দুটি ঘটনার ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ।। জিয়ানগরে ন্যক্কারজনক, করিমগঞ্জে প্রশংসিত

আপডেট: ডিসেম্বর ২০, ২০১৬, ১১:৫৮ অপরাহ্ণ

১৬ ও ১৯ ডিসেম্বরের দুটি ঘটনা দেশ জুড়ে বেশ আলোচিত হচ্ছে। এক ঘটনায় গণতন্ত্রমনা মানুষ মানসিকভাবে বেশ আহত ও ক্ষুব্ধÑ অপর ঘটনায় স্বস্তি- সান্ত¦না ও উদ্দীপনার। দুটি ঘটনার অগ্রভাগেই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। প্রথমটির সাথে সংশ্লিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতারা তিরস্কৃত হচ্ছেন এবং অপর ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধাসহ সংশ্লিষ্টরা সাবাশি পাচ্ছেন। কী এমন ঘটনা যে মুক্তিযোদ্ধারা একদিকে বিতর্কিত ও ধিকৃত হচ্ছেন, আবার অন্যদিকে প্রশংসিত ও সাবাশি পাচ্ছেন?
দৈনিক সোনার দেশসহ দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়,  ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত আমৃত্যু সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র মাসুদ সাঈদীর কাছ থেকে সম্মাননা নিয়েছেন পিরোপুরের মুক্তিযোদ্ধারা।  জিয়ানগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদ ওই অনুষ্ঠানে ছিলেন প্রধান অতিথি। তার বাবা একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে আমৃত্যু কারাদ- ভোগকারী সাঈদীও এই এলাকার সংসদ সদস্য ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও আওয়ামী লীগ নেতারা উপস্থিতি ছিলেন। তারা বিষয়টির প্রতিবাদ না করে বরং সহায়তা করেছে। জিয়ানগর ইউএনও ও থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কেহই সাঈদী পুত্রকে প্রধান অতিথি করে সরকারি উদ্যোগে অনুষ্ঠান করার বিষয়টিকে আমলে নেয়নি। এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে। এই ঘটনা দেশের জন্য লজ্জার তাই সংশ্লিষ্টদের শাস্তির দাবিতে সোচ্চার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিবাদের মুখে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত পলাতক যুদ্ধাপরাধী কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার রাজাকার কমান্ডার গাজী আবদুল মান্নানের জানাজা নিজ বাড়িতে পড়াতে হয়েছে। রাজাকার মান্নান নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে সোমবার ভোরে মারা যান। জানাজা পড়ানোর পর উপজেলা জামে মসজিদের ইমামকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে।
সংবাদ মাধ্যমের তথ্য মতে, দুপুর ২টার দিকে তার মরদেহ নারায়ণগঞ্জ থেকে করিমগঞ্জ পৌঁছার পর প্রথমে করিমগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও পরে করিমগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ মাঠে পারিবারিকভাবে জানাজার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার মোমিন আলী স্থান দুটিতে জানাজা অনুষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞা দিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত আবেদন জানান। এরপর ইউএনও আসমা আরা স্থান দুটিতে জানাজা অনুষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে করিমগঞ্জ থানা ও প্রতিষ্ঠান দুটির প্রধানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে স্থানীয় প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধারা ঘৃণ্য মানবতাবিরোধী অপরাধীর জানাজা করার সুযোগ না দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পবিত্র অঙ্গনের পবিত্রতা রক্ষা করেছেন। বরং শিক্ষার্থী ও দেশবাসীর কাছে এই দৃষ্টান্ত তারা রাখলেন যে, যুদ্ধাপরাধীরা কোনোভাবেই কোনরূপ সহানুভুতি পাওয়ার যোগ্য নয়। অন্যদিকে রাজাকারপুত্রের পাশে দাঁড়ানোকে যারা সম্মানের মনে করেছেন তাদেরকে ধিক্কার জানাতেই হয়।
প্রশ্ন আসতেই পারে, সাঈদী রাজাকার হলেও তার পুত্র তো রাজাকার নয়- তা হলে সে কেন শাস্তি পাবে? না, সাঈদীপুত্র কখনোই বলেনি যে, তার বাবা মুক্তিযুদ্ধকালে যা করেছে তা অন্যায় করেছেÑ পুত্র হিসেবে তার জন্য ক্ষমা চায়। বরং বিভিন্ন সময় সাঈদীপুত্রের মন্তব্য ছিল অ্যাগ্রেসিভ এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার পরিপন্থী। এ ছাড়াও দেশব্যাপি দাবি উঠেছে যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে জনকল্যাণে ব্যয় করার। সরকার এ ব্যাপারে আইন করতে যাচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের পোষ্যদের নাগরিক মর্যাদা হ্রাসের দাবি উঠেছে- সেখানে জিয়াগঞ্জের ঘটনা সত্যিই জাতিকে লজ্জায় ফেলে দেয়। বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান, মর্যাদার সর্বোচ্চ দিতে উজাড় করে দিচ্ছে, তখন কতিপয় মুক্তিযোদ্ধা রাজাকারপুত্রের হাত থেকে সম্মামনা নিতে এতটুকু দ্বিধান্বিত হলেন নাÑ এটা ভাবতেও কষ্ট লাগে। তবে এই ঘটনা সকল পক্ষকে সতর্ক করবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ