দেশের ভিত্তিমূলে আঘাতের অপতৎপরতা প্রতিহত করতে হবে

আপডেট: আগস্ট ২২, ২০১৭, ১:৩১ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


দেশের ভিত্তিমূলে আঘাতের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তে রঞ্জিত বাংলাদেশ আজ নানা কূটতর্কের ভেতরে জাতীয় দুর্যোগ-সংকট পর্যবেক্ষণ করছে। বিজয় অর্জনের পর থেকেই এই তর্কের সূচনা করে পরাজিত সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। করে জাতিকে বিভ্রান্ত। যে চেতনা আর আদর্শের সোপানে সমগ জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাকিস্তনি হানাদার বাহিনিকে পরাভূত করে দেশের ভূ-খ-ের সীমানা নির্ধারণ করেছিলো, আজকে সেই দেশের অস্তিত্ব নিয়ে শুরু হয়েছে টানাহেঁচড়া। দেশের আদালত পর্যন্ত সে তর্কে জড়িয়ে গেছে। কিন্তু কারা সঠিক তা নির্ধারণ কি করবেন সর্বোচ্চ আদালত করবেন না জনগণ? আর সেখানেই যতো প্রতিযোগিতার ক্ষতচিহ্ন দেশবাসী পর্যবেক্ষণ করছে। এমনটি অগ্রহণযোগ্য এবং কিছুতেই প্রত্যাশিত নয়। একটি দেশের নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ আর প্রজাতন্ত্রের অপরাপর কর্মকর্তার শুভ চিন্তা ও কাজই পারে দেশবাসীকে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছে দিতে। যদি এই তিনটি শাসন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় না থাকে তাহলে জাতির আশা-আকাক্সক্ষাও ধূলিসাৎ হয়ে যায়। বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের জনগণ বিরোধী সামরিকতন্ত্রের আজ্ঞাবহ বিচার বিভাগে পরিণত হতে যাচ্ছে? হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এ জন্যে যে, স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় জাতির জনককে সপরিবার খুন করে যে সামরিক দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি তেইশ বছর লড়াই-সংগ্রাম করেছিলো, গণ-বিরোধী সেই সামরিক শাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়। চলে পাকিস্তানি কায়দায় উৎপীড়ন, দুঃশাসন আর জাতির গৌরবময় অর্জন বিরোধী যতো দুষ্কর্ম। চলে দেশ বিরোধী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির পুনর্বাসন, ধর্মান্ধতার চাষ। সর্বোচ্চ আদালত থেকে দেয়া একটি রায় নিয়ে প্রধান বিচারপতি বনাম সাবেক প্রধান বিচারপতির মধ্যে ভিন্নমত জাতিকে বিভ্রান্ত করছে। প্রশ্ন উঠেছে, বিচারপতিরা কি সংসদের চেয়ে বেশি স্বাধীন ও শক্তিধর? তাদের কোনো দায়বদ্ধতা এবং জবাবদিহিতা নেই? থাকলে কার কাছে? রাষ্ট্রপতি, বিচারপতি, সংসদ সদস্যরা কি সংবিধানের রক্ষক নন? হলে তারা কি স্বাধীন? দেশবাসীর প্রত্যক্ষ ভোটে যারা নির্বাচিত হন, তাদের থেকেও কি বিচারপতিরা বেশি শক্তিধর? বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারপতিদের অবস্থান কোন্ স্তরে? রাষ্ট্রপতিকে সংসদ যদি কোনো বিচারপতির অন্যায়-অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, তাহলে রাষ্ট্রপতি কি সংসদের সিদ্ধান্তের বিপরীতে অবস্থান নিতে পারবেন? এ রকম হাজারো জিজ্ঞাসা, দ্বিধা এবং দ্বন্দ্ব দেশবাসীর মধ্যে আজকে অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। এই জটিলতার সুস্থ মীমাংসা জাতি প্রত্যাশা করে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে সে দেশের সুপ্রিমকোর্ট অসৎ-অযোগ্য আখ্যায়িত করে বরাখাস্ত করেছেন। তিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। পাকিস্তানের সংবিধানে এ ব্যাপারে কি ধরনের ব্যাখ্যা দেয়া আছে আমাদের জানা নেই। তবে সাদা চোখে যা মনে হয়েছে, তা হচ্ছে, কোনো দেশ যদি ‘গণ-প্রজাতন্ত্র’ হয়, তাহলে দেশের সরকার, সিভিল ও বিচার বিভাগ জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। জনগণকে তারা প্রতিদিনের কাজের জবাব দিতে বাধ্য। জনগণই পারে সব কিছুর পরিবর্তন করতে। কে এবং কোন্ দল রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, তা নির্ধারণ করে জনগণ, কোনো বিশেষ বিভাগ বা শক্তিধর নন। তাহলে দেশের সুস্থ ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে যদি কোনো সরকার জনগণের উন্নয়ন ও কল্যাণে আইন প্রণয়ন করেন এবং তা সংবিধান সম্মত হয়, তাহলে তার মীমাংসা জনগণই করবে। বিচার বিভাগের কাছে উক্ত আইনের বিরুদ্ধে কেউ ব্যাখ্যা নিতে আগ্রহী হন, তাহলে বিচার বিভাগকে সংবিধানের আলোকে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। একেই বলে জবাবদিহিতা। সম্প্রতি  ষোড়শ সংশোধনীর ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের আবেদনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যে কট্যুক্তি করেছেন, তা জাতিকে হাতাশ করেছে। এমনটি বিচারক কি বলতে পারেন? এখন সে প্রশ্নই সামনে এসেছে। দেশের অ্যার্টনি জেনারেল এই রায়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি রায়টি পুনঃবিবেচনা করতে হবে। এটা সংবিধান বিরোধী। বিএনপি এবং কিছু বাম প্রগতিশীল হিসেবে দাবিদারেরা এতে আনন্দ প্রকাশ করেছে। রায়ে বলা হয়েছে, ‘বিচারক অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে নয়।’ তাহলে কার হাতে? এই রায়ে যারা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন, তারা বলেছেন, ‘এই রায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার রক্ষাকবচ’। তাদের ব্যাখ্যা হচ্ছে, ‘ক্ষমতার পৃথকীকরণের যে নীতি সংবিধান ধারণ করে অর্থাৎ রাষ্ট্রের তিন অঙ্গ নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের কেউ কারও ওপর সরাসরি কর্তৃত্ব করতে পারবে না। ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সে নীতি লঙ্ঘিত হচ্ছিল।’ অপরপক্ষে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক বলেছেন, ‘আপিল বিভাগের রায় অপরিপক্ক।’ তিনি আরো বলেন, ‘সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে জুজুর ভয় দেখানো হচ্ছে এবং সঙসদ সদস্যদের হেয় করা হয়েছে।’ সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন,‘আপিল বিভাগের এই রায় অপরিপক্ক, পূর্বপরিকল্পিত ও অগণতান্ত্রিক। ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে মূল বিষয়কে এড়িয়ে অযাচিত অনেক বিষয় টেনে আনা হয়েছে। এ রায়ে সংবিধানের অপব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ফিরিয়ে আনতে হলে আবারও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংবিধানে যেহেতু সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ছিল না, সেহেতু এটা রাখা সংবিধান পরিপন্থী।’ বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক আরো বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি কি প্রধান শিক্ষক আর অন্য বিচারপতিরা ছাত্র নাকি যে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে মাধ্যমে প্রধান বিচারপতিকে অন্য বিচারপতিদের পরিচালনা করতে হবে?’ বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৪ (৪) অনুচ্ছেদ অনুসারে বিচারপতিরা স্বাধীন। এই রায় ‘প্রজাতন্ত্রিক কন্সেপ্টকে উপেক্ষা করে দেশকে বিচারিক প্রজাতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।’ সাবেক এই প্রধান বিচারপতি সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেছেন, ‘যেখানে দুদককে চিঠি দিয়ে সাবেক এক বিচারপতির দুর্নীতির তদন্ত বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়, সেখানে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সদস্য বিচারপতিদের ওপর নির্ভর করবে কীভাবে? সংসদ সদস্যরা ভুল করলে সুপ্রিম কোর্ট দেখে সংশোধন করবেন। সেখানে বিচারপতিরা ভুল করলে আমরা যাব কোথায়?’ এই রায়ে ‘বিচারবিভাগ ও আইনবিভাগের মতবিরোধ বাড়বে। এমন কি জাতীয় সংসদও ঝুঁকিতে পড়বে।’ দেশের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক চিন্তার অনেকেই বলেছেন, ‘রাজনৈতিক প্রশ্ন আদালত কর্তৃক বিচার্য বিষয় হতে পারে না।’ আইনমন্ত্রী প্রধান বিচারপতির ‘অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যের এক্সপাঞ্জ চায় সরকার’ বলে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছেন।
রায়ের পর আইনমন্ত্রী এবং অ্যার্টনি জেনারেলের বক্তব্যের বিরোধিতা করে বিএনপি পন্থি আইনজীবীরা সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। তারা বলেছেন, আইনমন্ত্রী এবং অ্যার্টনি জেনারেলের বক্তব্য ‘দুঃখজনক ও আপত্তিকর’। ওই সংবাদ সম্মেলনে ‘বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক কোড অব কন্ডাক্ট ভঙ্গ করেছেন, তাই তাকে অপসারণ করে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে বিএনপি’র নেতৃবৃন্দ। তারা বর্তমান প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের সীমাবদ্ধতার কথাও আবার স্বীকার করে বলেছেন, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে তার বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে। কোড অব কন্ডাক্ট আছে।’ অর্থাৎ কি এই যে, প্রধান বিচারপতি রায় ঘোষণায় যে সব অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়, না কি? অর্থাৎ এক মুখেই আদা আর রসুন দুটোই বিএনপি নেতৃবৃন্দ খাচ্ছেন। তারা যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়, তাহলে কি করবেন? বিচারকদের ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ ভঙ্গ করলে কী করতেন? নিশ্চয়ই তারা সংবিধানের রক্ষক বলে তাকে সুদৃষ্টিতে দেখতেন না। যেমন দেখেননি তাদেরই নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে। তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিলো। ১৪ দলীয় সরকার সেটুকু মেনে নিয়েই বিচার বিভাগ এবং বিচারকদের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেছেন। এমন কি নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করতেও বর্তমান সরকার ক্রমাগত সামনে এগোচ্ছে। কেউ মনে রাখেননি বোধ হয়, এটা আর পাকিস্তান নয়, স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি প্রজাতন্ত্র। সামরিক বাহিনি এখানে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অতন্ত্র প্রহরী। উন্নয়নের সহায়ক শক্তি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত রাখার লক্ষ্যে প্রণোদনা দানকারী। পাকিস্তানের মতো তাদের নির্দেশে কিংবা পরামর্শে দেশ পরিচালিত হয় না। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের পরার্মশও জনসাধানের উন্নয়নে ভূমিকা পালন করে। কিন্তু পাকিস্তান ব্যর্থ একটি রাষ্ট্র। সেখানে ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িকরা পর্যন্ত রাজনীতিক দল গঠনের সুযোগ পায়। মুম্বাই হামলায় জড়িত সন্দেভাজন ‘লস্কর-ই তৈয়বা’র মতো একটি ধর্মোন্মাদরা রাজনীতিক দল গঠন করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতায় করার সুযোগ পাচ্ছে। সেখানে বিচার বিভাগ সংবিধানের পক্ষে কতোটা সহায়ক সে দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন জনগণই ভালো জানেন। তবে বিশ্ববাসী তাদের দেশের বিচার বিভাগের এতো ক্ষতাকে গণবিরোধী হিসেবেই দেখছে। বাংলাদেশ সে পর্যায়ে পৌঁছলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ বিপন্ন হবে। তাই দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরো বিকশিত করতে হলে এমন আত্মঘাতি কাজ থেকে বিচার বিভাগকে এবং নির্বাহী বিভাগকে সহায়ক শক্তি হিসেবেই দেশবাসী দেখতে চায়। না হলে বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা গড়া’র স্বপ্ন ব্যর্থ হবে। শোকের মাসে জাতি সে প্রত্যাশায় দেশ পরিচালিত হোক এমনটাই প্রত্যশা করে।