দ্বিজেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর মহাকাব্য ‘অজ্ঞাতবাস’, কাব্যের মহীরুহ

আপডেট: নভেম্বর ১২, ২০২১, ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ

দুলাল আব্দুল্লাহ:


প্রতিভা সমান্তরাল তবে তার উৎকর্ষতা আসমান। ব্যক্তি বিশেষে তার প্রতিফলন ভিন্ন হয়ে থাকে। কিছু প্রতিভাবান মেধা তার অনুশীলন আবর্তে নিজেকে শাণিত করে বলেই সে প্রতিভা মর্যাদা পায় অমরত্বের। ছোট থেকে বড় হওয়ার সারল্য অনুধ্যানের বিপরীতে অনেক ঘটনা থাকে যাকে অতি বড় হতে সহায়তা করে। সহায়তা মহান কিছু তৈরি করতে। একটু একটু করেই প্রতিভার বিকাশ হয়। আর যারা লেখেন তারা হয়ে উঠেন লেখক। একটু একটু করে বেড়ে ওঠা প্রতিভা এক সময় পরিণত হয়ে তার আলোক গায়ে লাগাতে থাকে কবিতার প্রেমাবিষ্ট ধারা। কবিতার গ্রন্থ বা কাব্য থেকে এক সময় তা হয়ে ওঠে মহাকাব্য। মহাকাব্য হলো দীর্ঘ ও বিস্তৃত কবিতারই রূপ বিশেষ। সাধারণত দেশ কিংবা সংস্কৃতির বীরত্ব গাঁথা ও ঘটনাক্রমের বিস্তর বিবরণ এতে মহাকাব্যে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধার হয়। আর তারই অনবদ্য প্রচেষ্টা করেছেন জাতীয় শ্রেষ্ঠ শিক্ষক পদক প্রাপ্ত কবি দ্বিজেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী। রাজশাহীর বীণাপাণি বুক ডিপো প্রকাশন থেকে এ বছর জুলাইয়ে বেরিয়েছে তাঁর মহাকাব্য ‘অজ্ঞাতবাস’। বর্তমান আধুনিক কাব্যভাবধারায় অনুকাব্য, লিরিক, হাইকু, লতিফা, চটুল পঙ্ক্তি স্থান করে নিয়েছে। যা মানুষ এক নিঃশ্বাসে পড়ে নিতে পারছে। রচিত হচ্ছে আধুনিক গদ্যকবিতা তখন অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও মেধাশ্রম দিয়ে কবি রচনা করছেন তার মহাকাব্য। এ প্রয়াস নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। রাজশাহীর মত বিভাগীয় শহর থেকে এধরনের মহাকাব্যের প্রকাশ কাব্য পরিসরকে আন্দোলিত করে বৈকি। যা চব্বিশটি সর্গে বিভক্ত হয়ে প্রায় তেইশ ফর্মার বৃহৎ কলেবরে প্রকাশ পেয়েছে। পুরো অফসেট প্রিন্ট আর চার রঙা উজ্জ্বল স্পট করা সুন্দর এই মহাকাব্য গ্রন্থটি খুবই দৃষ্টি নন্দন। এতে কবির বিনম্র কথন ছাড়াও আরো কিছু বিশিষ্ট লেখকদের অনুবদ্ধ কথা যুক্ত হয়েছে। কবি, অধ্যাপক অনীক মাহমুদ, উদয় নারায়ণ সিংহ, অধ্যাপক সুদীপ বসু। সুপ্রাচীনকালে মুখে মুখে প্রচলিত কবিতাসমগ্রও মহাকাব্যের মর্যাদা পেয়েছে। মহাকাব্য নিয়ে আলবার্ট লর্ড এবং মিলম্যান প্যারী ব্যাপক গবেষণা করেছেন। তারা উভয়েই যুক্তিপ্রদর্শন সহকারে ঐকমত্য্যে পৌঁছেছেন যে, আধুনিককালের মহাকাব্যগুলো প্রকৃত অর্থে প্রাচীনকালের মৌখিকভাবে প্রচলিত ও প্রচারিত কবিতাসমগ্রেরই শ্রেণিবিভাগ মাত্র। মহাকবি হোমার মহাকাব্য রচিত হয়েছিল প্রাচীন গ্রিক ভাষায়। মহাকাব্য পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে একক কবির দ্বারা রচিত হয়েছে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮৬১ সালে রচনা করেছেন ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ যা বাংলা ভাষার রচিত প্রথম ও শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য। ভার্জিলের ‘ইনিড’ (রোমান) আর মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’ (ইংরেজি) পৃথিবীর সেরা দুই মহাকাব্য যা অনুকৃত । মহাকবি ফেরদৌসী ফারসি ভাষায় রচনা করেন মহাকাব্য ‘শাহনামা’। কালিদাসের কুমারসম্ভবম্, রঘুবংশম্, তাসোর জেরুজালেম ডেলিভার্ড এই সব epic of art এর অসাধারণ উদাহরণ। রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়ড, ওডিসি এখনো টিকে আছে তার সমহিমায়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-‘মহাকাব্য বলিতে কী বুঝি আমরা তাহার আলোচনা করিতে প্রস্তুত আছি, কিন্তু এপিকের সঙ্গে তাহাকে আগাগোড়া মিলাইয়া দিব এমন পণ করিতে পারি না। কেমন করিয়াই করিব? প্যারাডাইস লস্ট্কেও তো সাধারণে এপিক বলে, তা যদি হয় তবে রামায়ণ-মহাভারত এপিক নহে-উভয়রে এক পঙ্ক্তিতে স্থান হইতেই পারে না।’ এমন উক্তিও আছে তবে এই মহাকাব্য রচনার সাহস সত্যি গর্বিত করে সাহিত্যপ্রেমিদের।
দ্বিজেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী অজ্ঞাতবাস মহাকাব্যের প্রথম সর্গে দিয়েছেন পঞ্চপা-বের নিরাপদ রাজ্যের সন্ধান।-‘কৃপা করো কৃপাময়ি, মাতঃ, বীণাপনি / প্রণমি অধম আমি, পাদপদ্মে তব’ দ্বিতীয় সর্গে আছে তাদের অজ্ঞাতবাসের মন্ত্রণা, তৃতীয়তে আছে ছন্মবেশী প-বদের আশ্রয়প্রার্থনা। এম্নিভাবে কৌরবগণের আত্মকলহ, অর্জুন কর্তৃক কর্ণ ও কৃপাচার্যের পরাজয় সব শেষে দ্বাবিংশ সর্গে আছে বিরাটের গৃহে পঞ্চপা-বের আত্মপ্রকাশ। এরপরও লেখক পাঠকের সুবিধার্থে প্রষ্ঠাক্রমিক দুরূহ শব্দার্থ ও টীকার অভিধান সংযুক্ত করেছেন। পৌরাণিক ঘটনার বর্ণনা মহীরুহ হয়ে এসেছে ষষ্ঠ সর্গে- দ্রৌপদীর তিরষ্কারে হঠাৎ বস্ত্রাঞ্চল ধরে টানে দুষ্ট,মদগর্বে, মহাাবেগে’ দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের বর্ণনা তার ক্রোধ ও শ্লেষ ধিক্কার প্রচন্ড আবেগিক প্রয়োগ করেছেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী। সপ্তম সর্গে এনেছেন ভীমসেন কর্তৃক দ্রৌপদীকে সান্ত¡নার বর্ণনা।
এমন অবতারিত ঘটনার ঘনঘটা এ মহাকাব্যকে কতখানি সার্থক রূপে নিমজ্জিত করবে তার থেকে গেল পাঠর ওপর।