দিলীপ কুমার ছিলেন ইন্ডাস্ট্রির ‘কহিনুর’…

আপডেট: জুলাই ৭, ২০২১, ১:২৯ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


১৯২২ সালে পাকিস্তানের পেশোয়ারে জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ ইউসুফ খান। তখন তিনি কিশোর, মুম্বই থেকে পুনেতে পাড়ি দিলেন কাজের খোঁজে। পুনের ব্রিটিশ সেনাদের জন্য তৈরি একটি বিশেষ ক্যান্টিনে কাজ নেন ইউসুফ খান। কিন্তু কয়েক বছর পর আবার মুম্বই ফিরে বাবার ফলের ব্যবসায় যুক্ত হন তিনি। তখন পরিচয় হয় প্রখ্যাত সাইকোলজিস্ট ডা. মাসানির সঙ্গে। যিনি নিজে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন বোম্বে টকিজ’ এর মালিক দেবিকা রানির সঙ্গে। সেই থেকেই ঘুরে গেল জীবনের মোড়। বদলে দিলেন নিজের নাম। হয়ে উঠলেন দিলীপ কুমার।
১৯৪৪ সালে বম্বে টকিজের ‘জোয়ার ভাটা’ সিনেমায় প্রথম তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। অভিনয়ের প্রতি ভালবাসা থেকেই নাম বদলে পা রাখেন বলিউডে। যদিও প্রথম ছবি সেভাবে সাড়া পায়নি। এরপর ১৯৪৭ সালের ‘জুগনু’ ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। এটিই তাঁর প্রথম হিট ছবি। এই থেকেই বদলে গেল বলিউডের গোটা চিত্র। তাঁর অভিনয়ের তৈরি হল এক আলাদা আঙ্গিক। যে আঙ্গিককে অনুকরণ করেই বলিউডে পরবর্তীতে বিখ্যাত হন আরও বহু অভিনেতা। এভাবেই তিনি হয়ে উঠলেন বলিউডের প্রথম ‘কিং খান’।
এরপর বলিউডের একাধিক ছবি, যা তৎকালীন সময়ে বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে, তাতেই নায়ক হিসেবে দেখা দিতেন দিলীপ কুমার। বিশেষত অভিনেত্রী বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে জুটি বেঁধে বেশিরভাগ ছবিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। সুদর্শন বলে শুধু রোমান্টিক চরিত্রে নয়, চলচ্চিত্রের ময়দানে অভিনয়ের বিভিন্ন ঘরানায় তাঁকে দেখা গিয়েছে। সেভাবেই ছড়িয়েছে সুনাম। ছয় দশক ধরে তাঁর বিস্তৃত কেরিয়ারে ৬৫টির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন। ‘দেবদাস’, ‘কোহিনুর’, ‘মধুমতী’, ‘মুঘলে আজম’, ‘গঙ্গা যমুনা’, ‘রাম অউর শ্যাম’, ‘শক্তি’ , ‘মসান’, ‘ক্রান্তি’, ‘সওদাগর’-এর মতো অসংখ্য ছবি সিনেমা প্রেমীদের মনে দাগ কাটল। তিনি হয়ে উঠলেন বলিউডের ‘ট্র্যাজেডি কিং’।
১৯৭৬ সালে বলিউড থেকে পাঁচ বছরের বিরতি নেন দিলীপ কুমার। তারপর আবার ফিরে এসে ‘শক্তি’ (১৯৮২), ‘কর্ম’ (১৯৮৬) এবং ‘সওদাগর’ (১৯৯১) সিনেমায় দেখা যায় তাঁকে। ১৯৯৮ সালে দিলীপ কুমার অভিনীত সর্বশেষ চলচ্চিত্র ছিল ‘কিলা’। ১৯৯১ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ পুরস্কারে পদক সম্মানিত করে। ১৯৯৪ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর অবদানের জন্য ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারে ভূষিত হন। হিন্দি চলচ্চিত্রে এখনও পর্যন্ত তিনিই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ‘ফিল্মফেয়ার’ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন।
সিনেমার মতোই দিলীপ কুমারের ব্যক্তিগত জীবন ছিল নানা রঙে রঙিন। পর্দার অভিনেতা বাস্তবেও ছিলেন রোমান্টিক। অভিমানও ছিল তীব্র। অভিনয়ের মাধ্যমেই মধুবালার সঙ্গে পরিচয় থেকে তুমুল প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন দিলীপ কুমার। কিন্তু দীর্ঘ ৭ বছরের প্রেমে বাধা হয়ে দাঁড়ান মধুবালার বাবা এবং আত্মীয়রা। আত্মসম্মানবোধ থেকে দিলীপ কুমারের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসেন মধুবালা। বিয়ে করেন কিশোর কুমারকে। এরপর দীর্ঘদিন প্রেম, সম্পর্ক, ভালবাসা থেকে নিজেকে ইচ্ছাকৃত দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। এমন এক সময়ে সেই সিনেমার হাত ধরেই যুবতী সায়রা বানুর সঙ্গে পরিচিত হয় দিলীপ কুমারের। সিনেমায় দিলীপ কুমারের বিপরীতে নায়িকার ভূমিকায় সায়রাকে বেছে নিয়েছিলেন পরিচালক। কিন্তু পরিচালকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সায়রার সঙ্গে অভিনয় করতে নারাজ ছিলেন দিলীপ কুমার। তিনি জানিয়েছিলেন, রোমান্টিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করার বয়স হয়নি সায়রার। তিনি পারবেন না। উল্টোদিকে সায়রা জানিয়েছিলেন তিনি মাত্র ১২ বছর বয়সেই দিলীপ কুমারের প্রেমে পড়েছিলেন। ২২ বছরের ছোট সায়রার সঙ্গে সিনেমায় অভিনয় করতে করতেই ফের প্রেমে পড়লেন দিলীপ কুমার।
১৯৬৬ সালে বিয়ে করলেন সায়রা বানুকে। তাঁকে বিয়ে করে জীবনের অন্যতম ‘স্বপ্ন পূরণ হল’ বলেই জানিয়েছিলেন সায়রা। কিন্তু দিলীপ কুমারের বিয়ের খবর শুনতেই অসুস্থ হয়ে পড়েন মধুবালা। তীব্র মানসিক চাপে ভেঙে পড়েন তিনি। আরও তিন বছর পর মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যান মধুবালা। বয়সে ২২ বছরের ফারাক বলেই, নিন্দুকদের মনে হয়েছিল হয়তো এই বিয়ে বেশিদিন টিকবে না। কিন্তু দেখতে দেখতে হাতে হাত রেখে কাটিয়ে দিলেন এতগুলো বছর।
গুঞ্জন শোনা যায়, পাকিস্তানের এক নাগরিক আসমার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন দিলীপ কুমার। তাঁকে বিয়ে করার জন্য সায়রা বানুর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটান তিনি। কিন্তু ২ বছরের বেশি স্থায়ী হয়নি সেই সম্পর্ক। আবারও ফিরে আসেন সায়রা বানুর কাছে। আবারও বিয়ে করেন তাঁরা। এরপর চলচ্চিত্র জগত থেকে পুরোপুরি সরে এসে সংসারে মন দেন সায়রা। এত বছরের দীর্ঘ দাম্পত্য প্রেম ছিল শুরুর দিনের মতোই গাঢ়। যত দিন এগিয়েছে, পরিনত হলেও তাঁরা ছিলেন স্কুল বেলার প্রেমিক প্রেমিকাদের মতো। একবার এক সাক্ষাৎকারে সায়রা বলেছিলেন, ‘আমি দিলীপ সাব’কে ইন্ডাস্ট্রির কহিনুর বলে ডাকি…।
তথ্যসূত্র: আজকাল