দেশের অর্থনীতি, ভাবমূর্তি ও বহির্বিশ্বে বাংলা ভাষা প্রসারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা

আপডেট: এপ্রিল ১২, ২০২১, ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সৈয়দ আলী ( অব.):


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
৩। ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে ইরাক তার পার্শ্ববর্তী দেশ কুয়েত দখল করলে সৌদি আরবের আহবানে কুয়েত পুনঃরুদ্ধারের জন্য আমেরিকাসহ ৩২ টি দেশ এতে অংশগ্রহণ করে। সেখানে প্রায় সব হাসপাতালে অন্ততঃ শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ ফিলিপিনো নার্স, অথচ এটা বাংলাদেশের পাবার সুযোগ ছিল। উপসাগরীয় যুদ্ধে যোগদানের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কুয়েতে পুনরুদ্ধারের সময় ইরাক কর্তৃক পুঁতে রাখা মাইন/ বিস্ফোরক দ্রব্য অপসারণের জন্য ইঞ্জিনিয়ার, চিকিৎসার মেডিক্যাল পেশার সেনা সদস্য, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তার জন্য পদাতিক বাহিনী সহ বিভিন্ন পেশার সেনা সদস্য ১৯৯১ সালের মাঝামাঝি উপসাগরীয় যুদ্ধে যোগদানকারী সেনা সদস্যগণ বাংলাদেশে ফেরত আসার পূর্বেই বাংলাদেশ হ’তে কুয়েতের চাহিদা মত বিভিন্ন পেশার সেনাসদস্য প্রেরণ শুরু করে বাংলাদেশ সরকার। আর এটা সম্ভব হয়েছিল উপসাগরীয় যুদ্ধে সেনাবাহিনীর অংশ গ্রহণের কারণে। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রথম জাতিসংঘে শান্তি মিশনে পর্যবেক্ষক হিসেবে অতি অল্পসংখ্যক সেনাসদস্য অংশ গ্রহণ করে। তবে উপসাগরীয় যুদ্ধে অংশগ্রহণের পর কুয়েত পুনর্গঠনসহ জাতিসংঘ শান্তি মিশনে যোগদান এদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। উপসাগরীয় যুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যোগদান ছিল একটি যুগান্তকারী, সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ। আর এরপর জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সেনাসদস্য বাড়তেই থাকে। ৩১ জানুয়ারি ২০২১ সাল পর্যন্ত মোট ১,৪১,৬০৫ (এক লক্ষ একচল্লিশ হাজার ছয়শত পাঁচ জন) সেনা সদস্য শান্তি মিশনে অংশ করার সুযোগ পেয়েছে। এ ছাড়া বিমান, নৌ এবং পুলিশ সদস্য ও রয়েছে। ১৬ কোটি জনসংখ্যার তুলনায় এটা অতি নগন্য হলেও এর ফল অত্যন্ত সুদূর প্রসারী। এ পর্যন্ত ১৩৬ জন সেনা সদস্য মৃত্যুবরণ ( উপ-সাগরীয় যুদ্ধ ছাড়া) ও ২২৮ জন আহত হয়েছেন (উপ-সাগরীয় যুদ্ধ ছাড়া)। উপ-সাগরীয় যুদ্ধে যোগদানকারী আহত/নিহত সেনা সদস্য ছাড়া জাতিসংঘ মিশনে নিহত ও আহত শান্তিরক্ষীগণ জাতিসংঘের প্রচলিত নীতিমালা অনুসারে এককালীন বরাদ্দ পেয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ। বাংলাদেশ এ পর্যন্ত পাঁচবার সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রেরণকারী দেশ হওয়ার সম্মান অর্জন করেছে। শুধু মাত্র জানুয়ারি ২০১৬ হ’তে ডিসেম্বর ২০২০ এই পাঁচ বছরে বাংলাদেশ মোট আয় করেছে ৮৩৯৯,৭৩,০৩,৪২৪.০০ ( আট হাজার তিনশত নিরানব্বই কোটি তিয়াত্তর লক্ষ তিন হাজার চার শত চব্বিশ) টাকা মাত্র। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের হিসেব অনুযায়ী ২০০১ হতে ২০১০ পর্যন্ত ইউএন (U N) শান্তিরক্ষী অপারেশনে নিয়োজিত সেনাদের বেতন, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য ক্ষতিপূরণ (COMPENSATION) বাবদ ১.২৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং ২০১২-২০১৩ সালে ৫৭২ মিলিয়ন ইউএস ডলার বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছে।
৪। এ ছাড়া জনসম্পদ রপ্তানি, গার্মেন্টস, ওষুধ রপ্তানিসহ আরও অনেক খাত আছে যার আয়ে আমাদের দেশের অর্থনীতি বেশ চাঙ্গা। করোনা আতঙ্কে বিশ্ব অর্থনীতিতে যথেষ্ট মন্দা থাকলেও আমাদের অবস্থা অনেক ভাল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বৈদেশিক যুদ্ধ ও বৈদেশিক শান্তি মিশনে থাকাকালীন কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে সেটা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তাদের উন্নয়নে অংশীদার ও আমাদের জনশক্তি ও টেকনোলজি রপ্তানি করে বা তার প্রভাব ফেলতে পারি কিনা সেটা ভেবে দেখার সময় এসেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ, ডিজিটাল যোগাযোগ যে কোনো ঘটনা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো অপরাধী ছাড়া পাচ্ছে না , আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও তড়িৎ ব্যবস্থা নিতে পারছে। বিশেষতঃ করোনা পরিস্থিতিতে নিভৃত পল্লিতে ও জরুরি খবর ও নির্দেশনা পৌঁছে গেছে বা যাচ্ছে। আর বাংলাদেশকে এ পর্যায়ে অধিষ্ঠিত করার রূপকার বর্তমানে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়। তাঁর জন্য বাংলাদেশ আজ গর্বিত। আফ্রিকার অনেক দেশ আছে যারা এ পর্যায়ে নেই- তাদেরও বাংলাদেশ সাহায্য করতে পারে।
দেশের ভাবমূর্তি সংরক্ষণ
বাংলাদেশ প্রায় তিন দশক ধরে এশিয়ার অন্য স্বল্প উন্নয়ন দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মত জাতিসংঘে সেনা বাহিনী মোতায়েন করে আসছে। সেপ্টেম্বর ২০২০-এ বর্তমান আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জো-বাইডেন জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীকে কিভাবে আরো শক্তিশালী করা যায় এ ব্যাপারে একটি সভা আহ্বান করেন। যেখানে বাংলদেশ সহনিমন্ত্রণণকারী (Co-host) হিসেবে উপস্থিত ছিল। বাংলাদেশ সেনাদল এত ভাল করছে যে, বাংলাদেশ অন্য দেশের সেনা সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীতে সেনা ও পুলিশ সদস্য সংখ্যা মোতায়েনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিশ্বনেতা।
বাংলাদেশ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইউএন (জাতিসংঘ) মিশন কে সেনাবাহিনী দ্বারা সাহায্য করে- (১) বৈশ্বিক/ বিশ্বব্যাপি দায়িত্ব (২) আঞ্চলিক প্রগতি এবং (৩) বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ।
বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে ইউএন-এর সক্রিয় সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৯০ এবং এরপরে জাতিসংঘ বাংলাদেশ সেনা বাহিনীকে প্রতিরোধ, ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অনেক দ্বন্দ্ব-বিবাদ সুরাহা করার জন্য মোতায়েন করা হয়েছে। শান্তি রক্ষার প্রয়োজনে ও বিশ্বস্ততার কারণে সেনা সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। আর বাংলাদেশ অত্যন্ত সফলতা দেখিয়েছে যার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যগণ শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানে অনন্য তা প্রমাণ করেছে বলেই বেশ কয়েকবার (৫ বার) জাতিসংঘে বাহিনীর সর্বোচ্চ সংখ্যার সেনাসদস্য প্রেরকের স্থান দখল করে। শুধু তাই নয়, আফ্রিকার একাধিক দেশে বাংলাদেশি জেনারেল ফোরস কমান্ডার (Force Commander), প্রধান সেনা পর্যবেক্ষক (Chief Military Observer) সহ অনেক গুরুত্ব পূর্ণ পদ লাভ করেছেন। বাংলাদেশ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক কার্যধারা (policy making) প্রণয়নে ও বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। আর এভাবেই বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানে জাতিসংঘের সাথে বাংলাদেশি সেনাসদস্য গণ তাদের পেশাদারিত্ব, দায়বদ্ধতা, নিরপেক্ষতা, সুশৃঙ্খল মনোভবের কারণে বাংলাদেশের সেনারা জাতিসংঘের ‘রোল মডেল’ হিসেবে পরিচিত।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ বাহিনীর যোগদান দেশের সম্মান বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক পরিম-লে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে ও তা অব্যাহত আছে।
বাংলা ভাষার সম্মান
১৯৪৭ এর ১৪ আগস্ট তৎকালীন পূর্ব বাংলা ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন হলেও পাকিস্তান নামের তথাকথিত ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে পতিত হয় এবং পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান নামে অভিহিত করা হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী প্রথমেই আঘাত হানে আমাদের মাতৃভাষা ‘বাংলা’র উপর। ১৯৪৮ সালেই তারা ঘোষণা দেয় যে, উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। ওই সময়ই ছাত্র সমাজ না না বলে প্রতিবাদ করে, আর তখন থেকেই বিভিন্ন পরিসরে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম চলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার ৮ ফাল্গুন, ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি। ওইদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে বেরিয়ে এলে তৎকালীন সরকারের পুলিশ বাহিনী তাদের ওপর গুলি চালায়। এতে আব্দুস সালাম, আবুল বরকত, রফিক, শফিক আবদুল জব্বারসহ কয়েকজন ভাষার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ঢাকাবাসী ঢাকা মেডিকেল হোস্টেলে সমবেত হয়। নানা নির্যাতন সত্ত্বেও ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানাতে পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুনরায় রাজপথে নেমে আসে। তারা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহিদদের জন্য অনুষ্ঠিত গায়েবি জানাজায় অংশগ্রহণ করে ।
(চলবে)