ধানের সরবরাহ কম, বাড়ছে দাম

আপডেট: মে ২৬, ২০২২, ১২:৫৭ পূর্বাহ্ণ


নিজস্ব প্রতিবেদক:


ভরা মৌসুমেও মোকামে (আড়ৎ) ধানের আমদানি কম। মোকামগুলোতে চাহিদার বিপরীতে আমদানি কম থাকায় দাম কিছুটা বেশি। তবে ধানের দাম বেশিতে খুশি চাষীরা। কৃষি অফিস বলছে- ‘এবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ধানের ফলন কিছুটা কম হয়েছে।’ এমন অবস্থায় ধান সঙ্কটে রয়েছে চাতালগুলো।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত বছরগুলোতে কৃষকের গোলায় ধান ওঠার সময়ে দাম কিছুটা কম থাকে। এর পরে আস্তে আস্তে দাম বাড়তে থাকে। তবে এবছর ধান ওঠার সময়ে দাম বেশি। তার পরেও আমদানি কম। আমাদের মান্দা, মোহনপুর, তানোর ও দুর্গাপুর প্রতিনিধিরা এ তথ্য জানায়।

তানোর প্রতিনিধি জানায়, তানোরে মিনিটেক ধানের দাম বেড়েছে। গত কয়েকদিনের তুলনায় কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা।
ধান ব্যবসায়ী ইনজামামুল হক জানান, ‘মঙ্গলবার (২৪ মে) তানোরের মোকামে ১৩৮৬ টাকা মণ দরে মিনিকেট ধান কেনা-বেচা হয়েছে। গত কয়েকদিনের তুলনায় ধানের দাম বেড়েছে। এবছর চাষীরা তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছেন।’

মোহনপুর প্রতিনিধি মোস্তফা কামাল জানান, ধানের চড়া দাম পেলেও লোকসানে মোহনপুরের বোরো চাষীরা। কারণ বোরো চাষে ব্যয় বেশি হয়েছে। তার পরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়নি। এ ছাড়াও ধানকাটা শ্রমিক সঙ্কটে দিতে হয়েছে অধিক মজুরি। এমন অবস্থায় কিছুটা খরচ বেড়েছে।

মোহনপুরের কেশরহাটে গত শনিবার (২২ মে) জিরা ধান বিক্রি হয়েছে সাড়ে ১৩শো টাকা থেকে ১৪৫০ টাকা দরে। যা গত বুধবার এ হাটে জিরা ধান বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ১২শো টাকা মণ দরে।

তিলাহারী গ্রামের কৃষক এনামুল হক জানান, শনিবার প্রতিমণ জিরা শাইল ধান বিক্রি হয়েছে ১৩২০ টাকা দরে। তাতে আমাদের মতো কৃষকদের জন্য ভাল। কারণ কৃষকদের কিছুটা কষ্টের দাম উঠবে। এছাড়া প্রতি বিঘা জমিতে ধানের ফলন হয়েছে ১৬ মণ। যা গত বছর হয়েছিল ২৫ মণ। এছাড়া ঝড়-বৃষ্টির কারণে অতিরিক্ত শ্রমিক দিয়ে কাজ করাতে হয়েছে চাষীদের।

মোহনপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রহিমা খাতুন বলেন, ‘এবার প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে বোরো ধানের ফলন কিছুটা কম হয়েছে। বাজারে ধানের ধাম ভাল আছে। এজন্য কৃষকরা কিছুটা লোকসান পুষিয়ে নিতে পারবে বলে মনে করেন তিনি।’

দুর্গাপুর প্রতিনিধি জানান, মূলত হাটে ধানের আমদানি কম, বেড়েছে দাম। ফলে বেচাকেনাও কমেছে। চালকল মালিকরা বলছেন, হাটে প্রতিমণ ধানে বেড়েছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। এতে করে ধান থেকে চাল তৈরিতেও খরচ বাড়ছে।

হাট সংশ্লিষ্টরা জানায়, দুর্গাপুর ১৯টি চালকলে ধানের যোগান দেয় এই মোকাম। প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মোকামে ধান বেচাকেনা চলে। প্রতি হাটবারে প্রায় ৩শো মণ ধান বিক্রি হয়। এর মধ্যে বিআর-২৮ জাতের ধান প্রতিমণ বিক্রি হচ্ছে ১২শো থেকে ১২৫০ টাকায়, বিআর-২৯ জাতের ধান প্রতি মণ ১২১০ থেকে ১২২০ টাকা এবং বিআর-৩৯ ও বিআর-৪৯ জাতের ধান প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ১০৮০ থেকে ১১শো টাকা দামে। প্রত্যেক জাতের ধানেই মণ প্রতি গড়ে ৪০-৫০ টাকা বেড়েছে। বছরের শুরুতে ধানের দাম চড়া হলেও মাঝ খানে একটু কমেছিলো।

জানা গেছে- প্রতি অর্থবছরে উপজেলার চালকলগুলোর সঙ্গে চাল সংগ্রহের জন্য চুক্তি করে খাদ্য বিভাগ। এবারও উপজেলার ১২টি চালকলের সঙ্গে ৩২৫ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের চুক্তি হয়েছে। আর উপজেলার কৃষকের কাছ থেকে ৬৩৭ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতি কেজি চাল নেওয়া হচ্ছে ৪০ টাকা দরে। আর ধান কেনা হচ্ছে প্রতি কেজি ২৭ টাকায়। এবছর পহেলা মে থেকে ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়। চলবে আগামী ৩০আগস্ট পর্যন্ত।

উপজেলার চালকলের ধানের ক্রেতা সাত্তার আলী জানান, জানুয়ারি মাসের প্রথম থেকে ধানের দাম বেড়েছে। মোকামে ধানের আমদানি কম। এ কারণে কোনো ধানে মণ প্রতি ৪০ টাকা আবার কোনো ধানে ৫০ টাকা দাম বেড়েছে। নতুন মৌসুমের ধান হাটে আসার পর বাজারদর স্বাভাবিক হয়নি বলে জানান তিনি।

ভাই ভাই রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী এজাজুল হক জানান, হাট থেকে ধান কেনার পর মিলে নিয়ে চাল তৈরি পর্যন্ত যে খরচ হয়, সেই দামে চাল বিক্রি করা যায় না। এক মণ ধানে চাল হয় ২৫-২৬ কেজি। ৪০ টাকা দরে ২৬ কেজি চালের দাম ১০৪০ টাকা। এই দামে চাল দিতে গিয়ে মিল মালিকদের লাভ তো হচ্ছেই না, উল্টো লোকসানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ধানের বর্তমান বাজার দরে প্রতি কেজি চালে ১ টাকা করে লোকসান গুণতে হবে।

মান্দা প্রতিনিধি জানায়, শুক্রবার (২০ মে) চৌবাড়িয়া ও বৃহস্পতিবার (২০ মে) ধানের মোকাম সাবাইহাটে প্রতিমণ জিরাশাইল ধান বিক্রি হয়েছে ১৪শো থেকে ১৪২৫ টাকা দরে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাতাল শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিয়েছে। এরই মধ্যে চাতালে ধান সেদ্ধ-শুকানোর কাজ শুরু করা হয়েছে। কিন্তু হাটে আমদানি কম হওয়ায় ধানের বাজার প্রতিদিনই বাড়ছে।

চাতাল ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, ধানের দাম বাড়তির দিকে থাকায় কৃষকেরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধান হাটে আনছেন না। হাটে চাহিদার তুলনায় আমদানি কম হওয়ায় দাম বাড়ছে। বৃহস্পতিবার সাবাইহাটে প্রতিমণ জিরাশাইল ধান ১৪শো টাকা থেকে ১৪২৫ টাকা পর্যন্ত কিনতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সাবাইহাটের ইজারাদার মোজাফফর হোসেন বলেন, গতবছর এসময় প্রত্যেক হাটে ধানের প্রচুর আমদানি ছিল। আমদানি থাকায় স্বাচ্ছন্দে ধান কিনছেন ব্যবসায়ীরা। এ মৌসুমে হাটগুলোতে এখন পর্যন্ত ধানের পর্যাপ্ত আমদানি হয়নি। এ কারণে তিনিও অনেকটা বেকায়দায় রয়েছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শায়লা শারমিন বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১৯ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিছুটা ফলন বিপর্যয় হয়েছে। এরপরও লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি উৎপাদন হয়েছে বলেও দাবি করেন এই কৃষি কর্মকর্তা।

নওগাঁ জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জেলায় ধানের উৎপাদন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি কাটা-মাড়াই খরচ বিগত বছরের তুলনায় এবছর দ্বিগুন হয়েছে। এসব কারণে প্রতিনিয়তই বাড়ছে ধানের বাজার। যার প্রভাব পড়ছে চালের বাজারে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) তৌফিকুর রহমান জানান, ‘এবছর ফলন কিছুটা কম হয়েছে। ধানের দাম বেশি পেলে, কৃষকরা চাষে আগ্রহী হবে।’

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ