দূর্বা

আপডেট: অক্টোবর ১৫, ২০২১, ৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ

ফেরদৌস জান্নাতুল:


এখন বর্ষা। সবুজ ঘাস বিছানো নদীর পাড় জলে টইটুম্বুর। মাঝিদের তুমুল ব্যস্ততা। ভোরের নরম সুর্য থেকে সন্ধ্যার অস্তগামী সূর্য অবধি তাড়া এই জেলে পল্লীতে। কেউ জাল বুনে, ছিপ সাজায়, আবার কেউ হাঁড়িতে বাঁধে দড়ি। নৌকায় এসব হাঁড়ি দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয় মাছ রাখার পাত্র হিসেবে। জাল এক গভীর মায়া, যেখানে ওরা মাছের সাথে জড়ায় নিজেদেরও। মাঝি-বউদের ডাগর চোখের কাজলও যেন এক মায়ার পৃথিবী। অবুঝ শিশুদের টগবগে মেজাজকে বোঝার জো নেই এক কঠিন পৃথিবীর ছায়াতলের পথিক ওরা। নদী যাদের একবুক স্বপ্ন ও হতাশা। যার ভাঙাগড়ার তালে চলে দূর্বা ও দুতি’র মতো কয়েক’শ পরিবার। দূর্বা এক ফড়িং। মানুষ ফড়িং। চঞ্চলা হরিণীর মতো যার চলা। দূর্বার বেড়ে ওঠা এই নদী পারের দূর্বাকে সাথে করেই। দূর্বা ঘাসের মতোই-সবুজ পৃথিবী যার মনে। সে দেখে রোদ, রোদের যৌবন-পড়ন্ত বিকেলে জলের গায়ে কেমন খেলা করে। মাছেদের সঙ্গী হয়ে নদীতে কাটে সাঁতার। মাছের প্রকট গন্ধেও থাকে আপন আপন ভাব। জন্মের পর থেকেই এই গন্ধ তার সঙ্গী। এমন গন্ধস্রোতের মায়ায় কাটে তার দিন। দূর্বাদের বাড়ি বলতে একটা খুপরি ঘর। যার চারকোণে চারটে বিছানা। দু’বোন দু’পাশে আর মা-বাবা অপর পাশে শোয়। ঝড়-জলোচছ¡াসে এক চিলতে টিন আঁকড়ে পড়ে থাকে ওরা। জীবন যেন ভাঁজখোলা শাড়ির মত ওদের কাছে। দূর্বা অঙ্কুরিত বৃক্ষের মতো। কৌতূহলি চোখ তার কুঁরে খায় চারপাশ। সে ভাবতে জানে। বলতে চায়, সৃষ্টির এত বিভেদ কেন? বিশাল খোলা আকাশের তলে কেমন থোকা থোকা বৈষম্য। লোভাতুর মানুষগুলো কই যেন নিজেকে হারিয়ে খুঁজতে ভুলে গেছে নিজেরই অস্তিত্ব। ঘন বিজলীর মতো স্বভাব দুতির-ক্ষণে ক্ষণে রেগে যায়। দুতি দূর্বার ছোট বোন। বয়স এগার।

প্রতিদিন ইট, কাঠের চুলোয় পুড়ে যায় ওর এগার বছরের শিশু-শরীরখানি। মা ভোরবেলা কাজের জন্য বেড়িয়ে গেলে দু’বোনকই রান্নার কাজ করতে হয়। তারপর বেড়িয়ে পড়া বাবার সাথে মাছ বেচতে। নদীর পাড়ে প্রতিদিন অপেক্ষা করে দূর্বা-দুতি কখন ওদের বাবা নৌকা ভেড়াবে পারে। প্রতিদিনের মতো আজও বসেছে বটতলে। দূর্বার ঘন উস্কোখুস্কো চুলে বিলি কাটে দুতি। হঠাৎ পেছনে কার ডাক। একটা ছবি তুলে দিবে? দু’জনে একসাথে উঠে দাঁড়ায়। দু’জনের চোখে-মুখেই কৌতুহল। এক কালো লিকলিকে গড়নের ভদ্রলোক ওদের হাতের দিকে ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলে-একটা ছবি তুলে দাও। এখানে
চাপলেই ছবি হবে। দুতি হাত বাড়ালো -লোকটি দাঁড়ালো বটগাছের সাথে। দূর্বা আপাদমস্তক ভদ্রলোকটিকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। দামী জামাকাপড়, জুতা, মাথায় ক্যাপ, ব্যাগ, ঘুড়ি; এমনকি আঙুলের রিংটিও। মনে মনে নিজের বাবাকে কল্পনা করে সে। যেন মাছ ধরা শেষে তার বাবা এমন প্যান্ট-শার্ট ঘড়ি হাতে হেসে হেসে ছবি তুলছে। জন্মের পর থেকে কোনদিনও হাসতে দেখেনি তার বাবাকে। বাবা যেন এক মলিন মুখো স্ট্যাচু।

ভদ্রলোকের মুখ থেকে ফেসবুক শব্দটি কানে আসতেই চমক ভাঙলো দূর্বার। দুতিকে কী সব বলছিলো লোকটি । দূর্বা একটু আধটু জানে ফেসবুক সম্পর্কে। জানে এর জন্য দামী মোবাইল ফোন লাগে। যাদের দু’বেলা খাবার জুটা একটি আশীর্বাদ তাদের আবার মোবাইল ফোন! দূর্বা আপন মনে বলে ওঠে, ‘এই নদী আমার ফেসবুক।’ কে জানে কোন বোধে তার মনে এমন কথার ফুল ফোটে। আকাশে আবারো কালো মেঘ। মায়া ছড়ানো মেঘ। ধীরে ধীরে বাতাসের শক্তি বাড়ছে। শব্দ বাড়ছে।

ঐ যে বাবার ডাক।
দূর্বা এদিকে হাড়ি লিয়ে আয়। ম্যাঘে ঢেকে লিয়েছে আকাশ। দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় দু’বোন। রাত হলে জেলে পাড়ায় এখন আর পুুঁথির আসর বসে না। ছোট-বড় মোবাইলে কেবলি আলো জ¦লে। চোখের দু’পাড়ে আলো জ¦লে-নেভে। দূর্বা চোখ বুজে জলের শব্দ শোনে। শব্দের গভীরে খোঁজে হয়তো কোন উত্তর। হয়তো কোন প্রশ্নই জানে না সে। তবু কী যেন ভাবায় তাকে। দূর্বা এক সময় স্কুলে যেতো। এখন যায় না। কিছুদিন হলো মায়ের কথায় স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তবে কেন এই নিষেধ মায়ের; তা সে জানে না।
ঝড় বাড়ছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বজ্রপাত হচ্ছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি ঘরসহ ওরা সবাই তলিয়ে যাবে নদী গর্ভে। দুতি ভয়ে আঁকড়ে ধরে বোনের শরীর। বাতাসের শো শো শব্দে কান ভারী হয়ে আসে। পানি এসেছে ঘরের দরোজায়। আর সেই পানিতে ভেসে এসেছে অসংখ্য ব্যাঙের ছানা। ঝড়ের শেষের সকাল। চকচকে এই সকাল দূর্বার জীবনে নিয়ে আসে এক অজানা শঙ্কা। দূর্বার বিয়ে।
দুর্বার কপালে রিষি দূর্বাসার মতো কারও হাত পড়েনি। পড়েনি ¯েœহের সর্বোচ্চ পরশ। তার ছিলো কেবলি ভাবনার অতল। যে অতলে খুঁজে পেতো নিটোল রঙ; মেঘদূতের মতো একটি আভাস। একটা খোঁজ তাড়িত মনের অন্দরে কেউ এসে টোকা দিতো। সে নড়ে উঠতো। পশ্চিমে সূর্য লাল হয়ে গেছে। অস্ত যাবে একটু পর। এমনি করে প্রতিদিন সূর্য অস্ত যায়। এমনি করে দূর্বারাও আসে। আলো না দিতেই অস্ত যায়। আলোর ভাষা কেউ বুঝে না। এক কৃত্রিম রঙমহলের খোঁজ অসুখে দৌড়ে মরে দিনগুলো। দূর্বারা দূর দেখে না আর। পথ থেকে মাটি তুলে ঘাস খোঁজে; শেকড় খোঁজে। শেকড় যে ছেকে নিয়েছে জেলেদের জাল।