ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন বরেন্দ্রর কৃষক

আপডেট: জুন ১৪, ২০১৭, ১:৩০ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র রাজশাহীর তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলা। এঅঞ্চলের মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। খরাপ্রবণ এই এলাকার কৃষক মূলত ধানচাষ করেই জীবিকানির্বাহ করেন। কিন্তু কৃষকের পণ্য উৎপাদনে চাষাবাদে পরিবর্তন এসেছে। এখন এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক ধানের পরিবর্তে অন্য ফসল চাষে ঝুঁকছেন।
কৃষকরা বলছেন, প্রতিবছর ধান চাষে লোকসানের পরিমাণ বাড়তেই আছে। তাই ধান ছেড়ে তারা এখন ঝুঁকছেন আলু ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন ধরনের রবিশস্য চাষের দিকে। বরেন্দ্র অঞ্চলে ধান চাষে অতিরিক্ত সেচ খরচের কারণে ধানের উৎপাদন খরচ উঠছে না। পাশাপাশি কীটনাশক ও কৃষিশ্রমিকের অতিরিক্ত মূল্যের কারণে কৃষক দিশেহারা। এছাড়া চলতি মৌসুমে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ধানের চাষাবাদ করে লোকসানে পড়েছেন চাষিরা। অসময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে ধান কাটা শ্রমিক অর্ধেক মজুরি খরচ নিচ্ছেন। অর্ধেক দিচ্ছেন কৃষককে। ফলে উৎপাদন খরচের দিগুন লোকসান হচ্ছে চাষিদের। একারণে ধানের আবাদ কমিয়ে তারা কম সেচের রবিশস্য চাষে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠছেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ‘৮০ দশকের মাঝামাঝি থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) গভীর নলকূপ স্থাপন করে। এ অঞ্চলে সেচ চাহিদা মেটাতে এসব গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ এ সময়ে শুধু ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর এখন অনেক নিচে নেমে গেছে। গভীর নলকূপ স্থাপনের শুরুর দিকে পানির স্তর মাটির ৩৫ ফুট গভীরে থাকলেও এখন স্থানভেদে পানির স্তর ১২০ থেকে ১৪০ ফুট গভীরে পাওয়া যাচ্ছে।
আবার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে এখন অসময়ে বৃষ্টি ও অনাবৃষ্টি দেখা দিয়েছে। এর ফলে ভূগর্ভের পানির রিচার্জ না হওয়ায় গভীর নলকূপ থেকে পানি উঠছে খুবই কম। অন্যদিকে এ অঞ্চল অত্যন্ত খরাপ্রবণ এলাকা হওয়ায় এখানে ধান চাষে সেচের প্রয়োজন হয় অন্যান্য এলাকার চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি। আর বোরো চাষ হলে তো পানির প্রয়োজন আরো বেশি। এতে ধানের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় কৃষকের। বরেন্দ্র অঞ্চলের নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের উপজেলাগুলোতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে গোদাগাড়ী উপজেলায় ১৪ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে ধানচাষ হয়েছে। যেখানে গত মৌসুমে বোরোচাষ হয়েছে আরো এক হাজার ১৫০ হেক্টর বেশি জমিতে।
তানোর উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আলী রেজা জানান, তানোর উপজেলাতে চলতি মৌসুমে বোরো আউশ চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয় নি। গত বছরের তুলনায় বোরো ও আউশ চাষের লক্ষ্য মাত্রা কমেছে ১ হাজার ৮০০ হেক্টোর জমিতে। কৃষি বিভাগ মনে করছে, সেচ সঙ্কট ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তানোর ও গোদাগাড়ীতে প্রায় প্রতিবছরই ধানের চাষ কমছে।
এদিকে ধানচাষ কমলেও বাড়ছে রবি শস্যের চাষাবাদ। চলতি রবি মৌসুমে গোদাগাড়ীতে মসুর ডাল দুই হাজার ৮৫০ হেক্টর, ছোলা এক হাজার ৫২৫ হেক্টর, গম ৮১০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। এসব শস্যের প্রতিটিরই চাষাবাদ গত বছরের তুলনায় বেড়েছে।
প্রতিকূল আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ধানচাষ করে লাভের চেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে চাষিরা সেচনির্ভর ধানের আবাদ থেকে সরে আসছেন। চলতি মৌসুমে তানোর উপজেলায় প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আউশের পরিবর্তে চাষ হয়েছে ভুট্টা, মাল্টা, কমলা, পেয়ারা, গম ও বিভিন্ন ধরনের সবজিসহ অর্থকরী ফসল। তানোরে ধান ছেড়ে বেশি করে বিকল্প ফসলের চাষাবাদ করতে রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের সাংসদ ওমর ফারুক চৌধুরী বিভিন্ন সভা সেমিনারে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন। এজন্য তার পক্ষ থেকে বিভিন্ন সবজি জাতের বীজ বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে।
তানোর উপজেলার জিওল গ্রামের কৃষক মহসিন রেজা জানিয়েছেন, এক বিঘা ধান চাষে খরচ হচ্ছে প্রায় ৮ হাজার টাকা। এর বিপরীতে ধানের উৎপাদন হচ্ছে সর্বোচ্চ ২০ মণ। এর মধ্যে থেকে অর্ধেক ধান শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহণ খরচ হিসেবে বাদ দিতে হয়। বর্তমান বাজারে বাকি ১০ মণ ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচই উঠছে না। দিগুন টাকা লোকসান হচ্ছে। এর ফলে কৃষক ধানচাষ কমিয়ে দিয়েছেন। এদিকে উপজেলার বিভিন্ন স্থানের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রবি শস্য চাষেই বেশি লাভবান হচ্ছেন তারা।
কৃষকরা জানিয়েছেন, সেচহীন এক বিঘা মসুর ডাল চাষে কৃষকের সর্বোচ্চ ৪ হাজার দুইশ টাকা খরচ হয়। আর বিঘা প্রতি মসুরের উৎপাদন কমপক্ষে চার ণ। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ মসুর বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৮শ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। এর ফলে লাভবান হচ্ছেন কৃষক।
গোদাগাড়ী উপজেলার আতাহার গ্রামের কৃষক শামসুল হক জানান, এক বিঘা ছোলা চাষে খরচ হয় প্রায় ৪ হাজার টাকা। ছোলার বিঘাপ্রতি উৎপাদন ৫ থেকে ৬ মণ। বর্তমান বাজারে প্রতিমণ ছোলা বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার দুইশ টাকা থেকে দুই হাজার পাঁচশ টাকায়। ফলে ছোলা চাষেও লাভবান হচ্ছেন কৃষক। পাশাপাশি আলু চাষে উৎপাদন খরচের অর্ধেক লাভ হচ্ছে চাষিদের। ফলে আলুর চাষাবাদ বেড়েছে তিনগুন।
গমচাষি পিরিজপুর গ্রামের গোলাম মোস্তফা জানিয়েছেন, তিনি এবার আট বিঘা জমিতে গমচাষ করেন। এর ফলে তার প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছিল প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। কয়েকদিন আগে গম কেটে ফলন পেয়েছেন বিঘা প্রতি ১২ মণ। বর্তমান বাজারে প্রতি মণ ৯৬০ টাকা দরে গম বিক্রি করে এক বিঘার গমেই তিনি সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা লাভ করেছেন।
এদিকে বরেন্দ্র অঞ্চলে ধান চাষ কমে যাওয়া এবং এর বিপরীতে রবি শস্য চাষ বেড়ে যাওয়াকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন তানোর ও গোদাগাড়ী কৃষি কর্মকর্তারা। এ ব্যাপারে তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষক ধান চাষে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কারণ, ধান চাষে উৎপাদন ব্যয় বেশি। এর বিপরীতে সবজিসহ অন্য ফসল চাষে উৎপাদন ব্যয় কম, লাভ বেশি। একারণে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষক ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ