দেশের অর্থনীতি, ভাবমূর্তি ও বহির্বিশ্বে বাংলা ভাষা প্রসারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা

আপডেট: এপ্রিল ১৩, ২০২১, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সৈয়দ আলী ( অব.):


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ভাষা আন্দোলনে বাংলাদেশের অর্জন
১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন শুরু হলেও ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সালাম-বরকত-রফিক-শফিক-জব্বার ভাষা সৈনিকের আত্মত্যাগের মাধ্যমে এই দিনটি প্রতিষ্ঠিত হবার পরে অনেক অর্জন বাংলাদেশের জন্য। যেমন-
(ক) বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন
(খ) বাংলা ভাষা একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভাষা
(গ) বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে ২৯তম জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে প্রথম বাংলায় ভাষণ, বিশ্বের একপ্রান্ত হ’তে অন্য প্রান্তে ইথারে অনুরণিত হয়েছে। বিশ্বের প্রতিটি নেতাকে ইচ্ছা বা অনিচ্ছা সত্ত্বে ও এ ভাষা শুনতে হয়েছে।
(ঘ) EUNESCO কর্তৃক ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা প্রদান করেছে। বাঙালিরাই পৃথিবীর একমাত্র জাতি যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। তাই জাতি হিসেবে আমাদের ভাষার প্রতি অগাধ ভালোবাসার জন্য ইউনেস্কো ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। ২০০০ সাল থেকে প্রতি বছরই জাতিসংঘ সদস্যভুক্ত দেশগুলো ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে যথাযথ সম্মানের সাথে পালন করে আসছে। সালাম-বরকত-রফিক-শফিক-জব্বার সহ আরও কত নাম না-জানা শহিদদের আত্মত্যাগে বাঙালিরা ফিরে পায় তাদের প্রাণের ভাষা বাংলা।
(ঙ) সিয়েরা লিওনে বাংলাদেশের অর্জন : ১৯৫২ থেকে ২০০২ প্রায় ৫০ বছর পর এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে সিয়েরা লিওন-এ। ১৯৯১ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত এই দেশে জাতিগত খুনাখুনি নিরসনে জাতিসংঘ হিমশিম খাচ্ছে কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ডাক পড়ল বাংলাদেশের সেনাসদস্যদের। ওই দেশে জাতিসঙ্ঘ দলে সর্বাধিক সেনা সদস্য। দায়িত্ব বেশি বাংলার সৈনিকদের। তারা সেটা পালন ও করল। প্রায় ১১ বছরের সংঘাত মিটিয়ে ফেললো বাংলাদেশ। বাংলাদেশ শুধু জাতিসংঘের নির্দেশ ও বাংলার লালিত সংস্কৃতি ভালবাসা, সৌজন্যতাবোধ ও মানবতাবোধ দেখিয়েছে যা তাদের সংঘাত নিরসনে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। সিয়েরা লিওনও বাংলাদেশ সেনাদের খালিহাতে ফিরিয়ে দেয় নি। ওই দেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি আহমাদ তেজান কাব্বাহ বাংলাদেশের ভাষা ‘বাংলা’ কে তাদের দেশের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এখন ২০২১। প্রায় ১৯ বছরে আমরা ওই দেশে বাংলা ভাষাকে কতটুকু প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি ? ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ এই ১৯ বছরে বাংলা ভাষার চেতনায়, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা একটা দেশ পেয়ে অন্ততঃ ৬০ টি দেশের ৫-৭% বাসিন্দা বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারেন। অনেকই বলতে কম পারলেও ভালই বুঝেন, কোনো কাজ দিলে ঠিক ভাবেই করতে পারে। যে সব দেশে ৫-১০ বছর বাংলাদেশের সেনাদল থেকেছে সেখানেই এর প্রভাব পড়েছে।
ওই সব দেশে বাংলা চালু করতে হলে আমাদের অন্ততঃ শিশু শ্রেণি হতে এসএসসি পর্যন্ত সব কার্যক্রমে ওই দেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে কারিকুলাম তৈরি করে দেয়া যেতে পারে। এখানে, কৃষি, গার্মেন্টস, ঔষধ সরবরাহ- প্রয়োজনে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে কারখানা স্থাপন, মেডিক্যাল কলেজ, নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় চেষ্টা ও সহায়তা করা যায় কিনা- এ ব্যাপারে কাজ করার সময় এসেছে।
(চ) লাইবেরিয়া: এই দেশটিতে ১৪ বছর গৃহযুদ্ধের পর শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ১ অক্টোবর ২০০৩ সালে (UNMIL) ‘ইউনাইটেড নেশন্স মিশন ইন লাইবেরিয়া’ চালু হয়। এখানে বাংলাদেশের সেনা সদস্যগণ ১১ বছর থাকার প্রাক্কালে লাইবেরিয়ানদের নিকট বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থা বেড়েছে। তাদের রাস্তা- ঘাট মেরামত, নূতন রাস্তা তৈরি , চিকিৎসক ও বাংলাদেশের স্টাফগণ রাত দিন তাদের সেবায় নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও কিছু সাধারণ রোগের চিকিৎসা প্রদানের শিক্ষা, রোগিদের রক্তচাপসহ রোগিদের কিছু মৌলিক বিষয় সম্বন্ধে শিক্ষা প্রদান, রোগিদের জন্য ক্লিনিক স্থাপন ও তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা বাংলাদেশ সেনাসদস্যদের রুটিনের মধ্যে ছিল। সপ্তাহে ১ দিন বাংলাদেশের চিকিৎসা সেনা সদস্যদের আস্তানা (CAMP)-এর বাইরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হ’ত। এ সব কর্মকান্ডে সহায়তা করত লাইবেরিয়ান যুবক যুবতীরা। তাদের অনেক স্থানীয় নেতা আসতেন এবং বলতেন বাংলাদেশ কত উন্নত। ১৬ কোটি লোকের খাবার উৎপাদন করে, এতবড় সেনাবাহিনী সংরক্ষণ করে অথচ আমরা চল্লিশ লাখ লোকের খাদ্য যোগাড় করতে পারি না। কৃষি, স্বাস্থ্য, পোশাক শিল্প প্রভৃতিতে তাদের বেশ আগ্রহ আছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার উদ্যোগ নিলে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসবে- যা হ’তে বাংলাদেশ প্রছুর জনশক্তি রপ্তানি করতে ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে।
২। আফ্রিকার যে সব দেশে বাংলাদেশের সেনাসদস্য ৫-১০ বছর মোতায়েন ছিল বা আছে সে সব দেশের সরকার প্রধানের সঙ্গে নি¤œ লিখিত বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করা যেতে পারে ।
ক। দূতাবাস /কন্সুলার অফিস স্থাপন
খ। দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি
গ। কৃষি উৎপাদনে সহায়তা
ঘ। গার্মেন্টস কারখানা স্থাপনে সহায়তা
ঙ । ঔষধ রপ্তানি/ ঔষধ শিল্প স্থাপন
চ। বাংলাদেশ কর্তৃক মেডিক্যাল কলেজ ,নার্সিং কলেজ ও প্যারা প্যারামেডিকস প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে পরিচালনা করে বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি/ প্রশিক্ষণ প্রদান ইত্যাদি
ছ। বিভিন্ন ক্লিনিক /হাসপাতাল স্থাপন করে তাদের সুচিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা করা।
জ। উপরোক্ত বিষয়গুলি পর্যালোচনা করে কিভাবে বাংলাদেশের প্রয়োজনে কাজে লাগানো যায় সে ব্যাপারে বিভিন্ন কমিটি গঠনপূর্বক প্রতিবেদন জমা দেয়া ও সুপারিশ সমূহ বাস্তবায়ন করা।
ইতোমধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থায় এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এখন বাংলাদেশে আফ্রিকার অনেক দেশের ছাত্র বাংলাদেশে আসছে। এদের অন্তত এক বছর বাধ্যতামূলক বাংলাভাষা কোর্স চালু করা ও তাদের মাধ্যমে তাদের দেশে কিছুটা বাংলা ভাষা চালু করা যায় কিনা এ ব্যাপারে বিভিন্ন বেসরকারি/ সরকারি বিস্ববিদ্যালয় গুলোর সঙ্গে আলাপ করা। বিভিন্ন দেশের ছাত্রদের বিভিন্ন বিষয়ে/বাংলা সহ শিক্ষা বৃত্তি প্রদান করলে বেশ সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
বাংলাদেশ জনসংখ্যায় বিশ্বে ৮ম, বাংলা ভাষায় কথা বলে এমন সংখ্যা বিশ্বে পঞ্চম। বাংলাদেশ চেষ্টা করলে জাতিসংঘের অন্যতম ভাষা বাংলাও হতে পারে। কারণ জাতিসংঘের ‘মান্ডেট’ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় যান প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। জাতিসংঘে বাংলা ভাষা চালু করতে কয়েক মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। পদ্মাসেতু আমাদের নিজ অর্থে যখন সম্পন্ন করা হচ্ছে, বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের ভাষা করতে যে খরচ হবে তার যোগান ও বাংলাদেশ পারবে বলে আমরা আশা করি। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাভাষা জাতিসংঘের অন্যতম ভাষা হবে আর বিশ্বের অনেক দেশের অনেক মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলবে এটায় আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: গবেষক, বিইউপি (বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস)

sayedali1044@gmail.com