দুর্গাপূজার উৎপত্তি স্থল আজো স্বীকৃতি পায় নি পূণ্যভূমি হিসেবে!

আপডেট: অক্টোবর ২৩, ২০২৩, ৮:৩৯ অপরাহ্ণ


রাশেদুল হক ফিরোজ, বাগমারা:


রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ইতিহাস খ্যাত তাহেরপুরে হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাঙালিদের প্রথম দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হলেও এ স্থান এখনো তাদের পূণ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃতি পায় নি। দুর্গাপূজার উৎপত্তি স্থল হওয়া সত্বেও এ স্থানটি এখনো অবহেলিত।

জানা গেছে, মোঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে বাংলার অন্যতম বারো ভূঁইয়ার রাজা কংস নারায়ণ রায় মোঘল বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের প্রাক্কালে ১৪৮০ খ্রীষ্টাব্দে ৮৮৭ বঙ্গাব্দে শরৎকালে বিশ্বের সর্বপ্রথম তৎকালীন নয় লক্ষ টাকা যা বর্তমানের ছয়শত কোটি টাকার সম-পরিমান অর্থ খরচ করে জাঁকজমকপূর্ণভাবে বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে রাজ পুরোহিত রমেশ শাস্ত্রীর দ্বারা তাহেরপুরে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন।

এরই ধারাবাহিকতায় অদ্যবধি সারাবিশ্বের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে দুর্গাপূজা স্বীকৃত। দুর্গাপূজার গোড়ার কথা কালক্রমে যাতে হারিয়ে না যায় সে জন্য তাহেরপুরে ‘রাজা কংস নারায়ন কর্তৃক প্রথম দুর্গাপূজা সৃষ্টি, মন্দির ও জায়গা রক্ষনাবেক্ষন ও উন্নয়ন কমিটি’- গঠিত হলেও তার কার্যক্রম প্রায় থেমেই গেছে। এই কমিটি দুর্গাপূজার উৎপত্তি স্থল তাহেরপুরকে পৃথিবীর সর্বপ্রথম বাঙালি হিন্দুদের শারদীয় উৎসবের পূণ্যস্থান হিসেবে স্বীকৃতি পেতে অতীতে বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারের নিকট আবেদন করে এলেও তা এখনো কার্যকর করা হয় নি। তবে বাগমারার সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক মন্দিরে পচিশ লাখ টাকা ব্যয়ে ব্রঞ্জের তৈরি প্রতিমা স্থাপন করে দেন। এছাড়া সরকারি, বে-সরকারিভাবে মন্দিরের উল্লেখ্যযোগ্য তেমন উন্নয়ন নেই।

তাহেরপুরে পর্যটকদের তীর্থ স্থান করার দাবিতে ২০০২ সালে তাহেরপুর পৌরসভার প্রয়াত চেয়ারম্যান আলো খন্দকারের সহযোগিতায় কমিটির সম্পাদক সঞ্জীব রায় মিন্টু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরসহ বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করেন। কিন্তু পূণ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃতি তো দুরের কথা এখানে উন্নত মানের একটি মন্দির সরকারের পক্ষ থকে নির্মিত হয় নি।
ব্যবসায়ী সমিত রায় আক্ষেপ করে বলেন, জনপ্রতিনিধিরা ভোটের আগে হিন্দুদের অনেক আশ^াস দেন। কিন্তু ধর্মীয় ব্যাপারে তেমন কোন কাজ করে না।

তাহেরপুর মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক সত্যজিৎ রায় তোতা বলেন, এখানকার রাজবাড়ী গোবিন্দ মন্দিরে কেবল একটি বৃহৎ শিলা লিপি রয়েছে যা পৃথিবীর দুর্গাপূজার প্রতিষ্ঠা, স্থান, সন, তারিখ ও অতীত কিছু ইতিহাস রয়েছে। এই শিলালিপি ছাড়া আর তেমন কিছু নিদর্শন নেই। তাহেরপুরের দুর্গাপুরীতে দেবী দূর্গার মূল বেদী পর্যন্ত এখন নেই। বর্তমানে দুর্গাপূরীর বেদীমুলে কলেজ এবং তার পার্শ্বে তিনশত বছরের সেই প্রাচীন গাছটি নাম না জানার কারণে ‘অচিন বৃক্ষৎ’ হয়ে কালের স্মৃতি বহন করছে। তাহেরপুরের ইতিহাসকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে গঠিত তাহেরপুরের কমিটি এবং বাংলাদেশ পূঁজা উদযাপন পরিষদের রাজশাহী মহানগর কমিটির নেতৃবৃন্দ আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন্ বলে জানা গেছে।

জানা যায়, পাঠান জায়গীরদার তাহের খানের নামানুসারে রাখা তাহেরপুর এক সময় বাগমারা-দূর্গাপুরের সমন্বয়ে থানার মর্যাদা লাভ করেছিল (বর্তমান পিঁয়াজ হাটা)। কিন্তু তৎকালীন রাজার বিরোধীতা ও প্রশাসনের সুবিধার্থে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের পর থেকে আবারো তাহেরপুরবাসী থানার দাবি তোলে। যা অগ্রাহ্য হয়। থানা না হলেও এখানকার মানুষ ঐতিহ্যগত দিক দিয়ে এখনো গর্বিত। শারদীয় দুর্গোৎসবকে বাঙালি হিন্দুরা সুদূর অুীত থেকেই গ্রহণ করে আসছে অন্তরের আকুতি দিয়ে। জ্ঞানের মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের মেল-বন্ধন ঘটানোর জন্য।

তাদের মতে, দুর্গাদেবীর জন্ম হয় স্বর্গে সমস্ত দেবতাদের মহাতেজ শক্তি নিয়ে মহাপরাক্রমশালী দূর্গম ও মহিসূরকে বধ করার মানষে। দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ এবং ভয় ও শত্রু থেকে রক্ষা করেন দুর্গা। তাই সেই দুর্গার স্বরণে প্রথম পূজার স্থান তাহেরপুরকে সরকারিভাবে পূন্যভূমি হিসেবে স্বীকৃতি দেবার দাবি জানিয়েছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ।

মন্দির কমিটির কয়েকজন জানান, অনেক আগেই তাহেরপুরকে তীর্থস্থান হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ধর্ম মন্ত্রনালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে। যা এখনো আলোর মুখ দেখে নি। তারা এ স্থানটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে সরকারের নিকট তীর্থস্থান হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। ঐতিহাসিক এ স্থানটিকে পূণ্যভূমি হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এখানে পর্যটন নগরী গড়ে উঠবে। তাই সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগীতা কামনা করেন তারা।

তাহেরপুরের দুর্গাপুরী গোবিন্দ বাড়ি মন্দিরের সভাপতি নিশিত কুমার সোনা সাহা ও সাম্পাদক শ্রী চিরঞ্জিব কুমার রায় বাবু জানান, ঐতিহাসিক এ স্থানটিকে পুণ্যভূমি হিসেবে ঘোষণা করা হলে এখানে পর্যটন নগরী গড়ে উঠবে। সারাবিশ্বের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের প্রতি বছর ঢল নামবে এখানে।

তাহেরপুর পৌর মেয়র আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমরা ঐতিহাসিক তাহেরপুরকে একটি পর্যটন কেন্দ্র ও ধর্মীয় তীর্থস্থান হিসাবে গড়ে তোলার ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। এ উপলক্ষ্যে এখানে অনেক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে একটি আধুনিক মানের হোটেল নির্মাণের জন্য আমরা বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রন জানিয়েছি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Exit mobile version