দেলদ্বারভাঙা স্টেশন

আপডেট: জানুয়ারি ৩১, ২০২০, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

আনিফ রুবেদ


দেলদ্বারভাঙা স্টেশনে পৌঁছে গিয়ে সোনার ঘড়িতে সময় দেখে নীরব। আরো তের মিনিট সময় আছে ট্রেনটি ছেড়ে দিতে। সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে একটা সিগারেট জ্বালায় এবং খুব সংক্ষিপ্ত সময়ে শেষ করে সিগারেটটি। যেখানে তার সিগারেট শেষ হতে কম করে আট মিনিট লাগে সেখানে আড়াই-তিন মিনিটেরও
কম সময়ে সিগারেটটি শেষ হয় এবং ট্রেনে ওঠার পর প্রচুর মানুষের মধ্যে সে একটি মানুষ হয় এবং বসার কোনো জায়গা নাই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাত্রা। সোনার ঘড়িতে সে সময় দেখে – আর দু’মিনিট পর ঘণ্টা বাজবে। প্যান্টের পকেটে ঘড়ি সমেত হাত ঢুকিয়ে সে পাশের লোকটিকে জিজ্ঞাসা করে – ‘আর কতক্ষণ পর ট্রেন ছাড়বে?’ লোকটি রাবারের ঘড়ি থেকে সময় বের করে এবং বলে – ‘তিন মিনিটের মধ্যে ট্রেন ছাড়বে।’ নীরব লোকটিকে আড়াল করে আবার ঘড়ি সমেত হাত বের করে এবং বিষণ্নভাবে হাত ঢুকায়।
সাড়ে তিনমিনিট পরে ঘণ্টা পড়ে এবং ট্রেনটি চলার জন্য চেতনা লাভ করে। হঠাৎ ঘুম থেকে জাগা পাখির মত ট্রেনটি এদিক ওদিক যেন একটু দেখে নিল এবং চলতে শুরু করল। তার ঘড়ি, লোকটির ঘড়ি আর ট্রেনওয়ালাদের ঘড়ির মধ্যে মিল নেই। জগতে কারো ঘড়ির সাথে কারো ঘড়ির মিল নেই। পাশের জনের ঘড়িতে একরকম বাজে, নিজেরটাতে বাজে অন্যরকম আর ট্রেনওয়ালাদের ঘড়িতে আরেক বাজে।
কিছুক্ষণের মধ্যে বাতাস ভাঙ্গা শব্দ শোনা গেল। বাতাস ভেঙ্গে গুঁড়ো গুঁড়ো করে গোঁয়ারের মত ছুটে চলছে ট্রেন। এখন বৃষ্টি হলে এসব বাতাসের গুঁড়োতে জল মিশলেই বাতাসের কাদা তৈরি হবে। নীরবের বাতাসের কাদায় পা চুবিয়ে হাঁটার ইচ্ছে জাগল। সব ইচ্ছেরই আলাদা আলাদা গতি আছে, স্বভাব আছে। এক ইচ্ছের ভেতর থাকতে থাকতে আরেকটা ইচ্ছে তৈরি হলে যে ইচ্ছের গতি বেশি তার দিকেই ধাবিত হয় মানুষ। যদিও সেখানে ইচ্ছে পূরণ হবার চেয়ে ইচ্ছে খুন হবার সম্ভাবনা বেশি। যে ইচ্ছের যত গতি সে ইচ্ছের খুন হবার গতি তার সমানুপাতিক। ট্রেন চলছে। ব্রেন চলছে নীরবে নীরবের। আজ রোববার – একথা তার স্মরণ আছে এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে সোনার ঘড়িতে কত বাজছে তা না দেখেই আন্দাজ করার চেষ্টা করে।
চার পুরুষ আগের এই সোনার ঘড়িতে চড়ে প্রচুর সময় পার হয়েছে কিন্তু ঘড়িটা চার পুরুষ আগের ধান আর ধন সম্পদ বয়ে আনতে পারেনি। চার পুরুষ পার করার পূর্বেই ওগুলো প্রায় ‘নাই’ হয়ে গেছে। কিন্তু এ ঘড়ি কিছু সম্পদ ঠিকই বয়ে এনেছে যেগুলো মূল্যহীন। যেসব সম্পদ বয়ে এনেছে সেগুলো হলো মনসম্পদ আর মানবোধসম্পদ। এগুলোও ক্ষয় হয়ে আসছে সাবানের মত। দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে। দামি সাবান যেমন দ্রুত ক্ষয় হয়। ট্রেন চলছে। ব্রেন চলছে নীরবের। নীরব খেয়াল করে দেখে কয়েকটি স্টেশন পার হবার পর কম্পার্টমেন্টটি বেশ ফাঁকা হয়ে গেছে এবং ইচ্ছে করলে সে বসতে পারে। ইচ্ছে করে। কিন্তু বসে না। গর্ব চাঁড়া দিয়ে ওঠে, সোনার ঘড়ি আর শান্ত’র জন্য।

সোনার ঘড়ি এবং শান্ত’র মত বন্ধু থাকলে পৃথিবীতে আর কিছু লাগে না। নীরব রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। এবং দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্তি ধরে গেলেও সে বসে না, যাতে শান্ত’র ভাবনায় বিন্দুমাত্র ছেদ না পড়ে। খুব চমৎকার করে কথা বলে শান্ত। নীরব মুগ্ধ হয়ে শোনে, প্রাণবাজী রেখে সমস্ত সময় ঢেলে দেয় শান্ত’র পায়ের কাছে।
জীবনকে ভালো বলে মনে হয় তার। ট্রেন চলছে। ব্রেন চলছে রবহীন নীরবের। শান্ত’র যেদিন প্রেমিকা হলো সেদিন নীরবের মন খারাপ হলো। কারণ সে ভাবতে পারছিল -‘শান্ত এবং নীরবের মধ্যে ভাল সম্পর্কটা থেকে শান্ত গড়িয়ে যাবে প্রেমিকার দিকে।’ তা, সেটা হলো এবং সে ব্যথা পেল নীরব। বেশিরভাগ সময় সে প্রেমিকার সাথে দেয়। নীরবের সাথে যে কথাগুলো হয় সেসব কথার গায়েও লেগে থাকে প্রেমিকাপ্রসঙ্গ। নীরবের বুক পুড়ে যেত, বুকের ভেতর বিকট ব্যথা কাঁটার মত সবসময় বিঁধে থাকত। তাদের মধ্যে যেসব কথা হত, কর্ম হত, মর্ম হত সেসব কথা-কর্ম-মর্ম প্রভুহীন কুকুরের মত মায়া মায়া চোখে দূরে বসে তার দিকে চেয়ে থাকে। ট্রেন চলছে। ব্রেন চলছে নীরবে। শান্ত’র চেষ্টায় একদিন প্রেমিকাদেবীর সাথে দেখা হলো নীরবের। সে মানিয়েও নিল – ‘হ্যাঁ ঠিক আছে, আমরা পৃথিবীতে তিন মানুষ থাকলাম এক প্রাণে। দাম্পত্য হতে পারে, ত্রাম্পত্য কি হতে পারে না।’ চমৎকার সময় কাটছে এখনো এই ভাবনা আসার পর। নীরবের বসতে ইচ্ছে করে না। সে বসল জানালার দিকের একটা সিটে যেদিকে ট্রেনের গতি তার দিকে পিছন ফিরে। ট্রেন চলছে। ব্রেন চলছে নীরবের। বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হলে শান্ত ফিরে গেছে গ্রামে, গতকাল। এখন, একদিন পরে নীরব পরিবারে ফিরে না গিয়ে শান্তকে সারপ্রাইজ দিতে যাচ্ছে শান্ত’র গ্রামে।
সে চমৎকার ভালবাসা অনুভব করল শান্ত’র জন্য। ‘শান্তও তার প্রতি ভালবাসা অনুভব করে’ ভেবে আনন্দবোধ করল। শান্ত নীরবের সোনার ঘড়িটা খুব পছন্দ করে। শান্ত মাঝে মাঝেই বলে – ‘নীরব তোর ঘড়িটা চমৎকার!’ শান্ত’র বাড়ি থেকে ফেরার সময় ঘড়িটা তাকে দিয়ে ফিরে আসবে, মনে মনে ভাবল নীরব। দুটো ট্রেন যখন মুখোমুখি হলো, মুখের সাথে মুখ মিলিয়ে দিল তখন কিছুলোক মারা গেল। নীরব সিট থেকে ছিটকে পড়ল এবং উঠে দাঁড়াল শান্তভাবে। চিৎকার চেঁচামেচির মধ্যেও সে ভালবোধ করল। সে কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে আর্তদের দেখল, কাউকে কাউকে সাহায্য করল বেঁচে ওঠার জন্য। কেউ কেউ বেঁচে উঠল না। কেউ কেউ বেঁচে ওঠার সময়ই পায়নি। কেউ কেউ বেঁচে ওঠার সময় পেল এবং পুলিশের বা স্থানীয়দের সাহায্যে হাসপাতালের দিকে গেল। সে নিজের অবস্থাটা বুঝে নেবার চেষ্টা করল। তার কিছু হয়নি, শুধু বুকে একটু ব্যথা করছে। শক্ত কোনো কিছুর সাথে ধাক্কা লেগেছে মনে হয়। ট্রেন চলছে না। ব্রেন চলছে নীরবের। সকাল হলে রেলকর্মিরা আসে। লাইনটা ক্লিয়ার করতে কি কি করতে হবে সেটা বোঝার জন্য তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। দাঁড়িয়ে দেখা শেষ হলে, দুর্ঘটনা কবলিত ট্রেন দুটো অনেকক্ষণ ধরে ঘুরে ঘুরে দেখে। ঘুরে দেখা শেষ হলে আবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে, কথা বলে। কথা বলা শেষ হলে আবার ট্রেন দুটি ঘুরে ঘুরে দেখে। আবার দাঁড়ায়। দুর্ঘটনা স্থলে নিহত বা আহত কোনো মানুষ আর নেই। শুধু একজায়গাতে রেললাইনের ঠিক মাঝখানে একটা পা রেললাইনের সমান্তরালে পড়ে আছে। পা আছে, মানুষ নাই। কার যে পা, সে বেঁচে আছে কি নাই কে জানে। সে হয়ত হাসপাতালে, সে হয়ত পাতালে। তার বুক ফুঁড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। আরো কিছুক্ষণ এগুলো নীরব দেখে। কিছু পরে সে
শুনতে পেল দেলভাঙ্গা স্টেশন বেশিদূর নয় – কিলো দেড়েক মাত্র, সেখান থেকে আবার ট্রেন পাওয়া যাবে। ট্রেনে চেপে আবার যাত্রা শুরু হলে সোনার ঘড়ি বের করে দেখে দুপুর পার হয়ে গেছে নির্দিষ্ট স্টেশনে নামতে। ট্রেন থেকে নেমে হাঁটা পথ। হাঁটতে হবে সোনালী ঘড়ির প্রায় দু’ঘন্টা এবং রাবারের ঘড়ির দু’ঘণ্টারও বেশি। এ পথে যান চলে না। নীরব চলে। ছোট ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে সে হাঁটছে বেশ খুশি মনে এবং রোমাঞ্চিত হচ্ছে, ক’ঘণ্টা পরেই শান্ত’র চমকিত চোখ আর অভিব্যক্তি দেখতে পাবে বলে।
প্রচণ্ড চণ্ডাল রোদ। দু’পাশে আখের ক্ষেত ছাড়া তেমন কোনো গাছ নেই, দু’একটা বাবলা গাছ ছাড়া। প্রচুর ক্লান্তি জমা হচ্ছে তার জুতার ভেতর আর পিঠের ব্যাগের ভেতর। মন বা শরীরকে সে ক্লান্তি অনুভব করতে দিতে চাচ্ছে না। হাঁটছে তো হাঁটছেই। অহেতুক ধরণের তীক্ষè রোদ পোশাক ফুটো করে গরম তেলের মত দেহের গেহে ঢুকছে আর ঘাম হয়ে বেরিয়ে আসছে। আখের ক্ষেত পার হলে পা দুটো গোঁয়ার হয়ে ওঠে কোরবানির খাসি-বকরির মত। সে মনে মনে বলল – ‘আমি কোরবানি করা দেখেছি। গলায় দড়ি বাঁধা গরু
ছাগল। দড়ি ধরে টেনে ছুরির কাছে নিয়ে আসার সময় সামনের দুটি পা মাটিতে গেঁথে দিয়ে স্থির হয়ে যায় সমগ্র শক্তি দিয়ে, যতই টান দিক না কেন মানুষ, সে নড়ে না, মাটি খুবলে যায়, পা দেবে যায়। কিন্তু কোরবানি আঁটকায় না। ছুরি চলে।’ তার পা দুটিকে কোরবানির পশু ভাবার জন্য সে তৈরি হয়ে গেল।
‘আর খুব বেশিদূর নয় সামান্য গেলে একটা ফাঁকা মাঠ, ফাঁকা মাঠ পার হলে মাইলটাক মাত্র’ নীরব গরুগাড়িওয়ালার কাছে এই বর্ণনা পাবার পর আবার হাঁটতে থাকে এবং ফাঁকা মাঠটির ওমাথা দেখতে না পেয়ে ভাবে – ‘এ মাঠ কোনোদিন পার হওয়া যাবে কি?’ মাঝে মাঝে দুএকটা খড় বা শস্য বোঝাই
গরুর গাড়ি চলছে। নীরব চলছে। পায়ে ফোস্কা পড়াতে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। জুতো খুলে সে হাতে ধরে
এবং এই মাঠের প্রচণ্ড রোদের ভেতরে ছায়াবৃক্ষ কল্পনা করে। কল্পনার এ ছায়াবৃক্ষ মুহূর্তেই পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। মাথার উপর গনগনে আগুন সূর্য। রোদের সমুদ্রে সে পড়ে গেছে। প্রচণ্ড তেষ্টাও পেয়েছে তার। এক ভাণ্ড পানি পেলে ভালো হত, প্রাণপশুকে ঠান্ডা করা যেত। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে কোথাও পানি আছে কিনা। আরো কিছুদূর যাবার পর একটা বড় ডোবার মত দেখতে পায়। নোংরা শ্যাওলা-পানা-কাদা ভর্তি। শ্যাওলা পানা সরিয়ে সে পানি পান করে। বুকের ভেতর একটু ঠাণ্ডা হয়। কাদা জলে ডুবে পা’পশু দুটোও একটু আরাম পায়। আবার হাঁটতে থাকে। নিজের ছায়ার উপর পা ফেলে হাঁটছে, ব্যাপারটা খেয়াল করে। কিছুদূর হাঁটার পর সে ছোট একটা গাছ দেখতে পায়। ছোট গাছটার গোড়া ঘেঁষে কপালের টিপের মত একটুকরো ছায়া অবহেলায় পড়ে আছে। মৃত ছায়া অথবা ছায়াটি নিজেই প্রচণ্ড রোদে পুড়ে ভুগছে। ছায়াটিরই ছায়া প্রয়োজন। তবুও ঐ গাছটির কাছে পৌঁছতে পারলে একটু ভাললাগবে ভেবে একটু জোরে হাঁটা দেয় এবং পা দুটো টনটন করে ওঠে। বুকের ব্যথাটা সে আবার অনুভব করে। ব্যথাটা বাড়ে। ব্যথা আরও বাড়ে। তার বুক আর বুকের ব্যথা তারই সাথে দুর্ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে। তখনের পান করা পানি এখনই বাষ্প হয়ে দেহ থেকে বেরিয়ে বাতাসে মিশে গেছে। তার পা আর প্রাণপশু তার সাথে খারাপ ব্যবহার করা শুরু করেছে। তবু তার মনমানুষ তার মনেরমানুষ শান্ত’র সাথে দেখা করতে পারবে ভেবে ক্লান্ত হয়নি। যে হাতে সোনার ঘড়ি আছে সে হাত দিয়ে বুকটা চেপে ধরে এবং গাছটিরকাছে গিয়ে পৌঁছায়। গাছের ছায়াটাকে শান্ত মনে করে। ছায়াটির মূমুর্ষ শরীরের উপরেই সে ধপ করে বসে পড়ে। পা দুটো কুকুরের মত হাঁপাতে থাকে। বুকটার ব্যথা দুগুন তিনগুন করে বাড়ে। একসময় সে দাঁড়িয়ে গিয়ে গাছটির
সাথে বুক চেপে ধরে আরাম পেতে চায়। ব্যথায় তার চোখ দিয়ে পানি বের হয়। একসময় দাঁড়ানো অবস্থা থেকে ধপ করে পড়ে যায়, ছায়া যেদিকে তার বিপরীত দিকে। তার গায়ের সাথে ছায়ার কোনো স্পর্শন থাকে না। সে ছায়ার কাছে যেতে পারে না। সে তার জ্বলে ওঠা প্রাণকে ঠাণ্ডা করার জন্য ছায়ার কাছে যাবার চেষ্টা করে। ছায়াটুকু পান করার জন্য তার প্রবল তৃষ্ণা জেগে ওঠে। সে ছায়ার কাছে যেতে পারছে না। ছায়ার কাছে যেতে না পেরে ছায়াটাকে নাক দিয়ে নিজের ভেতরে টেনে নেবার জন্য জোরে করে শ্বাস নেয়। বাতাসও বিপরীত শক্তি প্রয়োগ করে তার ভেতরে প্রবেশ না করার জন্য। ‘রোদে বাতাস পুড়ে গেছে, বুকের ব্যথার তাপে বাতাস পুড়ে গেছে’ সে চোখ বন্ধ করার সময় ফিসফিস করে উচ্চারণ করে।
একদিন পর গ্রামের মানুষেরা মানুষের পচা গন্ধ পেয়ে সেখানে আসে এবং আরো একদিন পর পুলিশ আসে। দূর দূরান্ত থেকে মানুষেরা আসে একটি লাশ দেখতে। দুর্গন্ধের কারণে নাক চেপে ধরে দূর থেকে মানুষ দেখে মৃত মানুষ। গন্ধে কাছে কেউ যেতে পারে না। দুএকজন যাবার চেষ্টা করেছে কিন্তু পারেনি, মরা মানুষের গন্ধ তাদের গলা ধাক্কা দিয়ে, চড় থাপ্পড় মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে। নাক চেপে রাখলেও কান
দিয়ে, চোখ দিয়ে, সারা শরীর দিয়ে মৃত মানুষের গন্ধ ঢুকে যায়। লাশটাকে কেউ চিনতে পারে না। পুলিশ এসে কেরোসিন ছিটিয়ে দিলে মানুষেরা অনেকটা স্বস্তি পায় এবং লাশের কাছে গিয়ে গাঁয়ের লোকে দেখে অপরিচিত মানুষের লাশ। পুলিশ সকলকে জিজ্ঞাসা করে – ‘কেউ চেনে কি না?’ কেউই বলে না –
‘চিনি’। ‘চিনি না এ কে’ – একে একে সবাই বলে। পুলিশ অফিসার বিরক্ত হয়ে বিড় বিড় করে – ‘মরার মানুষেরা কোথায় যে জন্মে, জন্মার পর কোথায় যে মরতে আসে, ঠিক ঠিকানা নাই!’ শান্তও এসেছিল দেখতে। নাক চেপে আছে সেও, কারণ, মরা মানুষের গন্ধ এবং কেরোসিনের গন্ধ, দুটো গন্ধই তার কাছে খারাপ লাগে। শান্ত সোনার ঘড়িটার দিকে তাকায় এবং চিনতে পারে নীরবকে। ‘আমি তাকে চিনি’ বলতে যাবার আগে মনে মনে বলল Ñ ‘যদি পুলিশি কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়।’ এটা মনে

হবার সাথে সাথে বুকের কাছে এবং দু’চোখে খোঁচা অনুভব করে। সোনার ঘড়ি থেকে কাঁটাগুলো হঠাৎ বিশাল বড় আর শক্ত হয়ে তার বুকে এবং চোখে খোঁচা দিয়েছে। সে চিৎকার দিয়ে চোখ আর বুক চেপে ধরে পড়ে যায়। তাকে পুলিশেরা ধরাধরি করে ওঠায় এবং জিজ্ঞেস করে, সে তাকে চিনে কি না। শান্ত
সোনার ঘড়িটার দিকে তাকায় এবং বলে – ‘আমি তাকে চিনি না’। এটা বলার সাথে সাথে চমকে আবার উল্টে পড়ে। কারণ, নীরব তখন উঠে দাঁড়িয়ে সোনার ঘড়িটা খুলে শান্ত’র হাতে পরিয়ে দেয় এবং পুলিশের লাশটানা ভ্যানে গিয়ে শুয়ে পড়ে। অনেক মানুষের ভীড় ঠেলে পুলিশেরা নীরবের লাশ নিয়ে চলে যায়। লাশটানা গাড়ি চলছে। নীরব চলছে না। দেখতে আসা লোকদের মধ্যে মায়ের কোলে থাকা একটা শিশুর নাকের উপর একটা ভীমরুল বসতে চাইলে সে চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠে এবং শিশুটির মা তার ছেলেকে আঁকড়ে ধরে বুকের সাথে। ভীমরুল চলে গেলে, স্ত্রীলোকটি তার সন্তানের দিকে তাকায় আর ভাবে – ‘শিশুটিকে জন্ম না দিলে আজ এই শিশুটিকে ভীমরুলের ভয় পেতে হতো না। এ ভীমরুল যে অন্যকোনোদিন একে কামড়াবে না এর নিশ্চয়তা কি? সাপে বা ট্রেনে বা বিমানে বা অন্যকোনো মানুষে কামড়াবে না এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। যে ছেলেটির লাশ পুলিশের ভ্যানে চড়ে গেল, সেই ছেলেটির বাবা মা তাকে জন্ম না দিলে এত দুঃখ ভোগ করতে হতো না। মেয়েটি কান্না চেপে রাখতে পারল না, নিজের বাচ্চাটিকে বুকে চেপে ধরে আঁচল দিয়ে চোখ মুছে। জগতের কার সাথে কার কিসের যে সম্পর্ক, কিসের যে বাধন তা কে জানে? অপরিচিত একটা নারী নীরবের অবস্থা দেখে কাঁদছে। দেখতে আসা মানুষের মধ্যে একজন সুন্দরী তরুণী ছিল। সুন্দরী তরুণীটি মনে মনে বলল – ‘লোকটি কিন্তু দেখতে দারুণ। লোকটি বেঁচে থাকলে তাকে প্রেমের ব্যাপারে বলা যেত। কিন্তু কি আর করা, মৃত মানুষ প্রেমিক হতে পারে না।’ সে বিষণ্ন হেসে হাঁটা ধরে তার বাড়ির দিকে। কে যে কার সাথে কেন মিশে, কেন মিশতে চায় কে জানে। দেখতে আসা লোকদের একজন শান্ত। শান্ত সোনার ঘড়ি হাতে দিয়ে বাড়ির দিকে শান্ত মেজাজে হেঁটে চলে গেল, আর মনে মনে তসবি চলছে – ‘যাক, বাঁচা গেল অযথা পুলিশের হাঙ্গামা থেকে।’ এরপর সে মরা নীরবের মুখের দিকে মুগ্ধ হয়ে থাকা, মরা নীরবের প্রায় প্রেমে পড়া রূপবতীর দিকে তাকিয়ে ভাবল Ñ ‘আমার প্রেমিকার চেয়ে এই মেয়েটি বেশি সুন্দরী, বিকেলের দিকে এসে খোঁজ নিতে হবে, মেয়েটি কে’।