দেশজুড়ে মহামারী বন্যার দায় কি শুধু প্রকৃতির?

আপডেট: জুলাই ১৫, ২০১৭, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

মো. আবদুল কুদ্দুস


সম্প্রতি সারা বাংলাদেশ জুড়ে চলছে বন্যার আধিপত্য। দেশের উত্তর ও উত্তর-পূবাঞ্চলের গ্রামাঞ্চলে অনেক মানুষের বাড়ি-ঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকের পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। খেতের ফসলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে সর্বনাশা বন্যার পানির প্রবল ¯্রােত। গ্রামের স্কুল-কলেজ পানিতে টুমটুম করে ভাসছে। শিক্ষার্থীরা অতি কষ্টে নিজের প্রবল ইচ্ছায় স্কুল কলেজে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের কেউ খালি পায়ে আবার কেউ একটি ছাতা মাথায় দিয়ে স্কুল ব্যাগে কিছু বই নিয়ে বাড়ি থেকে বের হচ্ছে। এদের মধ্যে এমন অনেকে আছে যাদের ছাতা কেনার সামর্থ্যটুকুও নেই। তারাও থেমে নেই। থেমে নেই খেটে খাওয়া মানুষেরও জীবন। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে বন্যা, বৃষ্টি, দুর্ভোগকে সঙ্গী করে নিজ নিজ কাজে ছুটে যাচ্ছে। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশ ও দেশের অর্থনীতিকে রেখেছে সচল।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক এই বন্যার আধিপত্য শুধু গ্রামেই নয়। শহরেও একটু বৃষ্টি হলেই জোয়ার-ভাটার মতো বন্যা আসছে এবং নেমে যাচ্ছে। বন্যার এই নাটকীয়তা দেখবার মতো। যারা কাজের প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বের হয়েছে এ বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা অনেক ভালো। বৃষ্টির কারণে শহরের পিচঢালা পথে সৃষ্টি হয়েছে বন্যা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এটি একটি মিনি সাগর/নদী। এর বুক ফেড়ে চলছে বড় বড় জাহাজ (বাস/ট্রাক)। কল্পিত জাহাজসদৃশ বাসটি যখন রাস্তা দিয়ে চলাচল করছে তখন পানির বিশালাকৃতির ঢেউ হেটে চলা পথচারিদের সমস্ত শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে। অন্যান্য ছোট ছোট গাড়িগুলো যেন একেকটি বোট। রাস্তায় ব্যক্তিগত যানবাহন  তেমন নেই। কেননা হাঁটু পানিতে গাড়ির ইঞ্জিন নষ্ট হবার আশঙ্কা রয়েছে। পাবলিক পরিবহন যারা চালু রেখেছে তারা বেশি করে ভাড়া হাঁকছে। যাত্রীদের আয়-রোজগারের শ্রেণিভেদ কেউ দেখার নেই। সামর্থ্যবানরা সেই চড়া দরের ভাড়া দিয়ে নিজ কর্মস্থলে যেতে পারলেও নি¤œ আয়ের মানুষ হেঁটে হেঁটেই অনেক কষ্টে কর্মস্থলে যাচ্ছেন। তবে রাস্তায় সরকারি কর্তাব্যক্তিদের গাড়ি দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে। কারণ ওই গাড়ির ইঞ্জিন নষ্ট হলে সরকার তা মেরামত করবে। শহরের একটু নিচু এলাকার মানুষের বাড়িতে রাখা গরু-ভেড়া-ছাগল পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। গ্রামের পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেলেও শহরের রাস্তার পাশে যে সমস্ত জায়গায় মাছের বাজার বসে, বৃষ্টির পানিতে তাদের অনেকের মাছ ভেসে গেছে।
এতক্ষণ তো শুধু দুর্ভোগের কথা বললাম। তবে এসব দুভোগের কারণ কি শুধুই প্রকৃতি? এতে মানুষের কোনো দায় নেই? আমার মনে হয় প্রকৃতির চেয়ে মানুষের দায় অনেক বেশি। প্রকৃতির নিয়মে পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। বন্যাও হয়ে আসছে। এর জন্য নিবারণমূলক ব্যবস্থা তো মানুষকেই করতে হবে। অস্বাভাবিক ব্যাপার হলে তা ভিন্ন। তবে যা নিবারণ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায় তার দায় মানুষকেই নিতে হবে। যেমন শহরাঞ্চলে সামান্য বৃষ্টিতে যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় তা সঠিক ড্রেনেজ ও সোয়ারেজ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। এর জন্য সরকারি পানি উন্নয়ন বোর্ড, সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভার পরিকল্পনা ও উন্নয়নের জন্য রয়েছে নানা সংস্থা। শহর ও নগর পরিকল্পনাবিদদের এবং সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞদের সাহায্য নিয়ে এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। সম্প্রতি জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন মোতাবেক এসডিজি-১১এ টেকসই নগর উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার মানের দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এতে বাংলাদেশ স্কোর পেয়েছে একশ এর মধ্যে মাত্র ১৪। সার্বিক স্কোরে পিছিয়ে বাংলাদেশ ১২০তম স্থানে অবস্থান করছে। যেখানে শ্রীলংকা, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার ও ভারতের অবস্থান যথাক্রমে ৮১, ৮৩, ১০৫, ১১০ ও ১১৬ তম স্থানে।
সুতরাং বাসযোগ্য দেশ বিনির্মাণে, গ্রাম ও শহর এলাকায় নদী দখল, খাল দখল বন্ধ করতে হবে। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ যাতে বন্ধ না হয় সেদিকে সবাইকে সচেতন হতে হবে। শুধু সরকার নয়, দেশের প্রতিটি মানুষকে সরকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। দখলদারদের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে গড়িমসিকারী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে বিশেষ আইন দরকার। সবুজ শ্যামল বাংলাদেশের বুক হতে সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মুছে যাক। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি মানুষের ঘরে পুনরায় নেমে আসুক অনাবিল শান্তি।
লেখক: শিক্ষক, বিজনেস স্টাডিজ বিভাগ ও সহকারী প্রক্টর, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী