দুঃখের বিলে সুখের হাসি।। নওগাঁয় কাটা খালের পানিতে দেড়লাখ কৃষকের ঘরে উঠবে বোরো ধান

আপডেট: এপ্রিল ৯, ২০১৭, ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ

এমআর রকি, নওগাঁ


দু-চোঁখ যেদিকে যায় শুধু সবুজ ধানের বিস্তৃত মাঠ। গত দুই সপ্তা আগে বের হওয়া ধানের শীষগুলো হেলে পড়েছে জমিনের দিকে। গোড়ায় কিছুটা কলো-পাকা ধানের শীষগুলো সামান্য বাতাশে দুলছে। ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার জুড়ে মাঠটি যখন দেখছি মনে হচ্ছে একটি কবির হাতে সুনিপুণ পোর্টেট।
গত ৪ বছর আগেও মাঠের এমন চিত্র কৃষকরা আশা করতে পারেন নি। বৈশাখের শুরুতে সামান্য বৃষ্টি সবুজ এ মাঠটিকে তলিয়ে দিতো। অকাল বন্যায় সোনালী সে ধান তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের বুক ভাঙা আর্তনাদ করা ছাড়া আর কিছু ছিল না। আজকের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরিত। সবুজ ধানের মাঠে তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে কাজ করছে। আমরা টানা প্রায় আড়াই কিলোমিটার হেটে মাঠের মাঝখানে গিয়ে দেখি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কর্মযজ্ঞ। বলছিলাম নওগাঁর বিল মুনছুর, নলীরবিল চকপাকুরিয়া, হামড়ার বিল চোয়ারপাড়ার কথা। তিন উপজেলা মহাদেবপুর, মান্দা, ও নওগাঁ সদর জুড়ে ৩৭ কিলোমিটার বিলের তলা ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে গত ১০ বছর থেকে এ বিলের মাঠ থেকে কৃষক ঘরে ধান তোলা অনেকটা জুয়া খেলার মতো। যদি ভাগ্য ভালো হয় তা হলে কিছু ধানের মাথা কেটে পানিতে সাতরিয়ে ঘরে আনার চেষ্টা কৃষকের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিলের এসব ভরাট তলদেশ খননের জন্য প্রকল্প হাতে নেয়। ২০১৬ সালে প্রস্থাবিত প্রকল্প টি নওগাঁ সদর আসনের মাননীয় সাংসদ বীরমুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেকের সুপারিশ ও নির্দেশনায় ভূউপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ সম্প্রসারণ ও জলাবদ্ধ দূরীকরণ নামে একটি প্রকল্প তৈরি করে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এ প্রকল্পটি সে বছর একনেকে অনুমোদন পায়। প্রায় সাড়ে ৬ হাজার একর জমি দুফসলী করে তুলতে এ প্রকল্পের কাজ শুরু করে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। ২০১৬ সালে শুরু হওয়া বিলের তলদেশ খনন কাজ ইতোমধ্যে ১৪ কিলোমিটার সম্পন্ন হয়েছে। বিলের তলদেশ খনন শেষ হওয়া এসববিলে এখন বিপুল পরিমান পানি রয়েছে। সে পানি দিকে কৃষক এবার বোরো চাষ করেছে।
সরজমিনে দেখা যায়, বিলের তলদেশ থেকে শ্যালো মেশিন দিয়ে সেচ নিয়ে বোরো ধানে ফেলছে। অন্যদিকে আশপাশের একাধিক জেলে সে পানিতে জাল ফেলে মাছ ধরছে।
স্থানীয় গয়ের পাড়া গ্রামের বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম, ভীমপুরের আবুল হোসেন এবং আবদুল জলিল জানান, খাল কাটার আগে এখানে বোরো ফসল ঘরে তোলা যেতো না। গত বছর থেকে এ মাঠ আশির্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। এখন ধান কেটে ঘরে তোলা সম্ভব হচ্ছে। অকাল বন্যা আর আমাদের ধান নষ্ট করছে না। শুধু ধানের সুফল নয় আরো যে কাজটি বড় ভূমিকা পালন করছে তা হলো এখানে বিলের পানিতে এখন নিয়মিত মাছ থাকছে। সারাবছর এ পানি ও মাছ স্থানীয় গ্রামবাসীর কাছে মৎস্য ভান্ডার হিসাবে দেখা দিবে এমন কথা বলছে অনেকেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রায় দেড়লাখ মানুষ সরাসরি খাল কাটা বিলের সুফল পাবে। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ আশা করছে আগামী ২০১৯ সালে এ প্রকল্প কাজ শেষ হলে অকাল বন্যার যে আতঙ্ক তা আর থাকবে না।
ভূউপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ সম্প্রসারণ ও জলাবদ্ধ দূরীকরণ প্রকল্পের পরিচালক এটিএম মাহফুজুর বলেন, বিলের তলদেশ ভরাট হওয়ার কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল এসব এলাকায়। ফলে সামান্য বৃষ্টি এখানকার কৃষকের জন্য দুঃখ ডেকে আনতো। এখন খনন করার পর সম্পূর্ণ চিত্র বদলে গেছে। কৃষক বিল থেকে পানি নিয়ে সেচ দিয়ে বিনা পয়সায় কৃষক ফসল ফলাচ্ছে। চলতি বোরো মৌসুমে এসব বিল এলাকায় বোরো ধানের ফলন হয়েছে ভালো। কৃষক আশা করছে যদি শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া ভালো থাকে তা হলে বিঘা প্রতি ২৫ থেকে ২৮ মণ পর্যন্ত ধান ঘরে উঠবে।
এ বিষয়ে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নওগাঁ সদর যোনের সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যে উদ্দেশ্য বিলের তলদেশ খনন করা হচ্ছে তা ইতোমধ্যে কৃষক সুফল পেতে শুরু তরেছে। ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পটির মেয়াদ ২০১৯ সালে খনন শেষ হবে। চলতি বোরো মৌসুমে যে পরিমান ধান কৃষকের ঘরে উঠবে তা প্রকল্পের আর্থিকভাবে ধরা ব্যয়ে উদ্দেশ্য সাধিত হবে বলে মনে করছে উপকারভোগীরা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ