দেশেই অ্যান্টিভেনাম তৈরিতে সম্ভাবনা সাপের কামড়ে মৃত্যুর হার নামবে তলানিতে, হবে রফতানিও

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২১, ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ

শাহিনুল আশিক:


কথায় আছে- ‘বিষে বিষ ক্ষয়’। বিষ দিয়ে বিষ ক্ষয়ের পথে হাঁটছেন বোরহান বিশ্বাস রোমন। তার এমন পরিকল্পনা অনেকটাই কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতো। কাঁটা তোলার মূল হাতিয়ার অ্যান্টিভেনাম তৈরি নিয়ে আশাবাদি রোমন। তার মতে সাপের কামড়ে আর একজন মানুষও যাতে না মারা যায়, সেই লক্ষ্যে অ্যান্টিভেনাম তৈরিতে কাজ করছেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে অ্যান্টিভেনাম তৈরি করা গেলে সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে। এতে সাপেকাটা রোগির মৃত্যুর হার শুন্যে কোঠায় নামানো সম্ভব হবে। এছাড়া দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানিও করা যাবে এই অ্যান্টিভেনাম।
রাজশাহীর পবা উপজেলার ধর্মহাটা গ্রামে অ্যান্টিভেনাম তৈরির লক্ষ্যে বোরহান গড়ে তুলেছেন ‘সাপ উদ্ধার ও সংরক্ষণ কেন্দ্র’। তিনি ২০০৯ সাল থেকে কয়েকজন কর্মী নিয়ে এই কাজ শুরু করেন। প্রথম দিকে সাপের ডিম থেকে বাচ্চাও ফোটাতেন বোরহান। পরে বিভিন্ন কারণে সেখান থেকে সরে এসে এখন অ্যান্টিভেনাম তৈরির লক্ষে গবেষণা চালাচ্ছে তার দল। তবে পবার ‘সাপ উদ্ধার ও সংরক্ষণ কেন্দ্র’র সাপগুলো গবেষণার জন্য চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয় বলে তারা জানান।
রামেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, সম্পূর্ণ আমদানির নির্ভর অ্যান্টিভেনাম দিয়ে চিকিৎসা চলে সাপেকাটা রোগিদের। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে অ্যান্টিভেনাম আমদানি করা হয়। সরকারিভাবে ছাড়াও দেশের ইনস্পেটাসহ কয়েকটি ওষুধ কোম্পানী এই অ্যান্টিভেনাম আমদানি করে থাকে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন- ভারত থেকে যে অ্যান্টিভেনাম আমদানি করা হয় সেটিকে ‘পলিভেনাম’। অর্থাৎ গোখরা, কেউটে, রাসেল ফাইপারসহ পাঁচটি বিষধর সাপের বিষ দিয়ে তৈরি। কয়েকটি সাপের বিষে তৈরি হওয়ায় এই অ্যান্টিভেনামটি দেশের রোগির শরীরে আস্তে আস্তে কাজ করে। কারণ পাঁচ ধরনের সাপ থেকে নির্দিষ্টমাত্রার বিষ দিয়ে তৈরি হয় এই পলিভেনাম।
একটি সূত্র বলছে, বিষধর সাপ সব দেশে রয়েছে। তবে একেক দেশে একেক নামে পরিচিত। দেশের আবহাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে বিষের টকসিন ভিন্ন মাত্রার হয়। ভারতে একটি রাসেল ভাইপার সাপের বিষের সাথে এদেশের রাসেল ভাইপারের বিষ এক হবে না। হয় টকসিনের মাত্রা বেশি, না হয় কম হবে। তবে সু-চিকিৎসার জন্য স্ব-স্ব দেশ বা অঞ্চলের সাপের বিষ দিয়ে তৈরি অ্যান্টিভেনাম দ্রুত কাজ করে রোগির শরীরে। সেই লক্ষ্যে ভারতে ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যে অ্যান্টিভেনাম তৈরির কথা ভাবছে সেই দেশের সরকার। তাতে হবে- দেশটির যে রাজ্যের সাপে কামড়ানো রোগি, সেই রাজ্যের সাপের বিষ থেকে তৈরি অ্যান্টিভেনাম নেবে। এতে অল্প ডোজেই কাজ হবে। কমবে রোগি মৃত্যুর হারও।
চিকিৎসকরা বলছেন- মূলত গোখরা (কোবরা) ও কেউটে (ক্রাইট) সাপের কামড়ে বেশিরভাগ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে কেউটে সাপ বাড়ির আশপাশে বা লাকড়ির (রান্নার খড়ি) মধ্যে থাকে। আর গোখরা সাপ ফসলি জমিতে ও রাস্তাঘাটে থাকে। গোখরা ও কেউটে সাপের বিষক্রিয়ায় পার্থক্য আছে। গোখরার কামড়ে পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো সমস্ত শরীর নিস্তেজ হয়ে যায়, চোখ বন্ধ হয়ে আসে। আর কেউটে সাপের কামড়ে শরীর নিস্তেজ হয়ে যায়। পাশাপাশি কামড়ের স্থান ও দাঁতের গোড়া থেকে রক্ত বের হয়। তবে বাংলাদেশে দুটি ক্ষেত্রেই একই ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
পবার সাপ উদ্ধার ও সংরক্ষণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, এখানে রয়েছে লেজার ব্ল্যাক রেইট, রাসেল ভাইপারসহ কয়েক প্রজাতির বিষধর সাপ। দুটি মৃত সাপকে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে গবেষণার জন্য। সম্প্রতি যোগ হয়ে বিরল রেড কোরাল কুকরি সাপটি। সেই সাপটির জখমের স্থানে সেলাই দিয়েছেন বোরহান ও তার সহকর্মীরা।
বোরহান জানিয়েছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রকল্পে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভেনম রিসার্চ ইনস্টিটিউট করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন কর্মকর্তা যিনি জার্মানির একজন শিক্ষক তিনি তার সম্পর্কে জানতেন। তিনিই রোমনকে ভেনম রিসার্চ ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষক হিসেবে নেয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন।
বোরহান আরও বলেন- সাপের অ্যান্টিভেনাম ভারত থেকে আসে। অ্যান্টিভেনাম দুই ধরনের আসে। একটি পলিভেলিন ও অপরটি মনভেলিন। তবে দেশে পলিভেলিন বেশি আসে। পলিভেলিন হচ্ছে কয়েকটি সাপের বিষ দিয়ে একটি অ্যান্টিভেনম তৈরি। আর মনভেলিন হচ্ছে- একটি মাত্র সাপের বিষ দিয়ে তৈরি অ্যান্টিভেনম।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ভারত থেকে আমদানি করা অ্যান্টিভেনামগুলো আমাদের দেশের মানুষের শরীরে আস্তে আস্তে কাজ করে। তবে বিকল্প উপায়ও নেই।
অনেক সময় রোগির শরীরে বেশি পরিমাণে অ্যান্টিভেনাম গেলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখে দেয়। কারণ অ্যান্টিভেনাম তো বিষ। একটি সাপের বিষ নষ্ট করতে পাঁচটি সাপের বিষ দিয়ে তৈরি অ্যান্টিভেনাম রোগির শরীরে দেওয়া হচ্ছে। তাই বিষের মাত্রাও বেশি। এই কারণে বেশি অ্যান্টিভেনাম নিলে শরীরে পাশ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তাই যে অঞ্চলের রোগি সেই অঞ্চলের সাপের বিষ থেকে তৈরি অ্যান্টিভেনাম দিলে দ্রুত কাজে লাগবে। এছাড়া সেই ধারণা থেকে দেশের প্রতিটি অঞ্চল থেকে দুটি করে গোখরা ধরা হচ্ছে। সেগুলোর বিষের টকসিন পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে দেখে গেছে- অঞ্চল ভেদে একই সাপের বিষের টকসিনের মাত্রা আলাদা আলাদা।
রোবহান আরও বলেন, আমাদের দেশে বেশির ভাগ সাপ দ্বারা আক্রান্ত হয়- গ্রামের মানুষ। তারা হাসপাতালগুলো থেকে অ্যান্টিভেনাম গ্রহণ করে থাকে। যদি হাসপাতালে অ্যান্টিভেনাম না পাওয়া যায় তাহলে বাইরে থেকে কিনতে হয়। এতে ১০ ভায়ালে ১ ডোজ অ্যান্টিভেনামের দাম পরে প্রায় ১০ হাজার টাকা। অনেক সময় দেখা যায়- একজন রোগিকে ৪ থেকে ৫ ডোজ অ্যান্টিভেনাম নিতে হয়। পুরোপুরি সুস্থ হতে। ফলে ব্যয় বহুল হয়ে পড়ে সাপে কাটা রোগির চিকিৎসা।
সব থেকে ভালো হয় দেশে অ্যান্টিভেনাম তৈরি করা গেলে। এতে করে দেশের সাপ থেকে তৈরি অ্যান্টিভেনাম, দেশের মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহার হবে। ফলে চিকিৎসার ক্ষেত্রে ১০ ভায়ালের এক ডোজেই সুস্থ হবে রোগি।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রাজশাহী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, বোরহান বিশ্বাস রোমন আমাদের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। যদিও এখনও পর্যন্ত রাজশাহীতে আমাদের একজনও সাপ ধরার এক্সপার্ট নেই।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজে (রামেক) হাসপাতালের উপপরিচালক সাইফুল ফেরদৌস জানান, গত বছর হাসপাতালে প্রায় ৩০০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়ায় দেরিতে হাসপাতালে আসায় ৩০ থেকে ৩৫ জন মারা গেছে।
তিনি আরও বলেন, ভারতের কেরেলা থেকে অ্যান্টিভেনাম আসে। আমাদের এই অঞ্চলে বেশি চার প্রকার সাপে কামড়ানো রোগি আসে। তবে সাপে কামড়ানো রোগির জন্য আইসিইউ ব্যবস্থা রয়েছে।