দুর্গাপুরে শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ : শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

আপডেট: মে ১, ২০১৭, ৪:২৬ পূর্বাহ্ণ

দুর্গাপুর প্রতিনিধি


দুর্গাপুর উপজেলার বদ্ধনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক লেজাম উদ্দিনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছে এক ছাত্রী। এমনকি লোকলজ্জার ভয়ে ওই স্কুল ছাত্রী বিষ পানে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। পরে পরিবারের লোকজন জানতে পেরে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করে।
জানা গেছে, গতকাল রোববার সকালে স্কুল চলাকালিন ওই ছাত্রীর পরিবার স্কুলের প্রধান শিক্ষককে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। এ ঘটনায় এলাকার প্রভাবশালী একটি মহল ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে টাকার বিনিময়ে বিষয়টি দফারফা করার চেষ্টার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
এদিকে, গতকাল রোববার সকালে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচারের দাবি জানিয়েছে বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীরা। অভিযুক্ত শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ক্লাস বর্জনসহ মানববন্ধনের আল্টিমেটাম দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এসময় স্কুলের শিক্ষার্থীরা বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষক লেজাম উদ্দিন এমন ঘটনা এর আগেও শিক্ষার্থীদের সাথে ঘটিয়েছে। তার বিরুদ্ধে স্কুলের প্রধান শিক্ষককে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা একাধিক বার মৌখিক অভিযোগ করেছেন। এমনকি প্রধান শিক্ষক এমন অভিযোগ পেয়ে তাকে সাবধান করে দিয়েছেন বলে জানা যায়। কিন্তু শিক্ষক লেজাম ক্লাসের ছাত্রীদেরকে বাড়িতে পড়াশুনা না করে তার সাথে যোগাযোগ করলে ভাল রেজাল্ট হবে বলে আশ্বাস দেন।
শিক্ষার্থীরা আরো বলেন, যারা তার সাথে যোগাযোগ করবেন, তাদের পড়াশুনা করার জন্য কোন অর্থ ব্যয় করতে হবে না। সেইসাথে ক্লাসে ফাস্ট হবে সেই ছাত্রী।
এদিকে ওই ছাত্রীর ভাই সোহাগ আলী জানান, দীর্ঘ দিন থেকে শিক্ষক লেজাম তার বোনকে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছে। এ বিষয়গুলো আমরা স্কুলের প্রধান শিক্ষককে জানিয়েছি। কিন্তু প্রধান শিক্ষক আমাদের বিভিন্ন কথা বলে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু তার সহকারি শিক্ষককে কিছুই বলে না। গত ৯ মার্চ আমার বোন স্কুলে যায় নি। যার ফলে স্কুলের পড়াগুলো জানে না। ওই দিন সন্ধ্যায় স্কুলের পড়াগুলো জানার জন্য তার বান্ধবী শারমিনের বাড়িতে যায়। বান্ধবীর বাড়ি থেকে আসার পথে সে পথ অবরোধ করে দাঁড়িয়ে যায়। এসময় ওই ছাত্রী শিক্ষককে বলেন, স্যার আমার রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ান। তা না হলে চিৎকার করে বসবো। তার পরেও সে রাস্তা থেকে সরে না দাঁড়িয়ে ছাত্রীকে জড়িয়ে ধরে যৌন নিপীড়নে চেষ্টা চালায়। ওই ছাত্রী লোকলজ্জার ভয়ে কাউকে কিছু না বলে বাড়িতে এসে ১০মার্চ রাতেই বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। কিন্তু পরিবারের লোকজন জানতে পেরে তাকে উদ্ধার করে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এদিকে, বদ্ধনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমি ওই ছাত্রীর পরিবারের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগ পাওয়ার পরে স্কুলের নির্বাহী কমিটির সাথে যোগাযোগ করেছি। এমনকি তাদের কাছে সাধারণ সভার নোটিশ পাঠিয়েছি। কিন্তু নির্বাহী কমিটির চার সদস্যের মধ্যে আমরা দুই সদস্য উপস্থিত ছিলাম। আর বাকি দুইজন অনুপস্থিত থাকায় আমরা কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। পরে এলাকার সাধারণ মানুষের দাবিতে আমি ওই অভিযুক্ত শিক্ষককে ফোনে ও লোকমাধ্যমে ডেকে পাঠাই। কিন্তু সে আমার ডাকে কোন সাড়া দেয় নি। এমনকি ওই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি তার নিজের বড় ভাই নাজিম উদ্দিনও স্কুলে উপস্থিত হন নি।
পরে প্রধান শিক্ষক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর এ ঘটনার একটি লিখিত অভিযোগ প্রদান করেন। এসময় তিনি তারা অনুলিপি হিসেবে শিক্ষা কর্মকতা ও থানাকে অবহিত করেছে বলে জানান।
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে কোন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীকে যৌন হয়রানিসহ এ ধরনের কোন ঘটনার অভিযোগ উঠলে তাকে প্রাথমিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করতে হবে। এরপর তদন্তে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে চাকরি হতে অব্যাহতি দিতে হবে।
এদিকে, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচার না করায় ক্ষোভে ফুসছে বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক লেজামের বিচার করা না হলে ক্লাস বর্জনসহ লাগাতার কর্মসূচির ঘোষাণাও দিয়েছে শিক্ষার্থীরা।
বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ছাত্রী অভিযোগ করে বলেন, শিক্ষকরা তাদের কাছে পিতার সমতুল্য। কিন্তু পিতার কাছে যদি তার মেয়ে নিরাপদ না থাকে, তাহলে বর্তমান সমাজে মেয়েদের লেখাপড়া করার মতো সুষ্ঠু পরিবেশ থাকবে না। এছাড়া কোন পিতা মাতা তার মেয়েকে এ ধরনের শিক্ষকের আড়ালে লম্পটের কাছে পড়তে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে না।
অভিভাবকরা অভিযোগ করেন, বিদ্যালয়ের মতো একটি জায়গাতেও যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটে। তাহলে তাদের মেয়েরা নিরাপদ কোথায়। তাদের দাবি এ ধরনের শিক্ষককে চাকরি থেকে অব্যাহতিসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
বদ্ধনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি নাজিম উদ্দিন বলেন, আমি ঘটনাটি শুনেছি। এ ঘটনা নিয়ে প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু অভিযুক্ত শিক্ষক উপস্থিত না থাকায় আমি স্কুলে যাই নি।
এদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার সাদাত বদ্ধনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি অভিযোগ পেয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে তিনি জানান।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ