দুর্গাপুরে সরকারি বিদ্যালয়ে চলছে রাত্রিকালীন কোচিং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ

আপডেট: অক্টোবর ১৮, ২০১৬, ১১:৪৭ অপরাহ্ণ

দুর্গাপুর প্রতিনিধি
দুর্গাপুরের আলীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বেআইনিভাবে বহিরাগত শিক্ষকদের নিয়ে রাত্রিকালীণ চলছে রমরমা কোচিং বাণিজ্য। প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলামের পরিচালনায় সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত্রি ৯টা পর্যন্ত আলীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কোচিং করছেন।
এতে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নামে গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। সেই সঙ্গে দিনের পর আবার রাতে একই চাপ দেয়া হচ্ছে। ফলে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থীর অবিভাবকরা অভিযোগ করে বলেন, বিদ্যালয়ে দিনের ক্লাসগুলো ঢিলেঢালা ভাবে পার করা হচ্ছে। আর রাত্রিকালিন কোচিং এ প্রাধান্য দিয়ে যাচ্ছেন প্রধান শিক্ষক। প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে শিক্ষকরা ইচ্ছেমতো ক্লাস করান। যতটুকু সময় ক্লাসে দেন তারা রাত্রিকালিন কোচিং এর পরামর্শ বেশি প্রদান করেন। ক্ষুদে কোমলমতি শিক্ষাথীরা প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে রাত্রিকালিন কোচিং এ উপস্থিত হন। স্কুলে আসার আগে তারা বাবা মা’র কাছে আবদার করে বসে ‘আজ কোচিং এর ফি চেয়েছেন স্যারেরা’ না দিতে চাইলে শিক্ষার্থীরা আর স্কুলে আসেন না বলে অভিযোগ করেন।
তারা আরো বলেন, সরকার প্রাথমিক শিক্ষা খাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য কোচিং ব্যবস্থা বন্ধ করেছেন। কিন্তু সরকারি ওই নির্দেশনা অমান্য করে সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে রমরমা কোচিং বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন প্রধান শিক্ষক।
অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে গিয়ে গত রোববার রাত ৮টার সময় বিদ্যালয়ে দেখা যায়, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোচিং বানিজ্যর এমন চিত্র। দিনে সরকারি শিডিউল অনুযায়ী ৭ ঘণ্টা ক্লাস করে শিক্ষার্থীরা আবার সন্ধার পর বসেছে এ কোচিং করতে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত্রি ৯টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলায় সরকারি অর্থে আলোকসজ্জায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নেয়া হচ্ছে এ কোচিং ক্লাস।
এদিকে সরকারি বিদ্যালয়ে রাত্রিকালীণ কোচিংয়ের সহযোগিতা করায় ওই বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী হাবিবুরের বিরুদ্ধে উৎকোচ নেয়ার অভিযোগ উঠছে। রাত্রিকালীণ কোচিংয়ে শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ কাড়তে সরকারি রুমগুলোতে করা হয়েছে জমজমাট আলোকসজ্জা। তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দাবি করেছেন শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল করতেই তাদের এমন ব্যবস্থা।
বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী হাবিবুর রহমান জানান, ‘গত ৩ মাস থেকে বহিরাগত ও নিজস্ব শিক্ষক নিয়ে কোচিং চলছে। আমরা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে কোচিং করাবো। এতে কারো যায় আসে কি?। সরকারের কোন নিয়ম মেনে পড়াশুনা করালে ভালো ফলাফল শিক্ষার্থীরা করতে পারে না। আমরা দিনে এবং রাত্রে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করায়।’ তবে নৈশপ্রহরী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের কথাও স্বীকার করেন। তারা বহিরাগত দুই শিক্ষককে কোচিং ক্লাস করার জন্য নিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, স্কুলে দিনে ক্লাসের পর বিদ্যালয়ে রাত্রিকালীণ কোচিং প্রধান শিক্ষকের অহেতুক কা-। বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন থেকে এই কোচিং চলছে। বলার বা দেখার কেউ নেই। দিনের ক্লাসের পরও আবার রাত্রে এ রকম কোচিং ব্যবস্থায় ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের বাড়ি ফিরতেও বিড়ম্বনা পোহাতে হয়। দ্রুত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের এ রকম রাত্রিকালীন কোচিং ব্যবস্থা বন্ধ হওয়া উচিত বলে দাবি করেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম জানান, এটা কোচিং বাণিজ্য না। শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের স্বার্থেই রাতে পড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. দেওয়ান নাজমুল ইসলাম জানান, ৮ বছরের উপরের বয়সের ছেলে মেয়েদের দিনে ৭ ঘণ্টা মেধার ওপর চাপের পরে আবার অতিরিক্ত ৩ ঘণ্টা একই কাজের চাপ দিলে মেধার মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গোফরান হালিম জানান, কোচিংয়ের কথা শুনেছি। তবে এটা বিশেষ কোচিং। বাণিজ্য নয়। ভালো ফলাফলের ভিত্তিতেই মূলত ওখানে রাত্রিকালীণ কোচিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে দোষের কিছু দেখছি না। কোচিং প্রাইভেট বলতে যে টা বুঝায় মূলত উচ্চম্যাধমিক ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা পড়লে। প্রাথমিকের কোনো শিক্ষার্থীর কোন কোচিং বলে কিছু নেই। তবে ওখানে বহিরাগত শিক্ষক রাতে পড়ায় কি না আমার জানা নেই। বহিরাগত শিক্ষক নিয়ে এসে রাতে বিদ্যালয়ে কোচিং চললে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান ওই শিক্ষা কর্মকর্তা।