দুর্গাপুরে দাদন ব্যবসায়ীদের খপ্পরে নিঃস্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষ

আপডেট: অক্টোবর ২১, ২০১৬, ১১:৪০ অপরাহ্ণ

দুর্গাপুর পতিনিধি
দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মহাজনি সুদ অর্থাৎ দাদন ব্যবসায়ীদের খপ্পরে নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কোথাও স্বর্ণ ব্যবসার আড়ালে আবার কোথাও প্রকাশ্যে চলছে দাদন ব্যবসা। প্রতি এক হাজার টাকা ঋণের বিপরীতে এলাকা ভেদে মাসে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা সুদ দিতে হয়। যারা দাদন নিচ্ছেন তারা মূলত ব্যাংকের শর্ত ও ব্যাংক কর্মকর্তাতের দুর্নীতি এবং বেসরকারি এনজিও সংস্থাগুলোর  কারণে দারস্থ হচ্ছেন দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে। ঋণ গ্রহীতারা ফাঁকা স্ট্যাম্পে সাক্ষর ও ফাঁকা ব্যাংকের  সাক্ষরিত চেক নেয়ার কারণে পরে তারাই আবার মামলায় জড়িয়ে যাচ্ছেন। দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে দেনার টাকা পরিশোধ করতে না পেরে নিজ ভিটা ছেড়ে পালিয়েছেন অনেকে।
দুর্গাপুর উপজেলার কাঁঠালবাড়িয়া, সায়বাড়, চৌপুকুরিয়া, কুহাড়, মহেন্দ্রা পানানগর, সিংগা বাজার, বাসেড়ের মোড়, পালিবাজার ও দেবীপুর, এলাকায় দাদন ব্যবসায়ীদের কর্মকান্ড সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে ওই সব স্থানগুলোতে প্রকাশ্যে রমরমা দাদন ব্যবসা করে চলছেন।
উপজেলার চৌপুকুরিয়া এলাকার মোজাহার ম-লের ছেলে মোস্তাক আলী জানান, চৌপুকুরিয়া ওয়াজের মোড় এলাকার রফিকুল ইসলাম নামের দাদন ব্যবসায়ীর কাছে থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেই। এরপর দাদন ব্যবসায়ীকে দশ লাখেরও বেশি টাকা পরিশোধ করা হলেও দাদন ব্যবসায়ীর আসল টাকা আর পরিশোধ হয় নি। দাদন ব্যবসায়ী রফিকুলের হুমকির কারণে সে দীর্ঘ সময় নিজেকে আত্মগোপণ করে ছিলেন। পরে তার প্রায় ১০ বিঘা জমি বিক্রি করে রফিকুলের টাকা পরিশোধ করেন। তার ভিটেমাটি বিক্রি করে দাদনের টাকা পরিশোধ করে বর্তমানে সে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। কিন্তু এলাকায় দাপটের সঙ্গে রমরমা দাদন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন রফিকুল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন থেকে চৌপুকুরিয়ার রফিকুল, টাকু মজিবর, মাসুদ, মফিজ, রুহুল ইসলাম,  কাঠাঁলবাড়িয়ার অবান, মহেন্দ্রার হাসেম, শহিদুল ইসলাম, ঝালুকার শফি, সিংগা বাজারের হাবিলসহ আরো ১৫ থেকে ২০ জনের মতো দাদন ব্যবসায়ী এলাকায় প্রকাশ্যে বেআইনিভাবে ব্যবসা করে চলেছেন। গ্রামের সাধারণ সহজ-সরল মানুষগুলোর কাছ থেকে তারা অল্প কিছু টাকা দিয়ে ফাঁকা স্ট্যাম্পে সাক্ষর ও ফাঁকা ব্যাংকের সাক্ষরিত চেক নিয়ে পরে তারা আদালতে লাখ লাখ টাকার মামলা ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন। এভাবে শত শত পরিবারকে তারা জিম্মি করে টাকা আাদায় করছেন। তাদের হাত থেকে রেহায় পাই নি কেউ।
দাদন ব্যবসায়ীর হাতে নিঃস্ব মুক্তার হোসেন জানান, দীর্ঘ দিন থেকে দাদন ব্যবসায়ীরা এলাকায় প্রকোশ্যে অবৈধ্যভাবে ব্যবসা করছেন। তাদের দৌরাত্মে এলাকায় চলাচল করা সমস্যা হয়ে পড়েছেন। দিনে পর দিন তারা দাদন ব্যবসার নামে সাধারণ মানুষগুলোকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পরিবারকে জিম্মি করে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে চলেছেন। তারা এক টাকার পরিবর্তে এক লাখ টাকা আদায় ইস্যু করা হয়েছে। এতে স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন তাদের পক্ষ নিয়ে কাজ করে চলেছেন। যার ফলে সাধারণ মানুষগুলো নিজের আত্মসম্মান রক্ষায় ভিটাবাড়ি বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করছেন।
এসময় তিনি আরো বলেন, ‘আমি দাদন স¤্রাট রফিকুল ইসলামের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি। পরে রফিকুল আবার আমার কাছ থেকে টাকা পাবে বলে দাবি করেন। রফিকুলসহ তার দাদন ব্যবসাীরা আমাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এসময় তারা দেশিয় অস্ত্র সামনে রেখে জোর করে আমার লীজকৃত ২০ বিঘার দুইটি পুকুর ফাঁকা স্ট্যাম্পে সাক্ষর করে নেন। পরে তারা ওই ফাঁকা স্ট্যাম্প নিয়ে আমার লীজকৃত পুকুরে মাছ ধরতে যায়। স্থানীয় লোকজন বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে পুকুর থেকে চলে আসে এবং তারা দুর্গাপুর থানায় পুকুর লীজ দিয়ে দখল দিচ্ছে না মর্মে অভিযোগ করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে থানা পুলিশ আমাকে নোটিশ জারি করলে আমি থানায় হাজির হয়ে ঘটনাটি বলা হয়। পরে আইনগত দিক দেখিয়ে থানা পুলিশ আমার বিয়য়টি কোন কর্ণপাত না করেই তাদের পক্ষে রায় দেন। এমনকি স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ওই চক্রের সদস্য হওয়ায় থানা পুলিশ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিয়ে ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করার কথা বলে সময় নির্ধারণ করে দেন। থানা পলিশের বেধে দেয়া সময় সীমার মধ্যে ১০ লাখ টাকা দেয়ার পরে আমি তাদের কাছ থেকে রেহায় পেয়েছি। এভাবে তারা দিনের পর দিন সাধারণ মানুষগুলোকে জিম্মি করে টাকা আদায় করে চলেছেন।
দাদন ব্যবসায়ী শফির সাথে কথা বলে জানা যায়, ‘আমি দাদন ব্যবসায় জড়িত রয়েছি। কিন্তু আমারা রফিকুল ও টাকু মজিবর ও মহেন্দ্রার হাসেমের নেতৃত্বে এলাকায় কাজ করি। আমরা প্রথমে এলাকার জমি জায়গা বেশি আছে এমন সহজ-সরল সাধারণ মানুষগুলোর দিকে লক্ষ্য দেই। তাদের পিছনে আমরা সময় ও টাকা ব্যয় করি। পরে সংসারের অভাব অনটনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার প্রয়োজন হলে আমরা রফিকুল, টাকু মজিবর ও হাসেম আলীর কাছে নিয়ে যাই। সেখানে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার বিপরীতে ফাঁকা স্ট্যাম্পে সাক্ষর ও ফাঁকা ব্যাংকের সাক্ষরিত চেক  নেয়। পরে আসল টাকা উঠে আসলে দাদন স¤্রাটরা ওই পরিবারকে ফাঁকা স্ট্যাম্পে সাক্ষর ও ফাঁকা ব্যাংকের সাক্ষরিত চেক দিয়ে জিম্মি করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। তারা টাকা পাবে মর্মে লোক জানাজানিও করেন। অনেক পরিবার আত্মসম্মানের ভয়ে জমি জায়াগা বিক্রি করে তাদের টাকা পরিশোধ করে।’
শফি আরো বলেন, ‘আমার কাজ হচ্ছে লোক ধরা আর পরে ওই পরিবারকে জিম্মি করা হলে পরিবারের লোকজনকে রফিকুলের মতো দাদন স¤্রাটের ভয়ংকর কথা বার্তা বলে ভয় দেখানো। বর্তমানে এলাকায় এ চক্রের কাজ বেশি করে চলেছেন রফিকুল, টাকু মজিবর, ও হাসেম আলী।’
এদিকে দুর্গাপুর উপজেলার কিছু এলাকায় দাদন ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা চালান স্বর্ণ ব্যবসার আড়ালে। দাদন ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন অনেকে। অসহায় সাধারণ মানুষ অভাবের তাড়নায় এসব দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে পাঁচগুণ টাকা পরিশোধ করেছেন। এরপরেও তারা ঋণমুক্ত হতে পারছে না। উপজেলার মহির উদ্দিন ছেলের চিকিৎসার জন্য এক দাদন ব্যবসায়ীর কাছে টাকা ধার নেয়। ফাঁকা দেড়শ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করেন তিনি। গত বছরের জানুয়ারি মাসে প্রতিমাসে হাজারে দুইশ টাকা সুদে ৮ হাজার টাকা ঋণ পান। ওই ঋণের সুদ ৬ মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। তারপরও দাদন ব্যবসায়ী জানায় তার বকেয়া পরিশোধ হয় নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দাদন স¤্রাট রফিকুল, শফিকুল, টাকু মজিবর ও হাসেম আলীসহ আরো ১৫ থেকে ২০ জন সহযোগী রয়েছেন। এরা প্রত্যেকেই বিগত বিএনপি ও জামায়াত জোট সরকারের সময় উপজেলার চিহিৃত সন্ত্রাসী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু যখন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরির্বতন আসছে। ঠিক সে সময় তারা  নিজেকে রক্ষা করতে ছদ্দবেসে ব্যবসায়ী পরিচয় দেন। কিন্তু আসলে তারা ব্যবসায়ী নয় ছদ্দবেসে সাধারণ মানুষকে সর্বশান্ত করছেন। প্রতিদিন লাখ লাখ  অবৈধ্য টাকা সাধারন মানুষ গুলোর কাছ থেকে আদায় করে চলেছেন। এসব অবৈধ্য টাকা গুলো দিয়ে ঘরে বসে থেকে এলাকার সাধারন মানুষ গুলোকে বিপদে ফেলে জিম্মি করে রেখেছেন। এতে স্থানীয় সরকার দলীয় কিছু নেতাকর্মীরা তাদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে হাত মিলিয়ে দাপটের সাথে এ দাদন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে তারা এলাকায় দাদন স¤্রাট নামে পরিচিতি। দাদন স¤্রাট রফিকুলের নাম শুধু নিজ এলাকায় নয় নিজ উপজেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উপজেলায় লোকজনও রফিকুলকে দাদন স¤্রাট নামে পরিচিত।
দুর্গাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রুহুল আলম বলেন, আমি সবে নতুন এসেছি। আসার পরে দাদন ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে এলাকা ছেড়েছে এমন কোনো অভিযোগ কেউ করে নি। করলে তদন্ত করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর ইলিয়াস হোসেন বলেন, দরিদ্র মানুষের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের সকল নাগরিকের ভোটার আইডি কার্ড রয়েছে। এটিকে ভিত্তি করে সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে বা সরকারের অন্য কোনো দফতরের মাধ্যমে বিনা জামানতে ঋণ দেয়া যেতে পারে। এনজিওরা তাদের ঋণ দানের পরিধি বৃদ্ধি করতে পারে। এ বিশেষ ঋণ সুবিধা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পাশাপাশি একটি অংশ হতে পারে। রাস্ট্রের যে বাজেট তাতে এটি একটি ক্ষুদ্র অংশ হবে মাত্র। এর পাশাপাশি দাদন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। সমাজসেবা অধিদফতর ছাড়াও বাণিজিক ব্যাংক বা ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের মাধ্যমে এ জাতীয় ঋণ দেয়া যেতে পারে।