দেশের অর্থনীতি, ভাবমূর্তি ও বহির্বিশ্বে বাংলা ভাষা প্রসারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা

আপডেট: এপ্রিল ১১, ২০২১, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সৈয়দ আলী ( অব.):


আমরা ক’দিন আগে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনকবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ১০১ তম জন্ম বার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করলাম। এর এক মাস আগে ২১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়ে গেল। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে ১৯৪৭ সালে তথাকথিত মুসলিম ভূখ- নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়, যেটা আবার দু’অংশে বিভক্ত। একটা পূর্ব এবং আরেকটি পশ্চিম পাকিস্তান- যাদের দূরত্বও ১০০০ মাইল। উভয় অংশের কালচার, কৃষ্টি এমনকি ভাষাও আলাদা অথচ একই রাষ্ট্র। এ যেন আরেক ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। সুতরাং যা হবার তাই হ’ল। ১৯৪৮ সালের প্রারম্ভে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী বললেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা অথচ বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। তদানন্তিন পূর্ব পাকিস্তানের তুখোড় ছাত্রনেতা শেখ মুজিবর রহমানসহ অনেক ছাত্রনেতা না না বলে গর্জে উঠেছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী আন্দোলন থামানোর নামে ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণ করলে ঝরে যায় কয়েকটি তাজা প্রাণ। এ দিন থেকেই পালিত হচ্ছে মহান শহিদ দিবস যা ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার। এরই ধারাবাহিকতায় পূর্ব বাংলার যুক্তফ্রন্ট, পাকিস্তানের সেনা শাসন এবং ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাধিকার আন্দলনের রূপরেখা ছয় দফা পেশ। শেখ মুজিবুর রহমানসহ তিনজন সেনা সদস্য, কিছু আমলা ও রাজনীতিবিদ সমন্বয়ে ৩৫ জনকে আসামী করে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয়। ছাত্র আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা তুলে নিতে এবং ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুসহ সকলকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। আজকের সোহরাওয়ারর্দী উদ্যানে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে তৎকালীন ছাত্র নেতা বর্তমানে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও প্রাক্তন মন্ত্রী জনাব তোফায়েল আহম্মদ, শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দানের ঘোষণা দেন। আর তখন থেকেই তিনি হলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিরুর রহমানের দল আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও পাকিস্তান সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে নিরস্ত্র বাঙালির উপর অতর্কিত হামলা ও গণহত্যা শুরু করে। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন। সাধারণ জনগণের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন তৎকালীন বাঙালি সেনাবাহিনী, বিমান, নৌ, ইপিআর সহ সকল সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীতে চাকরিরত বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) অবস্থিত সকলেই। তার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে আপামর জনসাধারণ। দেশ স্বাধীন হ’ল। শূন্য থেকে শুরু হ’ল বাংলাদেশের যাত্রা, হাল ধরলেন বঙ্গবন্ধু। নূতন করে সেনাবাহিনী গড়লেন। ১৯৭৫-এ কিছু কুচক্রি রাজনীতিবিদ ও কিছু বিপথগামী উচ্চাভিলাষী সেনাসদস্য বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের (শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছাড়া) প্রায় সকল সদস্যকে হত্যা করে। ঘটনাক্রমে জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ওই সময় বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। এ পটপরিবর্তনের পর দেশ কয়েক ধাপ পিছিয়ে পড়ে। জেনারেল জিয়াউর রহমান ৩০ মে ১৯৮১ সালে কিছু সেনা সদস্যের হাতে নিহত হলে কিছুদিন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে লে. জেনারেল এএইচএম এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। তিনি সেনাবাহিনীকে উন্নত করার চেষ্টা করেন। তার সময়ে ১৯৮৮ সালে প্রথম জাতিসংঘ বাহিনীতে বাংলাদেশি সেনা সদস্য সুযোগ পায় এবং ১৯৯০ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধে ২৩০০ এর উর্ধে সেনা সদস্য প্রেরণ করেন। এর পর জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশি সেনা সদস্য যেতে শুরু করে যা আজও অব্যাহত আছে। কিন্তু এরশাদ সরকার পূর্ণ গণতান্ত্রিক না থাকায় গণআন্দোলনের চাপে তাকে ১৯৯১ সালে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। ১৯৯১ সালে সাধারণ নির্বাচনে মরহুম জেনারেল জিয়াউরের দল- বিএনপি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় এবং তার সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া সরকার গঠন করেন। সেনা শাসন ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর শাসনের পর বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ২৬ বছর ক্ষমতা থেকে দূরে থাকার পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ওয়াজেদ সাধারন নির্বাচনে সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেন। দেশের হাল ধরলেন শেখ হাসিনা। আধুনিক সেনাবাহিনী গঠনের উদ্দেশ্যে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন- এনডিসি (ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ), এমআইএসটি ( মিলিটারি ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলোজি), এএফএমসি (আর্মড ফোরসেস মেডিক্যাল কলেজ) ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করেন। মাঝে এক মেয়াদ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থাকার পর পুনরায় ২০০৮ সাল হ’তে অদ্যাবধি (২০২১) ক্ষমতায় থাকায়Ñ এই দীর্ঘ সময়ে সেনাবাহিনীকে এমন পর্যায়ে নেয়া হয়েছে যে, এই সেনাবাহিনী এখন বিশ্ব শান্তির অগ্রদূত এবং চালকার আসনে অধিষ্ঠিত ।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন (অর্থনৈতিক)ঃ
১। বাংলাদেশ এখন হেনরি কিসিঞ্জারের তলাবিহীন ঝুড়ি নয়, বরং উদ্বৃত্তের দেশ না হলেও অভাবের দেশ নয়। আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই খাদ্যের জন্য ১৯৭৩-৭৪ সালে আমেরিকা কর্তৃক সৃষ্ট কৃত্রিম খাদ্য সংকট তৈরি করে আমাদের দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দেয়া হয়। আমেরিকা খাদ্য জাহাজ পাঠিয়েও চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের অসম ও স্বাধীনতা খর্ব করতে পারে এমন চুক্তি বা প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায়। বঙ্গবন্ধুর সেই বাংলাদেশ আজ ঘুরে দাঁড়িয়েছে তারই সুযোগ্য কন্যা বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ এর বিচক্ষণ রাষ্ট্র পরিচালনায়।
২। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু মুসলিম প্রধান দেশ সমূহ বিশেষতঃ লিবিয়ায় সেনাবাহিনীর সদস্য ( বিশেষতঃ ডাক্তার) সহ অন্য পেশার সদস্যদের পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। কিন্তু ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৮ সালে সৌদি আরব কয়েক হাজার ডাক্তার, নার্স সহ অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মীদের চাহিদা প্রেরণ করলে তদানীন্তন সরকার তা নাকচ করে দেয়। পরে ওই নিয়োগকারী সংস্থা ফিলিপাইনে গিয়ে তাদের চাহিদা মত বিভিন্ন পেশায় লোক নিয়োগ করে। ফিলিপাইন সৌদি আরবে এক দুর্ভেদ্য দুর্গ গড়ে তুলে। আর এটা টের পাওয়া যায় যখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দু’হাজার তিন শতাধিক বিভিন্ন পেশার সেনা সদস্য ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন সরকার প্রধান (রাষ্ট্রপতি) হুসেন মুহাম্মদ এরশাদ এর সিদ্ধান্তে উপসাগরীয় যুদ্ধে যোগদান করে।
(চলবে)