ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাস || পাঁচ কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

আপডেট: January 11, 2020, 12:55 am

সালাম হাসেমী


( ৩ )
পরের দিন রাত ২টার সময় মুরাদ, মাসুদ , মনি ও জাভেদ পাঁচ কিশোর ছায়াতলী গ্রামের বনের ভিতর এসে হাজির হল। এসে দেখলো শামীম মামা ওই বনের ভিতরে তাদের আগে এসে পৌছে গেছে। ওরা পাঁচ বন্ধু শামীম মামাকে অনুসরণ করে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে এসে শ্মশান ঘাটে পৌছালো। ওখানে নৌকা
ভিড়ানো আছে। শামীম মামার সাথে ওরা নৌকায় উঠল। ছইয়ের নৌকা। ছইয়ের ভিতরে বসলে বাহির থেকে দেখা যায় না। নৌকা ছেড়ে দিল। বর্ষার জলে নৌকা ভাটির টানে দ্রুত গতিতে চলছে। নদী দিয়ে সোজাসোজি গেলে তাড়াতাড়ি যাওয়া যায় কিন্তু সামনে ব্রীজ আছে । ওই ব্রীজে দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা রাজাকার পাহারায় থাকে। তারা নদী দিয়ে এত রাতে ছইয়ের নৌকা যেতে দেখলে নৌকা ভিড়িয়ে তল্লাসী করে। কাজেই এপথ দিয়ে যাওয়া নিরাপদ নয় বলে এ পথ দিয়ে যাওয়া যাবে না। এই নদী থেকে একটি শাখা নদী চলে গেছে পশ্চিম দিকে , সে শাখা নদী দিয়ে যেতে সময় একটু বেশী লাগে । তারা সেই শাখা নদী দিয়ে যেতে লাগল। সেই শাখা নদী িিদয়ে যেতে যেতে সকাল হয়ে গেল। সকালে তারা এসে একটি বিশাল বিলে প্রবেশ করল। এই বিলের মাঝ খানে একটি ছোট খাটো গ্রামের মত স্থল ভাগ দেখা যায়। এই স্থল ভাগ একটি বিশাল বন। এই বনের চার দিকে থৈ থৈ বিল। বিলের অনেক দূরে দক্ষিণ পাশে খরস্রোতা নদী। নদীর অপর গ্রাম। ইহা ছাড়া বিলের পূর্ব পশ্চিম ও উত্তর পাশে অনেক দূরে দূরে গ্রাম । এত দূরে যে বিলের মাঝের বনের মধ্য হতে সে গ্রাম গুলো দৃষ্টি গোচর হতে দেখা চায় না। সকাল ৭টার সময় ওদের নৌকা বনের তীরে ভিড়ল। নৌকা হতে ্ধসঢ়;এই পাঁচ কিশোর নামার সাথে সাথে একজন মধ্য বয়োসী বলিষ্ঠ লোক এসে তাদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে বনের ভিতর তাঁবুতে নিয়ে গেল। এই পাঁচ কিশোরকে দেখে বয়োস্ক মুক্তি যোদ্ধা মহা খুশি। সকলেই তাদের শুভেচ্ছা ও স্বাগতম জানালো । সকলে তাঁবু
হতে বেরিয়ে বনের ভিতর ঘুরে ঘুরে দেখলো। সেখানে গিয়ে দেখল যে, এই বন তো বন নয় যেন মুক্তি বাহিনীদের এক বিশাল ঘাটি ও রাজ্য। এখানে মুক্তি বাহিনীদের ছাড়া অন্য কারো কোন প্রকার বাহাদুরী নাই। এটা মুক্তি যোদ্ধাদের ট্রেনিং কেন্দ্র। এখানে বিভিন্ন এলাকা হতে আসা নব্য মুক্তি যোদ্ধাদের ট্রেনিং দিয়ে তাদের অস্ত্রাদি দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। এই বনে এসে ওরা পাঁচ কিশোর প্রথম দিন কোন ট্রেনিং গ্রহন করল না। সারাদিন বিলের মাঝের এই

বিশাল বন ঘুরে ঘুরে দেখল। এই বন ঘণ গাছপালা পূর্ণ ও গভীর । বনে অনেক পশু পাখি ও নানা রকম গাছপালা রয়েছে। বিলের পানিতে মাছ ও মাছ খেয়ে জীবন ধারন করে এমন অনেক পাখি আছে। যে পাখি গুলো বিল হতে মাাছ শিকার করে খায় এবং এই বনে বস বাস করে। পরের দিন সকাল হতে এই পাঁচ কিশোরের ট্রেনিং শুরু হল। তাদের ট্রেনিং দেওয়ার কথা ছিল সাতদিন কিন্তু পাঁচ দিনেই তাদের ট্রেনিং শেষ হয়ে গেল। ট্রেনিং শেষ হলে তাদের ছায়াতলী গ্রামে ফিরে আসার কথা। কিন্তু দলের নেতা ক্যাপটেন সালাউদ্দিন -এই পাঁচ কিশোকে বলেছেন , এই পাঁচ দিন ট্রেনিং দেওয়াতে তাদের অনেক পরিশ্রম হয়েছে। তারা দুই দিন এই বন ভূমি ঘুরে ঘুরে দেখে আনন্দ উপভোগ করুক। তার পরে গ্রামে ফিরে যাবে। ওরা পাঁচ কিশোর বনের ভিতর দিয়ে ঘুরছে। হঠাৎ তারা দেখল একটি বাগ ডাসা তাদের পার্শ্ব দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। মনিরের সাথে গুলতি ছিল সে গুলতি দিয়ে বাঘডাসাকে গুলতি দিয়ে গুলি করল। গুলি খেয়ে বাঘডাসা ভয়ে দিল ভোঁ- দৌড়। এমন ভাবে দৌড়াচ্ছে যে আগে পিছনে ও ডান বায়ে কি আছে বা কি হচ্ছে সে উহা ভ্রক্ষেপ করছে না। দৌড়াচ্ছে তো দৌড়াচ্ছেই। দৌড়াতে দৌড়াতে তার সামনে ছিল একটি শিয়াল উহাতে আঘাত লেগে পরে গেল বিলের জলে। তা দেখে ওরা পাঁচ কিশোর
খুশিতে হাতে তালি দিয়ে হাসতে লাগল। পাঁচ কিশোর হাঁটতে হাঁটতে বিলের দক্ষিণ পাশে নদীর ধারে এলো। এখানে এসে ওরা দেখল নদী দিয়ে অগণিত মরা লাশ ভেসে যাচ্ছে। পাকিস্থানসেনা ও রাজাকারের দল নিরীহ মানুষ গুলোকে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। নদীতে এত মরা মানুষ দেখে বেদনায় ওদের প্রাণ কেঁদে উঠল। ওরা মনে মনে সংকল্প করল যে এই পাকসেনা ও রাজাকারের সাথে ওরা যুদ্ধ করে তাদের পরাজয় করে দেশ স্বাধীন করে বাংলার বুকে তারা বিজয় নিশান উড়াবে। দেশের এই করুন অবস্থা
দেখে তাদের মন খারাপ হয়ে গেল। তারা আর নদীর তীর দিয়ে না ঘুরে মুক্তি যোদ্ধাদের তাঁবুতে ফিরে এলো । তাঁবুতে ফিরে এসে পাঁচ কিশোর অন্যান্য মুক্তি যোদ্ধাদের সাথে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবর ও মুক্তি যুদ্ধের দেশাত্ব বোধক গান শুনছে। এই গান শুনে পাঁচ কিশোরের মন উত্তেজিত হয়ে উঠল।
উত্তেজনায় তারা প্রত্যেককে রাইফেল হাতে তাঁবুর বাহিরে ছুটে এলো। রাইফেলকে ডান হাত দিয়ে উর্দ্ধে তুলে সকলে সমস্বরে গান ধরে-
উচ্চ স্বরে গেয়ে উঠল।
আমরা বিনাশ করব সবে
পাকসেনা আর রাজাকার ,
তবেই স্বাধীন হবে দেশ
বলছি আমরা বারে বার ।
যুদ্ধ করে এগিয়ে চলো
বুক ফুলিয়ে সবাই বলো
আমাদের বিজয় হবেই এবার। ওই
নির্ভয়ে গিয়ে চল সাহস নিযে মনে
স্বাধীনতার সূর্য ওই উঠছে পূর্ব কোণে
হবে হবে দেশ স্বাধীন
উড়াও নিশান এবার । ওই
গান সমাপ্তে পাঁচ কিশোর তাঁবুতে ফিরে এলো। প্রচুর গোলাবারদ ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঐদিন সন্ধ্য হয় ঠিক সেই মুহূর্তে শামীম মামা ও পাঁচ কিশোর নৌকায় উঠে বসল। নৌকা ছেড়ে দিল। বর্ষার নদীতে নৌকা উজানে চলছে। নদীতে প্রবল স্রোত । স্রোত ঠেলে নৌকা বেয়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে। প্রবল স্রোত অতিক্রম করে উজানে নৌকা বেয়ে যেতে সময় লাগবে অনেক । নদী দিয়ে নৌকা বেয়ে গেলে ছায়াতলী গ্রামে যেতে সময় কম লাগবে। কিন্তু খালের ভিতর দিয়ে যেতে সময় বেশী লাগবে। সরাসরি নদী দিয়ে গেলে সামনে হিজল ডাঙ্গা ব্রীজ। ওই ব্রীজে রাজাকার পাহারায় থাকে। ওই ব্রীজের নীচ দিয়ে কোন নৌকা গেলে রাজাকারেররা তল্লাসী করে। তল্লাসী করে মুক্তি বাহিনী ধরতে পারলে গুলি করে মেরে ফেলে অথবা পাকসেনা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সুতরাং নদী দিয়ে সরাসরি যাওয়া খুবই বিপদ জনক। এই বিপদের কথা ভাবতে ভাবতে শামীম মামা পাঁচ কিশোরের কাছে মতামত চাইল যে তারা কি সরাসরি নদী দিয়ে যাবে ? না ঘুরে খাল দিয়ে যাবে ? পাঁচ কিশোর দৃঢ় মনোবল সহকারে বলল যে, তারা নদী দিয়ে যাবে। এতে তাদের ভয়ের কিছু নেই। তারা রাজাকারদের সাথে কৌশলে যুদ্ধ করে তাদের হত্যা করে সরাসরি নদী দিয়ে ছায়াতলী গ্রামে চলে যাবে। তারা মুক্তি যুদ্ধের ট্রেনিং দেওয়ার পর ওই হিজল ডাঙ্গা ব্রীজের রাজাকারদের সাথে তাদের প্রথম যুদ্ধ হবে। এই যুদ্ধে তাদের জিত হবেই। তারা নৌকা বেয়ে নদী দিয়ে ব্রীজের দিকে যাচ্ছে। পাঁচ কিশোরের মধ্য হতে তেড়া মনি বলল যে, তারা ব্রীজের কাছাকাছি পৌছানোর কোয়াটার মাইল দূর হতে দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। নৌকার ভিতরে থাকবে শামীম মামা ও জাভেদ। মুরাদ, মাসুদ ও আমি থাকবো স্থল ভাগে। ডেবড়া জাভেদ ও শামীম মামা নৌকার ভিতরে থাকল। আর বাকি চার জন মুরাদ, মামুন, মাসুদ ও মনি চলে গেল নদীর তীর বেয়ে পাকা রাস্তার ওপরে । ডেবড়া মনি বিভিন্ন পশু পাখির ডাক অনুকরণ করতে পারে। শামীম মামা ও জাভেদকে মনি বলল যে সে যখন শিয়ালের ডাক দিবে তখন সকলে ফায়ার করা ও হাত বোমা নিক্ষেপ করা শুরু করবে রাজাকারদের প্রতি। মুরাদ , মামুন, মাসুদ ও মনি স্থল ভাগ হতে এবং নৌকার ভিতর হতে শামীম মামা ও জাভেদ এক যোগে যুদ্ধ শুরু করবে। শামীম মামা ও জাভেদের নৌকা নদীর মাঝামাঝি দিয়ে ব্রীজের কাছাকাছি এলে রাজাকারগণ নৌকা তীরে ভিড়াতে বলল। কিন্তু শামীম মামা ও জাভেদ তাদের নৌকা খুব ধীরে ধীরে বেয়ে তীরের কাছাকাছি এসে আর একে বারে তীরে আসতে চাচ্ছে না। তারা ডেবড়া মনির শিয়ালের ডাকের অপেক্ষা করছে। নৌকা তীরে ভিড়াচ্ছে না দেখে ব্রীজের দুই পাশের সকল রাজাকার শামীম মামা ও জাভেদের নৌকা সোজা সোজি তীরে নেমে এলো রাইফেল হাতে। সকল রাজাকার নদীর তীরে পানির কাছাকাছি একত্র হয়ে নৌকার যাত্রী শামীম মামা ও জাভেদকে উপরে উঠে আসতে বলছে। কিন্তু শামীম মামা ও জাভেদ তারা নৌকা হতে উপরে উঠে আসবে কিনা সে ব্যাপারে কোন শব্দ করছে না। চুপ করে বসে আছে। এদিকে মুরাদ , মাসুদ, মামুন ও মনি এই চার জনে রাজাকারদের অবস্থানের কাছাকাছি এসে রাস্তার ঢালে শুয়ে পড়ে পজিশন নিয়ে ক্রোলিং করে ধীরে ধীরে রাজাকারদের কাছাকাছি এলো। সব কয়টি রাজাকার নদীর তীরে এক স্থানে দাঁড়িয়ে নৌকার যাত্রীদের নৌকা তীরে ভিড়াতে বলছে কিন্তু নৌকা একে বারে তীরে আসছে না। ঠিক সেই মুহুতে ডেবড়া মনি হুবা হুব শিয়ালের অনুকরণে হুক্কা হুয়া করে ডেকে উঠল। এই শিয়ালের ডাক শুনে রাজাকার গন শিয়ালের ডাক মনে করে তাদের পিছনে ভ্রক্ষেপ করল না। শিয়ালের ডাক শুনার সাথে সাথে শামীম মামা মেশিন গানের গুলি করতে শুরু করল, জাভেদ হাত বোমা নিক্ষেপ করল পর পর কয়েকটি এবং মনি , মাসুদ , মুরাদ ও মামুন চার কিশোর রাজাকারদের পিছনের দিক হতে রাইফেল দিয়ে গুলি করল ও হাত বোমা নিক্ষেপ করল। এই হঠাৎ আক্রমনের জন্য রাজাকারা প্রস্তত ছিল না। সকল রাজাকার ঘটনা স্থলে নিহত হল। শামীম মামা ও পাঁচ কিশোর রাজাকারদের হত্যা করে নৌকায় করে ছায়াতলী গ্রামে ফিরে এলো। নৌকা এসে ছায়াতলী গ্রামে বনের ভিতর নদীর তীরে শ্বশ্মান ঘাটে এসে থামল। তখন রাত ৩টা। পাঁচ কিশোর ট্রেনিং দিয়ে যে অস্ত্র শস্ত্র ও গোলা বারুদ নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো । শামীম মামা আবার মুক্তি যোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্পে চলে গেল।
( ৪ )
মুক্তি যোদ্ধার ক্যাম্প হতে মাসুদ, মুরাদ, মনি, জাভেদ ও মামুন মুক্তি যোদ্ধার ট্রেনিং দিয়ে এসে ওদের ছায়াতলী গ্রাম,স্কুল ও বিভিন্ন ¯’ান ঘুরে ঘুরে দেখছে। কায়েকটি রাজাকারদের বাড়ি , শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ও কমিটির সদস্যদের বাড়ি ব্যতীত সকল বাড়ি ঘর রাজাকার গন লুট করে নিয়ে গিয়েছে। প্রত্যেক বাড়িতে শুধু ঘরের ভিত্তি বা পোতা পড়ে আছে। কোন বাড়িরই ঘরের মালামাল বেড়া ও চালা নেই। ওরা পাঁচ কিশোর ঘুরতে ঘুরতে ছায়াতলী গ্রামের মধ্য দিয়ে যে রাস্তা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান গফুর মাতুব্বরের বাড়ির সামনে দিয়ে বাজারের দিকে গিয়েছে সেই রাস্তায় এসে দাঁড়াল। রাস্তাটি কাঁচা । বর্ষা কাল বলে রাস্তাটি কাঁদাময়। এই রাস্তার উপর দিয়ে হাঁটার সময় একটু অশর্তক হলে পি”িছল খেয়ে পড়ে যেতে পারে। ওরা পাঁচ কিশোর দেখল শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান রাজাকার গফুর মাতুব্বর এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে। ফরমান তার মাথার উপর ছাতা ধরে রেখে তার সাথে হেঁটে আসছে। গফুর মাতুব্বরের বাড়ির িিদকে। গত তিন দিন ধরে বৃষ্টি ঝরার পর আজ রোদ উঠেছে। রোদের তাপ খুব বেশী। তিন দিনের বৃষ্টিতে রাস্তা কাঁদায় কাঁদায় পরিপূর্ণ এবং ভিষণ পিচ্ছিল। এই কাঁদাময় রাস্তায় গফুর মাতুব্বর ফরমানের হাত ধরে খুব কষ্টেশর্তকতার সাথে হেঁটে হেঁটে দুলে দুলে আসছে। মাঝে মাঝে কাঁদায় একটু আধটুকু পা পিছলে যা”েছ কিন্তু ফরমানকে ধরে আসছে বলে পড়ছে না। পড়ার উপক্রম হচ্ছে। রাজাকার গফুর মাতুব্বর যখন একটু পিচ্ছি খেয়ে পড়ে যেতে চায় তখন দূর থেকে দেখে মনে হয় তার ইয়া বড় মটকার মত ভুড়িটা , ভূমি কম্পে পাহাড় যেমন ভূমি কম্পে দুলে উঠে তেমনই দুলে উঠে । রাজাকার গফুর মাতুব্বরকে কাদাময় রাস্তা দিয়ে এমন ভাবে আসতে দেখে পাঁচ কিশোরের হাসি পাচ্ছিল। জাভেদ তো হাসি আটকিয়ে রাখতে না পেরে খিক করে হেসে দিল। মুরাদ তার হাত দিয়ে জাভেদের মুখ আটকিয়ে ধরে চুপ করতে বলল। রাজাকার গফুর মাতুব্ব্র ও যে কোন সময় পিচ্ছিল খেয়ে পড়ে যেতে পারে এমনই একটা ভাব যে কারণে সে ভয়ে ভয়ে পথ চলছিল। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার এমন এক জায়গায় এসে উপস্থিত হল যে, রাস্তার এই স্থানটিতে রাস্তার দু’পাশেই গভীর ডোবা। এই স্থানে রাস্তার পার্শ্ব হতে ডোবার পাড় পর্যন্ত খাড়া ও খুব ঢালু এবং খুবই পিচ্ছিল । এই স্থাানে এসে রাজাকার গফুর মাতুব্বর ফরমানকে সহ পিচ্ছিল খেয়ে ডোবার ভিতরে পড়ে গেল। ওরা পাঁচ কিশোর দূর হতে দেখল যে, রাজাকার গফুর মাতুব্বর পিচ্ছিল খেয়ে পড়ার সময় মনে হল যেন একটি পাহাড় গড়িয়ে পড়ছে ডোবার ভিতর। ডোবার ভিতর তেমন অথৈ পানি নয়। রাজাকার গফুর মাতুব্বর ও ফরমান জড়াজড়ি করে ডোবার ভিতরে পড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়াল
ডোবার পানির ভিতর । তাদের বুক পানি সে ডোবায়। রাজাকার গফুর মাতুব্বর ও ফরমানকে এভাবে পড়ে যেতে দেখে ওরা পাঁচ কিশোর তো হাঁসতে হাঁসতে আটখানা। হাঁসা থামিয়ে দেখল এখন লোকজন কেহ আসেনি। রাজাকার গফুর মাতুব্বর ও ফরমান যে ডোবায় পড়ে গিয়েছে। তার অপর পাশে একটি
ছাতিম গাছ আছে। সে গাছটি ডাল পালা ও ঘন পাতা দিয়ে এমন ভাবে আবৃত যে সে গাছে কেহ বসে থাকলে সহজে কেহ তাকে দেখতে পাবে না। ডেবড়া মনির গিয়ে উঠল সেই গাছের মাথায়। সেই গাছের
মাথায় বসে মনির রাজাকার গফুর মাতুব্বরের মাথায় গুলতি দিয়ে একটি গুলি করল। রাজাকার গফুর মাতুব্বর চার দিকে তাকিয়ে দেখল কাউকে সে দেখতে পেল না। ডান হাত দিয়ে মাথা ডলতে ডলতে ফরমানকে বলল,
ঃ দেখতো ফরমান ঢিল মারে কে ?
ঃ চার দিকে তাকিয়ে কাউকে তো দেখতে পাচ্ছি না।
ইহা বলার সাথে সাথে ফরমানের মাথায় মনির গুলতি দিয়ে একটি গুলি
করল। ফরমানের গুলি লেগে আঘাত পাওয়াতে উহু করে উঠে রাজাকার গফুর
মাতুব্বরের দিকে ভিতু চোখে তাকিয়ে বলল, ‘ হুজুর আবারো
আমাদের তাল গাইছ্যা ভূতে ধরেছে । তাড়াতাড়ি এখান থেকে পালান। চলেন যাই।’
রাজাকার গফুর মাতুব্বর ডোবার পাড় বেয়ে উঠতে গেল কিন্তু পারল না। পিচ্ছিল খেয়ে পড়ে গিয়ে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে রাজাকার গফুর মাতুব্বর ফরমানকে বলল,
ঃ ফরমান তালগাছ কি আমাদের আশে পাশে আছে ?
ঃ না,হুজুর। তবে ওই দিন তাল গাছের নীচ হতে যে ভূত আমাদের ধরে ছিল
তা আমাদের ছেড়ে যায়নি হুজুর । আমাদের সাথেই আছে। সেই ভূত
আবার আমাদের জ্বালতন করছে। ঐ ভূত কিন্তু হুজুর মানুষকে একা পেলে
ঘাড় ভেঙ্গে রক্ত খায়। আমার কিন্তু‘ হুজুর ভিষণ ভয় করছে কখন যেন আমার ঘাড়
ভেঙ্গে রক্ত খায় । হুজুর আমি কি তা হলে মরে যাব! ইহা বলার সাথে সাথে রাজাকার গফুর মাতুব্বর ভয়ে ফরমানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,

ঃ আমাকে ছেড়ে তুই যাসনে কিন্তু ভাই ? তা হলে ভূত আমার ঘ্ড়া ভেঙে রক্ত খাবে। আমি কিন্তু মরে যাব! আমি মরে গেলে পাকিস্তান রক্ষা করবে কে? আর পাকিস্তান রক্ষা না পেলে আমাদের ক্ষমতা থাকবে না। আমি না থাকলে এই মুক্তি বাহিনী হত্যা করবে কে? আমাকে বাঁচা ফরমান !
আমাকে বাঁচা ফরমান!! (এ কথা বলে রাজাকার গফুর মাতুব্বর হাঁউ মাঁউ করে কেঁদে দিল)। এই কথা বলা শেষ হওয়ার সাথে সাথে মনির ছাতিম গাছের মাথায় বসে আরো একটি গুলি করল তার গুলতি দিয়ে রাজাকার গফুর মাতুব্বরের ভুঁড়ির উপর। রাজাকার গফুর মাতুব্বর তার ইয়া বড় ভূঁড়িতে ডান হাত
দিয়ে ডলতে ডলতে বলল,
ঃ এই দেখো আবারো আমাকে ঢিল মেরেছে তাল গাইছ্যা ভূতে । ফরমান
আমাকে বাঁচা ! বাঁচা!! বাঁচা !!!
ঃ হুজুর আপনাকে বাঁচানোর উপায় একটি পেয়েছি হুজুর ।
ঃ কি উপায়? তাড়াতাড়ি বল ফরমান !
ঃ আমাদের গ্রামের উত্তর পাড়ায় এক ঝাঁটা ফকির আছে। ঐ ফকির দিযে
ভূত তাড়াতে হবে।
ঃ এই ডোবা হতে উঠে ভূত তাড়ানোর ব্যবস্থা র্ক ।
ইতি মধ্যে রাজাকার গফুর মাতুব্বরের বাড়িতে খবর গেলে তাকে ডোবার পানি হতে উঠানোর জন্য লোক জন এলো। অনেকে হাত ধরে টানা টানি করে উঠানোর চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। যেই তার হাত ধরে টান দেয় সেই পানিতে পড়ে যায়। কারণ ইয়া বড় মটকার মত ভুঁড়ি ওয়ালা দানবের মত মানুষটিকে টেনে তোলা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি তাকে টান দিয়ে তুলতে যায় সেই পানিতে পড়ে যায়। ফরমান রাজাকার গফুর মাতুব্বরকে বলল,
ঃ হুজুর আমি উপরে গিয়ে আপনাকে তোলার ব্যবস্থাা করি।
এই কথা শুনে রাজাকার গফুর মাতুব্বর ভয়ে জড়িয়ে ধরে বলল,

ঃ না না তুই যাবি না। আমাকে একা পাইলে তাল গাইছ্যা ভূতে ঘাড় মটকাইয়া রক্ত খাবে। তুই যাইস না ফরমান। তুই আমার জোড়ের ভাই। তুই আমাকে বাঁচা ! তুই আমাকে বাঁচা!!

রাজাকার গফুর মাতুব্বর যেহেতু ফরমানকে যেতে দিচ্ছে না, তাই ফরমান ডোবার পানির মধ্যে থেকে ডোবার উপরে যারা রাজাকার গফুর মাতুব্বরকে ডোবা থেকে তোলার জন্য এসেছে তাদের বলল যে, রাজাকার গফুর মাতুব্বরের মাজায় ও দু’বাহুর বোগল তলা দিয়ে বুকের উপর দড়ি বেঁধে টেনে তুলতে । ফরমানের কথা মত সকলে সেই ব্যবস্থা করে রাজাকার গফুর মাতুব্বরকে টেনে উপরে তোলার জন্য দড়ি বেঁধে যেই টান দিয়ে বলল, ‘ পৃথিবীর সেরা মটকা উঠুক এবার হেইও ! উঠুক এবার হেইও !!
’ ইহা বলার সাথে সাথে দড়ি ছিঁড়ে রাজাকার গফুর মাতুববর আবার ডোবার মধ্যে পড়ে গেল। ইহার পর ইহার চেয়ে মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে তুলল।
ডোবা থেকে তোলার পর রাজাকার গফুর মাতুব্বর তিন দিন বিশ্রাম নিয়ে সুস্থ হলে উত্তর পাড়ার ঝাঁটা ফকিরকে ডেকে আনা হল রাজাকার গফুর মাতুব্বরের ঘাড় হতে ভূত তাড়ানোর জন্য । ঝাঁটা ফকির এসে
রাজাকার গফুর মাতুব্বরের বাড়ির উঠানের মাাঝখানে সকলকে গোলাকার বৃত্ত এঁকে তার মাঝে রাজাকার গফুর মাতুব্বরকে জোড় আসন করে বসিয়ে তার মুখের সামনে একটি বড় মাটির মালসার ভিতরে মরিচ
পোড়া দিয়ে তার মুখে ধোয়া দিচ্ছে আর মন্ত্র পড়ে তার মুখে ‘ ফুঁ ’ দিচ্ছে ঝাঁটা ফকির । মুখে মরিচ পোড়া ধোয়া দেওয়া শেষ করে আবার ঝাঁটা ফকির উচ্ছ স্বরে জোরে জোরে কয়েক বার মন্ত্র পাঠ করে রাজাকার
গফুর মাতুববরকে ঝাঁটা দিয়ে আঘাত করে ঝাঁড়তে লাগল আর বলতে লাগল ,‘ যন্ত্রর মন্ত্রর তন্ত্রর কামাখার গারং ইদাদুং পিতৃতিং দূর করে দে তাল গাইছ্যা ভূত মাতুব্বরের ঘাড় হতে। যা দূর হয়ে যা । এ গ্রাম
ছেড়ে অন্য গাঁয়ে যা । ’ ঝাঁটার আঘাত সহ্য করতে না পেরে রাজাকার গফুর মাতুব্বর তার মটকার মত ভূঁড়ি নিয়ে দিল ভোঁ- দৌড়। মটকার মত ভুঁড়ি নাচতে লাগল। সে দৌড় দেখে সকলের হাঁসতে হাঁসতে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হল। চলবে…