দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন II হারার আগেই জাপা প্রার্থীরা হেরেছেন!

আপডেট: জানুয়ারি ১৫, ২০২৪, ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ


নিজস্ব প্রতিবেদক:


রাজশাহীর ছয়টি আসন থেকে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা। নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি। জাপা প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা ও জনসংযোগের প্রতি তেমন আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়নি। নির্বাচনে হারার আগেই জাপা প্রার্থীরা হার মেনে নিয়েছিল। এর ফলে জাতীয় পার্টি রাজনৈতিক দল হিসেবে ক্রমেই জনসমর্থন হারাচ্ছে কলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।

রাজশাহীর একটি আসনে নিজ দলের প্রতি অভিযোগ তুলে শেষ মুহূর্তে এসে সরে যান এক প্রার্থী। তবে বাকি পাঁচটি আসনে নির্বাচনে থাকলে ভরাডুবি হয়েছে প্রার্থীদের। হারিয়েছেন জামানতও। তবুও অনেক প্রার্থী আশায় ছিলেন রাজশাহী থেকে কেউ একজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন। ভোটের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কোনো প্রার্থী চার অংক পেরুতে পারেননি।

রাজশাহী-১ আসনে ভোট করেছিলেন শামসুদ্দীন, রাজশাহী-২ থেকে সাইফুল ইসলাম স্বপন, রাজশাহী-৩ থেকে আবদুস সালাম খান, রাজশাহী-৪ থেকে আবু তালেব প্রামাণিক, রাজশাহী-৫ আবুল হোসেন, রাজশাহী-৬ থেকে শামসুদ্দিন রিন্টু।

এর মধ্যে রাজশাহী জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক প্রচারণার শেষ সময়ে এসে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তিনি আওয়ামী লীগ মনোনিত প্রার্থী শাহরিয়ার আলমকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থনও জানিয়েছিলেন। শামসুদ্দিন তার নির্বাচনি এলাকায় একটি পোস্টারও টানাননি। নির্বাচনি কোনো প্রচারেও ছিলেন না।

নির্বাচনে প্রার্থী দিলেও প্রচার-প্রচারণা কিংবা ভোটার আকৃষ্ট করার মতো কোনো কার্যক্রমই ছিলো না তাদের। দু’একটি কেন্দ্র ছাড়া বাকি ভোট কেন্দ্রে কোনো এজেন্টও ছিলো না। এমন কী অনেক ভোটার জানতেই পারেন নি জাতীয় পার্টির কোন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনি মাঠে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের দেখাও যায়নি। এই যখন বাস্তবতা, তখন মাঠের চিত্রও জাতীয় পার্টির জন্য ভরাডুবি ছিল শুধুই অপেক্ষার। রাজশাহীর ছয়টি আসনেই জামানত হারিয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা। একজন ছাড়া অন্য প্রার্থীদের ভোট ২ হাজারের নিচেই ছিলো।

রাজশাহী জেলা প্রশাসন ও রিটার্নিং কর্মকর্তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা লাঙ্গল প্রতীকে ভোট করেছেন। রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে জাতীয় পার্টির মনোনিত প্রার্থী শামসুদ্দিন পেয়েছেন ৯৩৮ ভোট, রাজশাহী-২ (সদর) আসনে সাইফুল ইসলাম স্বপন ১ হাজার ৮১৬ টি, রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনুপর) আসনে আব্দুস সালাম খান ৫ হাজার ২৭৪ টি, রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে আবু তালেব প্রামাণিক ১ হাজার ৫১৮ টি, রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে সাবেক এমপি অধ্যাপক আবুল হোসেন ১ হাজার ৫৩১ টি এবং রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনে শামসুজ্জামান রিন্টু ৮৯৮ টি ভোট পেয়েছেন। অন্যান্য স্বতন্ত্রপ্রার্থীদের চেয়েও জাতীয় পার্টির ভোটের হার কম।

রাজশাহী-৬ আসনের প্রার্থী শামসুদ্দিন রিন্টু বলেন, নির্বাচনে অংশ নেয়া হলে কেন্দ্রীয় কমিটি জানিয়েছিল খরচ দেয়া হবে। কেন্দ্র থেকে এক টাকাও দেয়া হয়নি। আর কর্মীরা আমার পক্ষ থেকে সরে যাচ্ছিল। নির্বাচন একটা উৎসব। কর্মীরা কেন এই উৎসব থেকে বঞ্চিত হবেন। তাই তারা বিভিন্ন প্রার্থীর হয়ে কাজ করেছেন।

জাতীয় পার্টির নেতারা বলছেন, কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি আসনে আমাদের জয়লাভ করার কথা। দলের চেয়ারম্যান যে কয়টি আসন চেয়েছিলেন এর মধ্যে রাজশাহী-৫ আসনটি ছিল। আমরাও সে আসনের জয় চেয়েছিলাম। এজন্য সব আসনেই প্রার্থী ছিল। কিন্তু সেখানেও আমাদের ভরাডুবি হয়েছে।

তথ্য বলছে, বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতা গ্রহণের পরে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় সকল কিছু কুক্ষিগত করে ওই বছরের ৭ মে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৩টি আসন নিয়ে সরকার গঠন করেছিলো দলটি। এরপর দুই বছরের মধ্যে ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ভোট বর্জন করলে জাতীয় পার্টি ‘ওয়াকওভার’ পায় এবং ২৫১টি আসন নিয়ে তারা দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে।

কিন্তু এরপর থেকে জাতীয় পার্টির আসন পাওয়ার সংখ্যা তলানিতে ঠেকে। ১৯৯১ সালে ৩৫টি, ১৯৯৬ সালে ৩২টি, ২০০১ সালে ১৪টি, ২০০৮ সালে ২৭টি, ২০১৪ সালে ৩৪টি, ২০১৮ সালে ২২ টি আর সদ্য সমাপ্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি পেয়েছে মাত্র ১১টি আসন। নির্বাচনের মাঠে থাকলেও তারা সরকারি দলের উপর ভর করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া বিজয়ী হতে চেয়েছিল। আর এতেই ভরাডুবি দলটির।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় পার্টি মনোনিত প্রার্থীদের মধ্যে শামসুদ্দিন ও শামসুজ্জামান রিন্টু নতুন মুখ। রাজশাহী-২ (সদর) আসনে মনোনয়ন পাওয়া সাইফুল ইসলাম স্বপন গত সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর আগেও তিনি ন্যাশনাল পিপলস পার্টির হয়ে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে আম প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন। রাজশাহী-৫ আসনের প্রার্থী আবুল হোসেন অতীতে একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আর আবু তালেব ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে ভোট করেছিলেন।

জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস-চেয়ারম্যান রাজশাহী মহানগরের আহ্বায়ক ও রাজশাহী-২ (সদর) এমপি প্রার্থী সাইফুল ইসলাম স্বপন বলেন, এই ভরাডুবি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে হয়েছে। আমাদেরকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচন করতে হয়েছে। ২০১৮ সালে সংসদে আমাদের ২২ জন ছিলেন। এরমধ্যে অন্তত ১৫ জন, যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই এমপি হয়েছেন। আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়ায় এমপি হতে চেয়েছিলেন। একারণেই পাতানো নির্বাচনে অংশ নেয়া। দলের চেয়ারম্যান এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না চাইলেও এই ১৫ জন বাধ্য করেছে। একারণেই মানুষ আস্থা রাখে নি। তবে অচিরেই এই সংকট কেটে গিয়ে আলো আসবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

জাতীয় পার্টির জন্য বিপর্যয় বলে মনে করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তারেক নূর। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধীর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাদের নেতৃত্বেও অনেক দুর্বলতা ছিল। প্রার্থীদের অবস্থানও সুবিধাজনক ছিল না। তাদের প্রার্থী বাছাইয়েও ভুল ছিল। একারণে দলের প্রার্থীদের বিপর্যয় হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মূলত এই দলটির বিপর্যয় হয়েছে তিনটি কারণে। কেন্দ্র থেকে জেলা পর্যায়ে ছিল নেতৃত্বের দুর্বলতা। প্রার্থীদের অবস্থান সঠিক ছিল না। তারা ভোটারদের সাথে আগে যোগাযোগ করিনি। যারা প্রার্থী হয়েছিলেন তাদের নিবিড় যোগাযোগ থাকা লাগতো। এই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষে অনেকে কাজ করেছেন। আবার কেউ কেউ নৌকা প্রতীকেও কাজ করেছেন। এ কারণে দলটির এই অবস্থা হয়ে গেছে। সামনে যদি কাটিয়ে আসতে পারে তাহলে ভালো কিছু হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Exit mobile version