দেশে আসার আগেই পাচার হচ্ছে রেমিটেন্স

আপডেট: আগস্ট ৪, ২০১৭, ১:৩০ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের পাঠানো কষ্টার্জিত রেমিটেন্সের একটা অংশ দেশে ঢুকতে পারছে না। এর আগেই বেশ কয়েকটি দেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে সেই অর্থ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে এমন তথ্য।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রেমিটেন্স পাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বাংলাদেশের নাগরিকরাই। মালয়েশিয়া, কানাডা, সিঙ্গাপুরসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশে পাচারকারীরা বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক নেতারাও রেমিটেন্স পাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। তাদের অনেকে এক দেশ থেকে রেমিটেন্সের টাকা সংগ্রহের পর বিনিয়োগ করছেন আরেক দেশের বিভিন্ন খাতে।’
অব্যাহতভাবে প্রবাসী আয় নিম্নমুখী হওয়ার কারণ অনুসন্ধান ও প্রবাসী আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে করণীয় সম্পর্কে সুপারিশমালা সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তি বর্তমানে বিদেশে পরিবারসহ বাস করছেন। তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহসহ ক্ষেত্রবিশেষে বিদেশে তাদের সম্পদ বা ব্যবসা-বাণিজ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন বা চাহিদা তৈরি হয়েছে। এই চাহিদা তারা পূরণ করছেন হুন্ডিওয়ালাদের মাধ্যমে ও প্রবাসী আয় সংগ্রহ করে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনিন আহমেদ মনে করেন, প্রবাসী আয়ের একটি বড় অংশ দেশে না এসে চলে যাচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে টাকা নিয়ে বিদেশে বিনিয়োগ করায় যেহেতু নানা বিধিনিষেধ আছে, তাই শোনা যাচ্ছে, বাংলাদেশের অনেক বিনিয়োগকারী প্রবাসী আয় সংগ্রহের মাধ্যমে বিদেশেই তহবিল সংগ্রহ করছেন।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র বলছে, এরই মধ্যে বিদেশে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতিও পেয়েছে সাত প্রতিষ্ঠান। এর বাইরে অবৈধভাবে অনেকেই বিভিন্ন দেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের বাসিন্দারা ফ্ল্যাট কেনাবেচা করছেন প্রবাসীদের রেমিটেন্স সংগ্রহ করে। এছাড়া ওই দেশের হোটেল, রেস্টুরেন্ট এমনকি পরিবহন খাতেও বিনিয়োগ হচ্ছে প্রবাসীদের রেমিটেন্সের অর্থে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মহাব্যবস্থাপক দেব প্রসাদ দেবনাথ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যারা রেমিটেন্সের অর্থ অন্য দেশে নিয়ে যাচ্ছেন, তারা একভাবে দেশের ক্ষতি করছে। এটাও এক ধরনের হুন্ডি।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান সিস্টেমের দুর্বলতার কারণে হুন্ডি বেড়ে যাচ্ছে। আমরা সেই দুর্বলতাগুলো নিয়ে কাজ করেছি।’
এর আগে, বাংলাদেশ ব্যাংকের দু’টি প্রতিনিধিদল গত মার্চে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবে গিয়েছিল। প্রতিনিধি দল সেখানে হুন্ডির প্রভাব দেখে এসেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওইসব দেশে হুন্ডি তৎপরতায় ব্যবহার হচ্ছে হোয়াটস্যাপ, মেসেঞ্জার, ভাইবারসহ বিভিন্ন ধরনের অ্যাপস। এছাড়া, ডাটাবেজ শেয়ারিং-এর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে গুগল স্প্রেডশিট।
জানা গেছে, হুন্ডিওয়ালারা প্রথমে প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশিদের কাছ থেকে রেমিটেন্স সংগ্রহ করেন। এক্ষেত্রে তারা মুদ্রা বিনিময়ের জন্য প্রবাসীদের ব্যাংক রেটের চেয়ে তুলনামূলক বেশি দর দেন। আর বেশি রেট পাওয়ায় প্রবাসীরাও ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স না পাঠিয়ে হুন্ডিচক্রের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। পরে হুন্ডিচক্র ওই রেমিট্যান্স দেশে না পাঠিয়ে দেশে থাকা এজেন্টদের মাধ্যমে সমপরিমাণ টাকা সুবিধাভোগীদের পরিশোধ করে দিচ্ছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হুন্ডিচক্রের কাছ থেকে এ ধরনের ব্যক্তি (রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও অপরাধী) সহজেই অর্থ সংগ্রহ করে থাকেন। ফলে হুন্ডিওয়ালারা আগের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি হারে প্রবাসের আয় সংগ্রহ করছেন, ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় কমিয়ে দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশ থেকে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিকাশ বা রকেটের মাধ্যমে দেশে অর্থ বিতরণের জন্য হুন্ডিওয়ালারা সাধারণত ব্যক্তিভিত্তিক সফটওয়্যার বা অ্যাপস (হোয়াটস অ্যাপ, ভাইবার, মেসেঞ্জার ইত্যাদি) ব্যবহার করেন। এই সফটওয়্যারগুলোর সরবরাহকারীরা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন খ্যাতনামা সফটওয়্যার ডেভেলপার কোম্পানি। ধারণা করা হয়, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্ভার থেকেই বিকাশ বা রকেট লেনদেনের ইন্টিগ্রেশন ও সেটেলমেন্টের কাজটি পরিচালিত হয়।
এছাড়া, মোবাইলভিত্তিক অর্থ সেবার ব্যাপক বিস্তারের ফলে নতুনভাবে যেসব বাংলাদেশি বিদেশে যাচ্ছেন, তারা যাওয়ার সময় সুবিধাভোগীর বিকাশ নম্বর নিয়ে যাচ্ছেন। পরে ওই নম্বরেই নিয়মিত টাকা পাঠাচ্ছেন, যা বৈধ চ্যানেলে যুক্ত হচ্ছে না।-বাংলা ট্রিবিউন