দেবী সরস্বতী

আপডেট: জানুয়ারি ৩০, ২০২০, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

বিদ্যা ও কলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতী। আবহমানকাল এই দেবী বিভিন্ন দেশে বিভিন্নরূপে পূজিতা হয়ে এসেছেন। গ্রীকদেবী এথেনির (Atheny) সঙ্গে দেবী সরস্বতীর সাদৃশ্য অনেকে কল্পনা করে থাকেন। রোমানদেবী মিনার্ভার (Minerva) সঙ্গেও দেবী সরস্বতীর সাদৃশ্য কল্পিত হয়ে থাকে। দেবী মিনার্ভার সঙ্গে গ্রিকদেবী এথেনি একীভুত হয়ে গেছেন। ইনি সকল বিদ্যা, বুদ্ধি ও বিদ্যায়তনের অধিকারিণী। এথেনিয়াম (Athenaeum) শব্দের অর্থ বিদ্যামন্দির বা গ্রন্থাগার, বিদ্যাদেবী এথেনির নাম থেকেই সম্ভবত এথেনিয়াম শব্দের উৎপত্তি। আইরিশ দেবী ব্রিজিদ (Brighid) কাব্য, শিল্প ও আরোগ্যের দেবতা হিসাবে পূজিত। এর সঙ্গেও দেবী সরস্বতীর সাদৃশ্য কল্পনা করা হয়। তবে জাপানে পূজিত সমুদ্রদেবী বেনতেন যেন দেবী সরস্বতীর প্রতিমূর্তি। ইনি অষ্টভুজা, এর দুই হাত প্রার্থনার ভঙ্গিতে যুক্ত। বিউআ (বীণা) নামক বাদ্যযন্ত্র তাঁর প্রিয়। তাঁকে চিত্রে সমুদ্রগর্ভে পদ্মোপরি উপবিষ্টা অথবা বিউআ বাদনরত অবস্থায় দেখা যায়। বেনতেন যেন লক্ষ্মী, সরস্বতী ও সর্পের মিশ্রিত রূপ। তবে যবদ্বীপে প্রাপ্ত পদ্মাসনা বীণাহস্তা বীণাবাদনরতা সরস্বতী মূর্তি ও তিব্বতে বজ্রধারিণী ময়ূরবাহনা বজ্রসরস্বতীমূর্তি নিঃসন্দেহে আমাদের বিদ্যাদেবী সরস্বতী।
প্রাচীনতম বেদ ঋগ্বেদের ১০ম মন্ডলের ১২৫ সূক্তে দেবী সরস্বতী বাগদেবী রূপে উল্লিখিতা হয়েছেন। এই বাগ্দেবী মানুষের হৃদয়কে নির্মল ও পবিত্র করেন। ইনি অন্নদাত্রী, সুন্দর ও সত্যবাক্যের প্রেরণকর্ত্রী, সুবুদ্ধির উদ্বোধনকারিণী, যজ্ঞের ধারণকর্ত্রী। মহাসমুদ্রের মত অসীম পরমাত্মাকে চিহ্নের দ্বারা প্রকাশ করেন সমস্ত নরনারীর হৃদয়ে জ্যোতি সঞ্চারিত করেন। কাজেই ঋগ্বেদে ইনি ঠিক বিদ্যার দেবী নন। ইনি শক্তিরূপিণী। কিন্তু অথর্ববেদে সরস্বতীই বাগ্দেবী। ব্রাহ্মণে, রামায়ণে, মহাভারতে বাগ্দেবী স্পষ্টই বিদ্যাদেবী সরস্বতী। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে ইনি পঞ্চ প্রকৃতির অন্যতম এবং পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রী। কোনো কোনো পুরাণে ইনি ব্রহ্মার মানসপুত্রী ও স্ত্রীরূপে উল্লিখিতা হয়েছেন। আবার কোনো কোনো পুরাণে ইনি গণদেবতা গণেশের স্ত্রীরূপেও বর্ণিতা হয়েছেন। চণ্ডীতে এই দেবী বাগীশ্বরী, বীণাপাণি, বাগ্-বাদিনী, সরস্বতী, ভারতী, বাণী, সারদা, মহাশ্বেতা, মহাবিদ্যা, মহালক্ষ্মী প্রভৃতি বিভিন্ন নামে অভিহিতা হয়েছেন। শাস্ত্রে আছে, ইনি সংস্কৃত ভাষা ও দেবনগরী লিপি এবং কাব্যপুরুষের জন্মদাত্রী।
সরস্বতী একটি মতে সিন্ধু, অন্যমতে মধ্যপ্রদেশে দৃষদ্বতীর সহযোগী নদী, পৌরাণিক মতে সরস্বতী অন্তঃসলিলা হয়ে প্রয়াগে এসে মিশেছে। সরস্বতী শব্দের অর্থ সরস্ (জল)+বতী অর্থাৎ জলবতী বা নদী। সরস্বতী প্রাচীন আর্যভূমি সপ্তসিন্ধুর অন্যতম নদী। সরস্বতী নদীশ্রেষ্ঠা, দেবীশ্রেষ্ঠা, জননীশ্রেষ্ঠা (নদীতমে, দেবীতমে, অম্বিতমে)। নদী সরস্বতী যে বৈদিক যুগেই প্রসিদ্ধ ছিল তা নয়, পরবর্তীকালে মহাভারতে, পুরাণে, কাব্যে সরস্বতী পূতসলিলা নদীরূপে কীর্তিতা হয়েছেন। ঋষিরা সরস্বতী নদী তীরে বেদ অধ্যয়ন ও বেদচর্চা করতেন, কালক্রমে নদী সরস্বতীই বিদ্যাদেবী সরস্বতীতে রূপান্তরিত হয়ে গেছেন। বৈদিক চিন্তাধারায় নদী প্রত্যক্ষ দেবতা এবং পুষ্টি, আরোগ্য, স্ত্রী ও ধনদাত্রী।
বর্তমানে বাংলাদেশে ও পশ্চিমবঙ্গে দেবী সরস্বতী যে মূর্তিতে পূজিতা হয়ে থাকেন সে অনুসারে ইনি দ্বিভুজা, শ্বেতবরণী, শ্বেতশতদলবাসিনী, শ্বেতহংসবিহারিণী এবং বীণা-পুস্তক-কমলহস্তা। শ্বেত বা শুভ্র বর্ণ নির্মলতারÑ পবিত্রতার প্রতীক। তাই পবিত্রতার মূর্ত বিগ্রহ চৈতন্যস্বরূপা এই দেবীর সবই শুভ্রবর্ণ। কবিগুরুর ভাষায় ইনি ‘বিমল-মানস-সরসবাসিনী শুক্লবসনা শুভ্রহাসিনী বীণাগঞ্জিত মঞ্জুভাষিণী এবং কমলকুঞ্জাসনা’।
তান্ত্রিক সাধকরা নীলবর্ণা সরস্বতীর অর্চনা করে থাকেন। সেখানে এই দেবী কৃষ্ণা নামে অভিহিতা। অন্যত্র যে নীলবরণী সরস্বতীর উল্লেখ পাওয়া যায়, তদনুসারে ইনি শববাহনা চতুর্ভুজা এবং ত্রিনয়নী। চার হাতে তাঁর খড়গ নরমুন্ড অসি ও নীলোৎপল। ইনি সম্পদ, শ্রী ও সৌভাগ্যদায়িনী। কোনো কোনো স্থানে ইনি দশ মহাবিদ্যার অন্যতমা রূপেও বর্ণিত হয়েছেন। সেখানে এঁর রূপ অতি ভীষণা। কোনো কোনো গ্রন্থে অষ্টভুজা সরস্বতীর উল্লেখ আছে। এই অষ্টভুজা সরস্বতী শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামক মহাদানবদ্বয়কে সংহার করেছিলেন। এঁর আট হাতে ছিল বাণ, শূল, মুষল, চক্র প্রভৃতি আটটি প্রহরণ। শাস্ত্রে আছে, এই দেবীর আরাধনায় সর্বশাস্ত্রে পারঙ্গম হওয়া যায়। অন্যত্র দেবী সরস্বতী আবার মহাকালী রূপেও বর্ণিতা হয়েছেন। ইনি শবারূঢ়া এবং খড়গ, মালা, অঙ্কুশ ও পুস্তকধারিণী। এই দেবীর আরাধনায় ধর্মশাস্ত্রাদিতে ব্যুৎপত্তি লাভ হয়।
শুধু হিন্দু ধর্মেই নয়, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মেও দেবী সরস্বতীর পূজার প্রচলন আছে। বৌদ্ধ মহাযান গ্রন্থগুলিতে জাঙ্গুলীতারা, সিততারা ও বজ্রতারা নামে তিনজন দেবী আছেন, এঁরা ব্রাহ্মণ্য সরস্বতীর অনুরূপ। বৌদ্ধ সাধনমালাতে মহাসরস্বতী, বজ্রবীণা সরস্বতী, বজ্রসারদা ও আর্যসরস্বতীÑএই চার প্রকার সরস্বতী আছেন। জৈন ধর্মাবলম্বীরাও মাঘী শুক্লাপঞ্চমী তিথিতে উপবাসী থেকে পুস্তক, লেখনী, মস্যাধার প্রভৃতি বিদ্যারাধনার উপকরণগুলিকে বিশেষ যত্নসহকারে স্থাপন করে পূজা করে থাকেন। এই দিনটি জৈনদের মধ্যে জ্ঞানপঞ্চমী বা বিদ্যাপঞ্চমী নামে অভিহিত।
জৈন ধর্মগ্রন্থে ষোল প্রকারের সরস্বতীর উল্লেখ আছে। এঁরা হলেনÑ দেবী কালী, মহাকালী, দেবী রোহিণী, দেবী মানবী, দেবী গান্ধারী, বাণী চক্রেশ্বরী, সরস্বতী গৌরী, প্রজ্ঞপ্তি দেবী, মানসী দেবী, বাণী বৈরাটী, সরস্বতী অচ্যুতা, বজ্রশৃঙ্খলা দেবী, দেবী বজ্রাঙ্কুশা, মহাজ্বালা দেবী, মহামানসী দেবী ও পুরুষদম্ভাভারতী। এঁদের কেউ বা দ্বিভুজা, কেউ বা চতুর্ভুজা এবং হংস, কোকিল, ময়ূর, সিংহ, গোধা, মহিষ, মৃগ, সর্প বা গোবাহনা।
জৈন সম্প্রদায় হয়তো চৌষট্টি কলার প্রধান চতুর্থাংশ কলা ও বিদ্যার দেবী রূপে এই ষোল প্রকারের সরস্বতীর কল্পনা করে থাকবেন। তাঁদের মতে এই ষোড়শ বিদ্যা দেবীর কেউ জ্ঞান, কেউ ভক্তি, কেউ সংযম, কেউ প্রতিভা, কেউ তপস্যা, কেউ বা বিনয় দান করে থাকেন।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা যে বিদ্যাদেবীর আরাধনা করে থাকেন তাঁর বর্ণ নীল। এই দেবী নীলকমলাসনা এবং ডম্বরু ও শূলধারিণী। বৌদ্ধরা মনে করেন এঁর অর্চনায় সর্ববিদ্যা লাভ হয়।
শ্বেত বর্ণের মাঝে শুভ্রতা, আছে পবিত্রতাÑ জ্ঞানের প্রকৃত বর্ণও শ্বেত। তাই জ্ঞান ও নির্মলতার মূর্ত প্রতীক এই দেবী সরস্বতীর সবই শ্বেত বর্ণ। দেবী সরস্বতী সত্ত্বগুণময়ী। সত্ত্বগুণ প্রকাশাত্মক, শ্বেতবর্ণটিও প্রকাশধর্মী। দেবী সরস্বতী সূর্যসমা জ্যোতি প্রকাশিকা। লেখনী পুস্তক মস্যাধার বীণা শঙ্খ শৃঙ্খল হংস কোকিল ময়ূর কমল প্রভৃতি বিদ্যা ও কলার প্রধান অঙ্গ বলে সরস্বতীর পূজার সঙ্গে এগুলিরও পূজা হয়ে থাকে। সরস্বতীর প্রাচীনতম প্রতীক বীণা এবং দ্বিতীয় প্রাচীনতম প্রতীক পুস্তক।
দেবী সরস্বতীর প্রাচীনতম মূর্তি পাওয়া যায় ভারহুতে খ্রি.পূ. ১ম বা ২য় শতকে। দ্বিভুজা বীণা বাদনরতা এই দেবী পদ্মের উপর দণ্ডায়মান। অদ্ভূত সুন্দর মূর্তি। মথুরার কঙ্কালী টিলায় প্রাপ্ত মূর্তির হাতে প্রথম পুস্তক পাওয়া যায়। দু পাশে দুজন অনুচর দাঁড়িয়ে আছে। পাদপীঠে কুষাণ যুগের ব্রাহ্মী অক্ষরের পরিচয় রয়েছে। মূর্তিটি ১৩২ বা ১২২ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইনি জৈন বিদ্যাদেবী। লক্ষ্মৌ জাদুঘরে এই মূর্তি সংরক্ষিত আছে। তাঞ্জোরে বৃহদীশ্বর মন্দিরে প্রাপ্ত দেবী সরস্বতী দ্বিভুজা বীরাসনে উপবিষ্টা, পুস্তকহস্তা। মূর্তির উপরে একটি গাছÑ যেমন জ্ঞানের প্রতীক বোধিবৃক্ষ।
গীতায় আছে, ‘ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে’ অর্থাৎ এই জগতে জ্ঞানের ন্যায় পবিত্র আর কিছু নেই। আরও বলা হয়েছে, শ্রদ্ধাবান্ লভতে জ্ঞানং তৎপরঃ সংযতেন্দ্রিয়ঃ অর্থাৎ যিনি শ্রদ্ধাবান, একনিষ্ঠ ও সংযমী তিনিই জ্ঞানলাভ করেন। অর্থাৎ তিনিই দেবী সরস্বতীর কৃপালাভে ধন্য হন। তাই দেবী সরস্বতীর কৃপা লাভ করতে গেলে আমাদের শ্রদ্ধাশীল, অধ্যবসয়ী ও সংযতচিত্ত হতে হবে।
বিদ্যার্থীদের কাছে এই মাঘী শুক্লা পঞ্চমী তিথিটির তথা সরস্বতী পূজার দিনটির আবেদন অতি গভীর। এই বিশেষ দিনটির জন্য তারা সারা বছর উন্মুখ আগ্রহ নিয়ে বসে থাকে। এই দিনটিকে বিদ্যার্থীরা পূর্ণ ছুটির দিন হিসেবে পালন করে এবং লেখাপড়া গানবাজনা চিত্রাঙ্কন প্রভৃতি সর্বপ্রকার বিদ্যানুশীলন থেকে সাধারণত বিরত থাকে।
লেখক: প্রফেসর (অব.), ভাষা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।