দূরে থাকুক রাজনীতি, বাঁচুক ক্রিকেট!

আপডেট: জুলাই ১৩, ২০১৭, ১২:৫২ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


রাজনীতিই ক্ষতি করেছে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের। ফাইল ছবি

শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট এপিটাফ লেখার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অন্তত দেশটির পত্র-পত্রিকার কথা মানলে সেটাই মনে হচ্ছে! বাংলাদেশের কাছে টেস্ট হেরে বসার পর হাহাকার উঠে যাওয়া দেশটি এখন স্তব্ধ হয়ে গেছে জিম্বাবুয়ের কাছে ওয়ানডে সিরিজ হেরে বসায়। আর এরপরই শুরু হয়েছে কাদা ছোড়াছুড়ি। একে অন্যকে দোষারোপ করে শান্তি খুঁজছেন সবাই। তবে, সবার মন্তব্যেই একটি বিষয় পরিষ্কার, ক্রিকেট ও রাজনীতির দহরম-মহরমই এ দুর্দশার জন্য দায়ী।
‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ এই মুহূর্তে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের খুব জনপ্রিয় বিষয়। ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ের ১১তম দল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঘরের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজ খুইয়ে বসার পর নানা ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ভেসে বেড়াচ্ছে দ্বীপদেশটির আকাশে-বাতাসে। সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমী থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কার বাঘা বাঘা সব ক্রীড়া সাংবাদিক দোষারোপের ডামাডোলে সবারই আশ্রয় এখন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।
শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট নিয়ে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি হচ্ছে-দ্বীপদেশটির ক্রিকেট পুরোপুরি পরিচালনা করে একশ্রেণির ‘মাফিয়া গোষ্ঠী’। এরাই নাকি অধিনায়ক পদে কে থাকবেন, কে থাকবেন না, নির্বাচকেরা কোন কোন খেলোয়াড়কে নির্বাচিত করবেন-এসব নিয়ন্ত্রণ করে। এমনকি খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকও নাকি প্রভাব রাখেন দল নির্বাচনে! এর কতটুকু সত্য, আর কতটুকু উর্বর মস্তিষ্কের উদ্ভাবন, এ আলোচনা থাকছেই। তবে দেশটির অন্যতম শীর্ষ দৈনিক দ্য আইল্যান্ডের ক্রীড়া সম্পাদক ক্লেমেন্টাইন যখন এমন অভিযোগে পত্রিকার পাতা ভর্তি করেন, তখন ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোকে সত্যি মনে করতে ইচ্ছে জাগে। জিম্বাবুয়ের কাছে হারের পর শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট কিংবদন্তি কুমার সাঙ্গাকারা একটি টুইট করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘জিম্বাবুয়ের কাছে সিরিজ হারের পর আপনারা এখন কাকে দোষারোপ করবেন? অধিনায়ককে? ম্যানেজারদের? ষড়যন্ত্র তত্ত্ব? নাকি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম ও সঠিক অবকাঠামোর অভাবকে!’
তিনি লিখেছেন, এটা খেলোয়াড়দের দোষারোপ করার সময় নয়। স্বার্থান্বেষী লোকজনের উচিতও নয় এই বাজে সময়টাকে পুঁজি করে সামাজিক মাধ্যমে তালি কুড়ানোর। তিনি মনে করেন, ‘এগুলো করা মানে মূল সমস্যা থেকে মনোযোগ অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া। এই সময়ই খেলোয়াড়দের বেশি করে সমর্থন দেওয়া উচিত। তাঁদের সমস্যাগুলো অনুধাবন করা উচিত এবং ধৈর্য ধরা উচিত। ভবিষ্যতের উন্নতির জন্য সঠিক কার্যক্রম গ্রহণ করা।’
গত দুই বছর খেলা ৪৬টি ওয়ানডের মধ্যে মাত্র ১৬টিতে জিতেছে শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশের বিপক্ষে গত মার্চ তিন সংস্করণের একটিতেও সিরিজ জিততে পারেনি, এবার তো জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হেরেই বসল। অথচ ২০১৪ সালেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে এ দল। গত বছর অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে ধবল ধোলাই করেছে। একসময় ঘরের মাটিতে অন্যতম সেরা দল হিসেবে বিবেচিত, সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটে হঠাৎ কী হলো, যে দেশটির গোটা ক্রিকেট-ব্যবস্থা নিয়েই অনাস্থা উঠে গেছে সর্বত্র!
দ্য আইল্যান্ডের ক্রীড়া সম্পাদক শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটে বড় পরিবর্তন আনার কথা বলছেন। তাঁর কলামে লাসিথ মালিঙ্গাকে সরে দাঁড়াতে বলেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘অনেকেই বিশ্বাস করেন, সময় এসেছে মালিঙ্গা আর শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের সম্পর্কে ইতি টানা উচিত।’ তিনি মনে করেন, ‘সত্যি বলতে বোর্ডের সেদিনই মালিঙ্গার সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করা উচিত ছিল, যেদিন সে ক্রিকেটের তিন সংস্করণের মধ্য কেবল একটিকে (টি-টোয়েন্টি) বেছে নিতে চেয়েছিল।’
শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট যে মাফিয়ারা নিয়ন্ত্রণ করে, এমনটাই দাবি ক্লেমেন্টাইনের। সাচিথ পাথিরানাকে নাকি দলে রাখা হয়েছে ক্যান্ডির ‘ক্রিকেট মাফিয়া’দের প্ররোচনায় ও উৎসাহে, ‘বোর্ডের বার্ষিক সাধারণ সভায় পাথিরানার বাবার ছয়টি ভোট আছে বলেই দলে নিয়মিত সুযোগ পাচ্ছে।’
এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সূত্র ধরে শ্রীলঙ্কার আরও একটি জনপ্রিয় পত্রিকা সানডে টাইমস সম্প্রতি লঙ্কান ক্রিকেটের দুই বড় তারকা কুমার সাঙ্গাকারা ও মাহেলা জয়াবর্ধনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আছে তাদের নিয়েও। জয়াবর্ধনে ও সাঙ্গাকারার ম্যানেজারই দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস ও মালিঙ্গার এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন। অভিযোগ উঠেছে, ম্যানেজার নাকি শ্রীলঙ্কান জাতীয় ক্রিকেট দলের নির্বাচনে নিজের প্রভাব খাটান। সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে নাকি ওই এজেন্টের খেলোয়াড়কে জায়গা দিতেই বাদ পড়েছিলেন দ্বিতীয় ওয়ানডে জেতানো লক্ষ্মণ সান্ডাকান।
জয়াবর্ধনে ও সাঙ্গাকারা এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, একজন অধিনায়ক কিংবা ম্যানেজার দল নির্বাচনে মতামত দিতে পারেন, কিন্তু তিনি প্রভাব খাঁটিয়ে কোনো খেলোয়াড়কে দল থেকে বাদ দেবেন কিংবা দলে কাউকে নেবেন, এমন ভাবাটা ভুল। দল নির্বাচনের কাজটা পুরোপুরিই নির্বাচকদের দায়িত্ব।
তাঁরা বলেছেন, প্রতিটি অধিনায়কই চান দলে সেরা খেলোয়াড়দের নিতে। কারণ, এর ওপর নির্ভর করে নিজের অধিনায়কত্বের সাফল্য, দলের সাফল্য। দল জিতলেই সবাই অধিনায়ককে ভালো বলবেন, হারলে তাঁর ওপরই দোষারোপটা পড়বে।’
জয়াবর্ধনে ও সাঙ্গাকারার পরামর্শ শ্রীলঙ্কান বোর্ড ভেবে দেখবে কি না, সেটাই দেখার বিষয়। বোর্ড কিংবা ক্রীড়ামন্ত্রী যে সাধারণ মানুষের মতোই সমালোচনাতে ব্যস্ত! কিন্তু লঙ্কান ক্রিকেটে যে ঝড় বইছে, সেটা দ্রুত শান্ত হওয়াটা খুব জরুরি। দেশটির ক্রিকেটের বাজে সময়টা আসার জন্য যে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি একটা বড় ভূমিকা রাখছে, সেটি চোখ বন্ধ করেই বলে দেওয়া যায়। রাজনীতি যে ক্রীড়াঙ্গনের কতটা ক্ষতি করে, সেটি শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট বুঝছে বড় মূল্য দিয়ে। শ্রীলঙ্কার বাজে অবস্থা দেখে অন্যরাও সেটা বুঝতে পারলে ভালো। সূত্র: দ্য আইল্যান্ড, সানডে টাইমস,প্রথম আলো অনলাইন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ