই সংগ্রহ করতে হবে।” আমি অনুরোধ করলাম কোনো লাভ হলো না। পরের দিন সকালে বাসে করে উত্তরা রওয়ানা দিলাম। উত্তরায় বাস থেকে নেমে অনেকক্ষণ খোঁজাখুজির পর আবিষ্কার করলাম এইসবিএফসির শাখা অফিস। বিধি বাম। সেখানে কোনো কাজ হলো না। তারা বললো, “সর্বনাশ হয়েছে। আপনার তো বই দেয়া হবে মধ্যবাড্ডার অফিস থেকে। আমাদের অফিস কেবল মাত্র উত্তরার জন্য। গুলশান, বনানীর জন্য বাড্ডা অফিস।” তারা ভদ্রভাবে বাড্ডা অফিসের ঠিকানা দিল, কিন্তু কোনো বই দেয়া হলো না। কি আশ্চর্য! আবার বাস ধরলাম, চলে এলাম বাড্ডা। ওদের শাখা অফিস খুঁজে পেলাম। নতুন ভবনে নতুন অফিস। তাদের অফিস ৬ তলায়। লিফ্ট তখন লাগা হয়নি। আমার বয়স ৮০ বছর, কী করা যাবে, বহু কষ্টে উঠলাম ৬ তলা। জমা দেয়ার বই সংগ্রহ করলাম। এই যে হয়রানি, এর কোনো অর্থ হয়? পুরানো পল্টনের অফিস থেকে একটি বই কি দেয়া সম্ভব হতো না? একশত টাকা দালালের হাতে দিলে কাজ হয়ে যেতো। মনে মনে ভাবলাম এমডির সঙ্গে দেখা করলে হয় তো বা এতো কষ্ট হতো না। কিন্তু দেখা করবো কখন, তাঁদের পেলেতো। তাঁর তো সব সময়ই ব্যস্ত থাকেন। তাছাড়া বড় বড় অফিসে দেখেছি কর্তা ব্যক্তিদের কোনো ভয়েস নেই। নিচের কর্মচারীরা যা বলবে, সেটাই ঠিক?। তা হলে কর্তা ব্যক্তি বা কী জন্য আছেন? এ প্রশ্ন আমার আপনার সকলেরই।
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমার এক আত্মীয় সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গেছেন এবং পেনশন ও গ্র্যাচুইটি বাবদ কিছু টাকাও পেয়েছেন। রাজশাহী সোনালী ব্যাংকে গেছেন সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য। ব্যাংকের ম্যানেজার তাঁর বন্ধুও বটে। ডাকা হলো তাঁর সহকারীকে। সে ফরমায়েস করলো, “হিসাব অফিস থেকে একটি চিঠি লাগবে এই মর্মে যে তিনি কী কী বাবদ কত টাকা পেয়েছেন”। তিনি দৌড় দিলেন রাজশাহী অ্যাকাউন্ট অফিসে। তাঁরা তো চটে গেছে এবং সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে গালাগালি দিতে আরম্ভ করেছে। আর এটা তো পেনশন বই, এতে তো সবকিছু লেখা আছে, কত টাকা পেনশন, কত টাকা গ্র্যাচুইটি পেয়েছেন, সবকিছুই। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ “Valid document ” এর পর তো ভিন্ন চিঠি দেয়ার কোনো প্রশ্নই উঠে না। কোন ব্যাটা আপনাকে এক ধরনের কথা বলেছে”? তিনি আবারও দৌড় দিয়ে ব্যাংকে ফেরত এসেছেন। আবার সহকারীকে ডাকা হলো, একই জবাব ভিন্ন চিঠি লাগবে। কেন লাগবে, তার কোনো উত্তর নেই। ম্যানেজার সাহেব বললেন, “আমার সহকারী যা বলেছে, সেটাই ঠিক”। কোথায় যাবেন, কী বলবেন, কাকে কী বলবেন? এই হয়রানির কোনো অর্থ হয়! অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক, রাজশাহীতে তাঁর এক ছাত্র ছিল, সে তার শিক্ষককে পাঁচ লাখ টাকার পেনশন স্কিমের সঞ্চয়পত্র কিনে দিলো। আমিও ঢাকায় থাকলেও রাজশাহীতে পাঁচলাখ টাকার পেনশন স্কিমের সঞ্চয়পত্র কিনেছিলাম, আমার অবসর গ্রহণের বেশ কয়েক বছর পর। আমার কোনো কাগজ পত্রের প্রয়োজন হয় নি।
এই হয়রানির আরও কিছু উদাহরণ দিতে চাই। আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি পাসপোর্ট অফিসের কথা। আমি প্রথম পাসপোর্ট করি ১৯৫৮ সালে আমার অসুস্থ শ্বশুরকে কলকাতা নিয়ে যাবার জন্য। তখন ভারতের জন্য ভিন্ন পাসপোর্ট ছিল। লোক সংখ্যা কম, সমস্যাও ছিল কম। আমার তখন পোস্টিং ছিল রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজে। তৎকালীন ডিস্ট্রিকট ম্যাজিস্ট্রেটের (D.M) অফিস থেকে অতি সহজেই পাসপোর্ট করা যেতো। দ্বিতীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট করি ১৯৬১ সালে ই্যংল্যান্ড যাবার সময়। তখনও কোনো ঝামেলা হয় নি। তার মূল কারণ ছিল আমরা ছিলাম সরকারি কর্মকর্তা, কাজেই আমাদের পাসপোর্ট করতে তেমন অসুবিধা হওয়ার কথা না। তারপর পাসপোর্ট করেছি সত্তর দশকে, রিনিউ করা হয়েছে আশির দশকে এভাবে পাসপোর্ট করতে তেমন কোনো ঝামেলা হয়নি। নব্বই দশক থেকে পাসপোর্ট করেছি, রাজশাহী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে, তা এজেন্টের মাধ্যমে। এখানে ইচ্ছা করেই আমি দালাল শব্দটা ব্যবহার করলাম না। আমাকে বৃদ্ধ বয়সে ঝামেলা করতে হলো না, দৌড়াদৌড়ি করতে হলোন না। কিছু পয়সা খরচ করলাম মাত্র। আমার এজেন্ট ও দু’পয়সা পেয়ে খেয়ে পরে বাঁচলো। এতে কি কারোও কোনো আপত্তিও আছে?
( চলবে)
লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।