দেশের জঙ্গিবাদ আদৌ নির্মূল হবে কি?

আপডেট: মার্চ ২৯, ২০১৭, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন


গত ২৩ মার্চ সিলেট মহানগরীর শিবাড়ী এলাকার আতিয়ার ভবনটি ঘিরে ফেলে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। ২৪ মার্চ পুলিশের স্পেশাল বাহিনী সোয়াট ঘটনাস্থলে যায় তারপর ২৫ মার্চ সেনা বাহিনীর সেনা পৌঁছে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো দল। দেশের বেশ কয়েক রকমের নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথতায় শুরু হয় অপারেশন টোয়াইলাটরে অপারেশন। অভিযানের প্রথম দিনেই দুই জঙ্গি এবং দুই জন পুলিশ সদস্যসহ ছয় জন নিহত আর ৪৪ জন আহত হয়। এই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান শেষ হয় গত ২৭ মার্চ। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আতিয়ার ভবনটি দখলে নিয়েছে। চারটি মৃতদেহ উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী। এই অভিযানে সেনাবাহিনীর সাথে জঙ্গিদের সাথে পাল্টাপাল্টি গুলি বিনিময় হয়। সেনাবাহিনীর প্যারা ট্রূপাররা চার দিন রীতিমত যুদ্ধ করেই জঙ্গিদের পরাস্ত করে। তবে  নিরাপত্তা বাহিনী ধারণা করছে আতিয়ার ভবনটি বারুদের ঠাসা রয়েছে। যে কোন সময় বড় ধরনের বিস্ফারণের আশংকা করছে অভিযানরত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। আতিয়ার ভবনটি কি একদিনে জঙ্গিদের বিশাল আস্তানায় পরিণত হলো তা কিন্তু নয়। তাই দেশে এ রকম আরো কত জঙ্গি আস্তানা রয়েছে তা কে জানে।
এর আগে স্বল্প সময়ের ব্যাবধানে ঘটে গেল তিনটি ঘটনা। এ সকল  ঘটনায় প্রমাণ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সুপ্ত অগ্নিগিরির ন্যায় জঙ্গিগোষ্ঠি লুকায়িত আছে। যেমন মৌনী পাহাড় নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে দেখে বুঝার উপায় নেই যে, তার ভিতর উত্তপ্ত লালা রয়েছে। আর যখন এই নিশ্চুপ পাহাড়গুলো ফুঁসে উঠে তখন হয়ে যায় অগ্নিগিরি। সিলেটের আতিয়ার ভবন, চট্টগ্রামের সীতাকু-ের জঙ্গি আস্তানা, আশকোনা, খিলখেতের র‌্যাবের অফিসের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো প্রমাণ করে মৌনী পাহাড়েরর মতো সর্বত্র জঙ্গিরা বিরাজমান। জঙ্গিরা যে নিশ্চুপ থেকে দলে ভারী হচ্ছে তার প্রমাণ মেলে বিগত সময়ের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে। জঙ্গিরা  ঘটনাগুলো ঘটানোর পর আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো বার বার বলছে দেশের অভ্যন্তরে আইএসের অস্তিত্ব নাই। তারপর কেন এই ঘটনাগুলি অব্যাহত রয়েছে। তাহলে কি দেশের অভ্যন্তরে নতুন কোন জঙ্গির উৎপত্তি হচ্ছে? জঙ্গিসম্পর্কিত বিভিন্ন মহলের কাছ থেকে যে ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তা কতটা সঠিক এ নিয়ে প্রশ্ন করাটা অবান্তর কিছু নয়।  সঠিক নয় এই কারণে যে,  প্রতিটি ঘটনার পর যে বক্তব্য শুনা যায় তাতে মনে হয় এধরনের ঘটনা আর ঘটবে না। কিন্তু দেখা যায়, কয়েকদিন যেতে না যেতেই  পুনরাবৃত্তি ঘটে আরেকটি জঙ্গি ঘটনার। বাংলাদেশে জঙ্গির উত্থান কীভাবে, কখন হয়েছিল তা নিয়ে রয়েছে নানা ধরনের বিতর্ক। তবে এই বিতর্কের মাধ্যমে দেশের রাজনৈদিক দলগুলো নিজেদের জনসমর্থন বাড়াতে উঠে-পড়ে লেগে যায়। উদোর পি-ি বুদোর ঘাড়ে চাপানোর মতো বক্তব্য দিতে ব্যস্ত হয়ে যান দেশের রাজনীতিবিদরা। রাজনৈতিক নেতারা নানা কৌশলে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে যুক্তি উপস্থাপন করে প্রমাণ করতে চান তারা নির্দোষ। এটা তাদের প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর কাজ বলে নিজ দলের পবিত্রতা আনেন জনসম্মুখে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও উদ্দেশ্যের নিরীখে যদি জঙ্গিসম্পর্কিত রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য বিবেচনায় নেয়া হয়, তাহলে এদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কতটা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন তা নিয়ে সন্দেহ  থেকেই যায়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয়টি যদি রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রতিটি রাজনৈতিক দল লালন করেন তাহলে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কোন স্থান নাই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে এদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি স্থান করে নিয়েছে। আর সেই সময় থেকে সাম্প্রদায়িকতা বা রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করার  বিষয়টি নিয়ে কেউ কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না।  বরং রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারটা কে কত বেশি করতে পারছে তার প্রতিযোগিতা  দিন দিন বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মসসূচির অনুশীলনে দেখা যাচ্ছে যে, রাজনীতি করে জনগণের কাছে পৌঁছানোর একমাত্র হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার। দেশের অনেক জঙ্গি সংগঠন সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ধর্মীয় বিষয়গুলিকে আদর্শ-উদেশ্য করে কর্মসূচি গ্রহণ করার মাধ্যমে  জঙ্গি সংগঠনগুলি এদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজের আত্মপ্রকাশ ঘটায়। যে সমস্ত সংগঠন জঙ্গি কর্মকা-ের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছে তারাও অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ন্যায় রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করেছে। দেশের সকল জঙ্গিগোষ্ঠিই সংগঠিত হয়েছে রাজনৈতিকভাবে ধর্মকে ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে। এখন বিভিন্ন নামীয় জঙ্গি সংগঠন নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। কিন্তু রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হচ্ছে না। ফলে এই জঙ্গি সংগঠনগুলোর কর্মীরা ধর্মভিত্তিক অন্য দলে নির্দ্বিধায় আশ্রয় নিতে পারছে। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর আঁচলের নীচে আশ্রয় নিয়ে নিজেদের লক্ষ-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কাজ  করে যাচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদের তথ্য থেকে দেখা যায়, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর কর্মীরা কোন না কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসাবে ইতোমধ্যেই নাম লিখিয়ে ফেলেছে। আর ওই রাজনৈতিক দলের সাইন বোর্ড ব্যবহার করে নিজেদের লক্ষ-উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার কাজে লিপ্ত। তাই এই বর্ণচোরা জঙ্গিদের সনাক্ত করতে আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা ব্যর্থ আর সুপ্ত অগ্নিগিরির ন্যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠছে জঙ্গি আস্তানা।  ফলে জঙ্গি তৎপরতা নির্মুল না হয়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপে তা রপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইস বুক মুক্তবুদ্ধি চর্চার একটি ক্ষেত্র হিসাবে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ফেইস বুকের কিছু বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এখানে একটু ভিন্ন কৌশলে সম্প্রদায়িকতা অনুশীলন করা হয়। ফেইস বুকের কিছু কিছু পোস্ট সুনিপুনভাবে দেশকে সাম্প্রদায়িকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
জঙ্গি ঘটনা ঘটার পর বা সাম্প্রদায়িক কোন সহিংসতা হয়ে গেলে দেখা যায়, দেশ জুড়ে মানববন্ধন সমাবেশে অনুষ্ঠিত হয়। এ রকম কর্মসূচি থেকে বুঝা যায় যে, অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় বাংলাদেশের প্রতিটি প্রতিশীল নাগরিকেরই। সেই লক্ষে দেশজুড়ে সভা সেমিনার হয়। অসাম্প্রদায়িক চেতনার উপন্যাস, কবিতা, রম্যরচনা, গল্প ,প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে প্রিন্ট গণমাধ্যমে। ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়ার টক শো গুলোতে বুদ্বিজীবীরা সরব হয়ে উঠেন। তাছাড়া অসম্প্রদায়িক চেতনার সমাজ গড়তে ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমগুলিও নাটক প্রমাণ্যচিত্র সহ নানা অনুষ্ঠান প্রচার করে আসছে। অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের জন্য গণসচেতনা সৃষ্টি করার লক্ষে গড়ে উঠছে নানা সামাজিক সংগঠন। কিন্তু এত কিছুর পরেও বাস্তবতায় দেখা যায়, সাম্প্রদায়িকতা জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে। তার কারণ কী ? ইংরেজিতে বলে  ৎড়ড়ঃ পধঁংবং তা বের করার চেষ্টা কি কেউ করেছেন নাকি না জেনেও তা নিবারিত করার কোন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না?
আজকে যে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে তার নেপথ্য শক্তিটি কী ? এই প্রশ্ন করা হলে স্বাভাবিক উত্তর আসবে এটা স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির কাজ। ৩০ লক্ষ প্রাণ আর দুই লক্ষ্য নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন দেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জঙ্গি লালনের মতো সাহস পায় কী করে? যে সকল রাজনৈতিক দলের প্রশ্রয়ে স্বাধীনতাবিরোধীরা অবস্থান করছেন তা চিহ্নিত করাটা কি খুবই দুরহ কাজ? এদের মুখোশটি উন্মোচন করা জরুরি। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চা হয়েছে। তবে আজকের দিনের মতো জঙ্গি আস্তানা গড়ে উঠতে পারেনি। সেই সময়টায় উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছিল সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চর্চার ক্ষেত্র তৈরিতে কিন্তু তখন তারা জঙ্গি বানানোর মত কিছু করতে পারেনি। এই বিষয়টি নিয়ে নানা মতামত অনেকেই দিবেন। অনেকেই বলবেন সেই সময় আর্ন্তজাতিক পরিম-ল ভিন্ন ছিল। তাছাড়া আইএস ছিল না, যার কারণে জঙ্গিবাদ দানা বাঁধতে পারে নি। এ রকম নানা রকম কথা আসাটা স্বাভাবিক। তবে এটা বিবেচনায় নেয়া উচিত যে, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি যে দেশের মানুষের অধিকার আনতে পারেনি তা বুঝতে বাকি ছিল না এদেশের সাধারণ মানুষের। ভাষা আন্দোলনের শহিদের আত্মদান এদেশের সাধারণ মানুষকে গড়ে তুলে বাঙালি সংস্কৃতির বলয়ের অসাম্প্রদায়িকতায়। ১৯৬৬ সালের বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ছয় দফা এদেশের মানুষের মুক্তির সনদ হিসাবে পরিগণিত হয়। সারা দেশে ধর্ম-বর্ণ ভুলে সকলে হয়ে উঠে বাঙালি। বিশেষ করে সেই সময়ের মধ্যবিত্ত এবং নি¤œবিত্ত মানুষের রাজনীতির চর্চার ক্ষেত্রটা ছিল অসাম্প্রদায়িকতার। তাই উচ্চবিত্তের সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি এদেশের সাধারণ মানুষের ধারে কাছে আসতে পারেনি। তাছাড়া ওই সময়ের পাকিস্তানি শ্রাসক শ্রেণিকে বিতাড়িত করার জন্য আন্দোলনরত রাজনৈতিক দলগুলির নেতাকর্মীরা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কর্মসূচি অনুশীলনের মধ্য দিয়ে জনগণনর আস্থা লাভ করেছিল। আওয়ামী লীগসহ স্বাধীনতার স্বপক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচিটা ছিল অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার। দেশের সাধারণ মানুষ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সাম্যের শোষণমুক্ত, গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ কিন্তু  দুর্ভাগ্য স্বাধীনতা প্রাপ্তির মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এদেশের রাজনীতির অঙ্গনে বীজরোপণ করে তা আজ ডালপালা গজিয়ে বিশালতা পেয়েছে। আর এই বিশালতার ডালপালা আঁকড়ে ধরেই চলছে ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই। বেশ কিছু সংগঠনকে জঙ্গিবাদের তৎপরতার দায়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কিন্তু তাদের আদর্শিকতা মানে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার কিন্তু অব্যাহত রয়েছে। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করতে না পারলে দেশে সুপ্ত অগ্নিগিরির ন্যায় জঙ্গি কর্মকা- রোধ করা সম্ভব না। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো নানা কায়দায় যেভাবে ধর্মকে ব্যবহার করছে যার ফলে আদৌ কি সাম্প্রদায়িকতা রোধ  সম্ভব হবে?  আর সাম্প্রদায়িকতা রোধ করতে না পারলে জঙ্গি তৎপরতা নির্মূল করা সম্ভব হবে না।
লেখক:- কলামিস্ট