দ্য ওয়ার্ল্ড নিডস মোর কানাডা!

আপডেট: জানুয়ারি ১৪, ২০১৭, ১১:৫৯ অপরাহ্ণ

রাজিউদ্দীন আহ্মাদ



ভূস্বর্গ কানাডায় এসেছি আমরা আজ এক বছর পূর্ণ হলো। ঢাকার গুলশান-বনানির মতো একটা পশ এলাকা, টরন্টোর শহরতলীর একটা ছোট্ট শহর ওকভিলে এসে উঠি ছোট মেয়ে তুলির বাসায়। কানাডায় আসার ১৪ দিন পরেই অবশ্য আমরা চলে যাই থান্ডার বে (বজ্রপসাগর নয়!) নামে অন্য একটি শহরে যেখানে আমার আরেক মেয়ে শিখা বাস করে। সেখানে ছিলাম ৭৭ দিন, তারপরে আবার ওকভিলে। ওকভিলে এবারে ছিলাম ২১০ দিন তারপরে আবার থান্ডার বে। বছরের বাকি ৬৪ দিন, এবং সম্ভবত তার পরেও আমরা থাকব থান্ডার বেতে। অর্থাৎ কানাডায় মোট ৩৬৫ দিনের মধ্যে ২২৪ দিনই ওকভিলে। এর মধ্যে অন্য কোথাও যাইও নি। এমতাব¯থায় মাত্র এ কটা দিন একটা দেশে থেকে সে দেশ সম্পর্কে কোনো গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করা সমীচীন হবে কি না জানি না, তবু আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যেটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছি তারই ভিত্তিতে কিছু যুক্তিগ্রাহ্য তথ্য উপ¯থাপণ করছি। আমার মনে হয়েছে, বিষয়টা সকলের জানা দরকার; এবং, আমি যেভাবে উপলব্ধি করেছি তা যদি পাঠকদের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয় তবে তাঁদেরও, বিশেষ করে আমাদের যুবসমাজের, সেই আলোকে বিষয়টিকে নেয়া ও মূল্যায়ন করা উচিত। বিষয়টা নিয়ে আমি হয়তো এতোটা বিচলিত হতাম না যদি সারা পৃথিবীর মানুষ একে ভূস্বর্গ মনে না করতো বা এরা নিজেরাও একে সেভাবে উপ¯থাপন করার অপচেষ্টা না করতো।
এখানে নানাভাবে প্রতিষ্ঠা করার একটা প্রবল প্রবণতা দেখা যায় যে, এ দেশটা অত্যন্ত ভালÑ স্বর্গের মতো। এ দেশের সরকার জনগণ বলতে পাগল। অবশ্য এ দেশের সরকার কোথা থেকে পরিচালিত হয় তা ভাববার বিষয়! এ প্রসক্সেগ পরে আর একটু খুলে বলার চেষ্টা করব। এখানে এক লাইব্রেরিতে (এরা বলে বুকস্টোর) দেখলাম বড় বড় অক্ষরে লাল কালি দিয়ে লেখা, দ্য ওয়ার্ল্ড নিড্স মোর কানাডা অর্থাৎ বিশ্বে আরও কানাডার প্রয়োজন Ñ কতো বড় স্পর্ধা! কার্যত গ্রেট ব্রিটেইনের অধীনস্ত একটা দেশ হয়েও সে কথা প্রকাশ্যে যারা বলতে পারে না তাদের মুখে এ সব কথা, আমার মনে হয়, মানায় না। তবু বুক ফুলিয়ে তারা বলে তাদের এটা নাকি কন্সটিটিউশনাল (সাংবিধানিক) মোনার্কি (রাজতন্ত্র)! বিশ্বে একটা স্বাধীন দেশ হিসেবে পরিচিত এই দেশটি কতটা স্বাধীন তা ভেবে দেখার মতো।
এ ধরনের দেশ পৃথিবীতে অবশ্য আরও আছে, ছোট-বড় মিলে তাদের সংখ্যা কেবল রাণী এলিজাবেথেরই অধীনে দেড় ডজনেরও উপরে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ছাড়াও আরও অনেক কটা। এরাও সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। এ সাংবিধানিক রাজতন্ত্র একটি আজব রাষ্ট্রব্যব¯থা যদিও এমন রাষ্ট্রব্যব¯থা নতুন নয় Ñ চার হাজার বছর পূর্বেও এমন রাষ্টব্যব¯থার উল্লেখ পাওয়া যায়। (বস্তুত, ব্রিটেইন নিজেও এ ধরনের রাষ্ট্রব্যব¯থার অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ব্রিটেইন নিয়ে আমাদের তেমন অভিযোগ নেই যদিও ব্রিটেইনের রাজতন্ত্র সৌদি আরবের রাজতন্ত্রের মতো নয়। ব্রিটেইনের রাজতন্ত্র সীমিত আর সৌদি আরবের রাজতন্ত্র নিরক্সকুশ।) এরা নিজেদেরকে স্বাধীন বলে দাবি করলেও তাদের পুষতে হয় ব্রিটেইনের রাণীর প্রতিনিধিদের যাদের সম্মতি ছাড়া পার্লামেন্টে কোনো আইনও পাশ হয় না। ব্রিটেইনের আদলে এদের পার্লামেন্টে আছে আপার হাউস (যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডস) এবং লোয়ার হাউস (যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্স) Ñ সেটা অবশ্য দোষের কিছু নয়। কানাডায় আপার হাউসের সদস্যদের বলা হয় সিনেটর (লর্ডস) আর লোয়ার হাউসের সদস্যদের বলা হয় মেম্বর অব দ্য পার্লামেন্ট বা এমপি। এই এমপিগণ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন ব্রিটেইনে যেমন হাউস অব কমন্সের মেম্বারদের জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসতে হয়। এখানে কার্যত দুটা দল, এদের মধ্যে যে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপি থাকে (সাধারণত) সে দল সরকার গঠন করে। সরকার প্রধানকে প্রধানমন্ত্রী বলা হয়। এ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হচ্ছেন ইংলন্ডের রাণী বা রাজা। রাণী বা রাজার পক্ষে কাজ করেন গভর্নর-জেনারেল যেমন স্বাধীনতার আগে ভারতে ব্রিটেইনের রাণী বা রাজার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন গভর্নর-জেনারেল (১৮৫৭-এর পর থেকে অবশ্য ভারতে এ পদটাকে ভাইসরয় ও গভর্নর-জেনারেল বা সংক্ষেপে শুধু ভাইসরয় বলা হতো)। ভারতের শেষ গভর্নর-জেনারেল ভারতীয় রাজাগোপালাচারির মতো এখানকার গভর্নর-জেনারেল এবং লেফটেনান্ট জেনারেলগণ কানাডিও। প্রতিটা প্রদেশ ও টেরিটোরিতে গভর্নর-জেনারেলের মতো প্রদেশ বা টেরিটোরি প্রধান হচ্ছেন লেফটেনেন্ট গভর্নর। সিনেটরগণকে সরকার নিয়োগ দেয় বটে তবে রাণী বা রাজার প্রতিনিধির অনুমোদন লাগে। গভর্নর-জেনারেলের ও লেফটেনান্ট গভর্নরগণকেও সরকারই নোমিনেশন দেয় কিন্তু তাঁদের নিয়োগ দেন রাণী বা রাজা স্বয়ং।
রাষ্ট্রপ্রধান ব্রিটেইনের রাণী হলে কী, চলতে হয় যুক্তরাষ্ট্রের পদলেহন করে। সামান্য গাড়ি চলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো রাস্তার ডান দিক দিয়ে। অধিকাংশ সাংস্কৃতিক বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের আদলে। এদের ইংরেজিতেও যুক্তরাষ্ট্রের ছাপ সুস্পষ্ট। আর অর্থনৈতিক ব্যব¯থা তো প্রায় পুরোটাই যুক্তরাষ্ট্রের মতো কেবল স্বা¯থ্য বিষয়ে কিছুটা আলাদা। এ সকল নিয়ম-কানুন বিবেচনায় নিলে এক কথায় বলতে হয়, ভূস্বর্গ তো নয়ই একে নরকেরও অধম বলা যায়। এটা অবশ্য আমার একান্তই নিজস্ব মত, কারণ আমি অসত্য উপ¯থাপণাকে অত্যন্ত ঘৃণা করি, আর এখানে ঠিক তাই করা হয় Ñ রাজনীতি-অর্থনীতি উভয় ক্ষেত্রে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো এরা পরিষ্কার করে বলে না যে এটা একটা কট্টর ধনতান্ত্রিক দেশ যদিও এদের রাজনীতি ও অর্থনীতির মূল লক্ষ্য সাধারণের মাথায় কাঁঠাল ভেক্সেগ হলেও পুঁজিবাদকে লালন করা। পক্ষান্তরে তারা নানাভাবে বলতে চায় যে, তারা জনগণের কল্যাণে কাজ করে যায় Ñ এটা একটা কল্যাণমুখি দেশ বা সমাজতন্ত্রের বিকল্প যা সমাজতন্ত্রের চেয়েও ভাল। এ দেশের জনগণের ৩.৮ শতাংশ আদিবাসী, ২২ শতাংশ অভিবাসী আর বাকি তথাকথিত কানাডীয় যাদের প্রায় সকলেই ইউরোপিয়Ñ অধিকাংশই ইংলন্ড, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, ওয়েল্স ও ফ্রান্স বংশদ্ভূতÑ গত চার-পাঁচশ বছর ধরে আমেরিকায় এসে আস্তানা গাড়া; আর, আছে কিছু ক্রিতদাস হিসেবে আমদানি করা আফ্রিকান-আমেরিকান।
১৪৯২ সালে কলোম্বাসের আমেরিকায় আগমনের পরে ইউরোপিয়রা দলে দলে এই নতুন বিশ্বে পক্সগপালের মতো ছুটে আসতে থাকে ও একের পর এক এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে থাকে। এদের মধ্যে স্পেইন, ব্রিটেইন ও ফ্রান্স সবচেয়ে এগিয়ে ছিল। আদি আমেরিকাবাসীগণকে সমূলে মূলোচ্ছেদ করে এখানে উপনিবেশ গড়ে তুলতে থাকে। এই উপনিবেশগুলোর অধিবাসীগণ প্রায় সকলেই ইউরোপিয় বংশদ্ভূত। কিন্তু তারাও এক পর্যায়ে এসে স্বাধীনতার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। এমনই ১৩টি ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রথম স্বাধীনতার লড়াই লড়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে এবং মুক্ত হয়ে ১৭৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিল আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র। (ভারতে আস্তানা গাড়ার মাত্র ১৯ বছর পরে এগুলো ব্রিটেইনের হাতছাড়া হয়।) এ সময় এদের মধ্যে ক্রিতদাস প্রথা চালু ছিল যাদের প্রায় সকলেই ছিল আফ্রিকার মানুষÑ তাদের কিনে জাহাজ ভর্তি করে নিয়ে আসা হতো। তারপর, আমেরিকায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে, কাগজে-কলমে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায় কিন্তু প্রকৃত তা হয় নি। দাস ছাড়া আমেরিকান ধনিকশ্রেণি তো চলতে শিখে নি! তাই এক অভিনব দাসপ্রথা চালু হয়, যার নাম, ইমিগ্রেশনের মাধ্যমে, ইমিগ্রেন্ট। একে আমি নব্যদাসপ্রথা (ঘবড়ংবৎভঃফড়স) বলি। এখন এই ইমিগ্রেন্টগণই দাস যা এরা বেচা-কেনার বদলে গাড়ি-বাড়ির মতো হায়ার (ভাড়া) করে। হায়ার এন্ড ফায়ার এ দেশের মানুষের জন্মগত অধিকার (এ বিষয়ে লোক দেখান কিছু নিয়ম-কানুন অবশ্য আছে!)। যা-ই হোক, ক্রমেই অন্যান্য উপনিবেশগুলোও স্বাধীন হয়ে নতুন নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। এরই এক পর্যায়ে লক্ষ লক্ষ লিটার রক্ত ঝরিয়ে ব্রিটেইন ও ফ্রান্স নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি করে বর্তমান কানাডার জন্ম দেয়Ñ টিকিয়ে রাখে রাজতন্ত্রের শেষ গ›ধটুকু। তাই, আমেরিকাতে এটিই একমাত্র দেশ যা পুরোপুরি স্বাধীন নয়। এখানে রাষ্ট্রিয় ভাষা দুটোÑ ইংরেজি ও ফরাসি। ছিটেফোটা আদিবাসী যা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তারা হতে থাকে নিগৃহীত ও নানাভাবে প্রতারিত। ইদানিং তাদের জন্য তৈরি করা হয়েছে কিছু সংরক্ষিত (রিজার্ভ) এলাকাÑ সে সব এলাকায় তাঁরা বাস করেন এক ধরনের নির্বাসিত জীবনÑ স্বদেশে বনবাস আর কী!
এ দেশের একখানে কথাপ্রসক্সেগ একদিন আমি বলেছিলাম যে, রাষ্ট্রপ্রধান পদটি তো অনেকটাই আলক্সকরিক, এ পদটি একজন আদিবাসীর জন্য সংরক্ষিত থাকতে পারতো। তাতে ষোলকলা পূর্ণ হতোÑ আদিবাসীরাও কিছুটা আনন্দিত হতো। কিন্তু তা এরা করে নিÑ সেখানে ব্রিটেইনের রাণীকে বসিয়ে রেখেছে। অবশ্য এমনও তো করতে পারতো যে, রাণী রাষ্ট্রপ্রধান হোন কিন্তু গভর্নর জেনারেল ও লেফটেনান্ট জেনারেলগণ সবসময়ে আদিবাসীদের মধ্য থেকে হবে! না, তাও তারা করে নি। তাদের মধ্যে সব সময়ে সমস্ত কিছু তাদের নিজেদের মধ্যে কুক্ষিগত করে রাখার প্রবণতা অত্যন্ত প্রবল। তা ছাড়া, চুরির মাল হারিয়ে যাবার ভয় তাদের সর্বদা এখনও তাড়া করে চলেছে বলে মনে হয়। রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে হাতে লেগে থাকা রক্ত পরিষ্কার করার জন্য সাবান দিয়ে হাত ধোয়া তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে হয়তো!
লেখক: স্থপতি