ধূমপানে নিষেধ করায় বাস ভাঙচুর ।। রাবিতে ছবি তোলায় সাংবাদিককে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর মারধর

আপডেট: জুলাই ১১, ২০১৭, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ

রাবি প্রতিবেদক


বহিস্কৃত বিজয় ও কানন-সোনার দেশ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের এক নেতাকে বাসের মধ্যে ধূমপান করতে নিষেধ করায় বাসের ড্রাইভার ও সুপারভাইজারকে মারধর এবং বাসটিতে ভাঙচুর করেছে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। বাস ভাঙচুরের ছবি তুলতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এক সাংবাদিককে বেধড়ক মারধর করে ওই ছাত্রলীগ নেতাকর্র্মীরা। গতকাল সোমবার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে রাজশাহী-ঢাকা মহসড়কে এ ঘটনা ঘটে।
মারধরের শিকার আরাফাত রহমান ইংরেজি দৈনিক ‘ডেইলি স্টার’-এর রাবি প্রতিনিধি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয়বর্ষের শিক্ষার্থী। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে তিনি চিকিৎসাধীন।
মারধরকারীরা হলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি আহমেদ সজীব, সাংগঠনিক সম্পাদক আবিদ আহসান লাবন ও আইন বিষয়ক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বিজয়সহ কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ‘দেশ ট্রাভেলস’র একটি বাস (ঢাকা মেট্রো ব-১১-১৩০১) বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে পৌঁছালে ছাত্রলীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বিজয় বাস থেকে নামেন। এসময় বিজয়, সজীব ও লাবনের নেতৃত্বে সেখানে লাঠিসোটা নিয়ে অপেক্ষা করা ছাত্রলীগের ১০/১২ জন নেতাকর্মী বাসটি ভাংচুর করতে থাকেন। ওই ঘটনার ছবি তুলছিলেন সাংবাদিক আরাফাত রহমান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আরাফাতের ওপর চড়াও হয় ছাত্রলীগ নেতারা। তাদের বেধড়ক মারধরে আরাফাত মাটিয়ে পড়ে যান। তার চোখ ও মাথায় ঘুষি-লাথি মারে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। প্রথমে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্র ও পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়।
আহত সাংবাদিক আরাফাত রহমান বলেন, ‘আমি ছবি তুলছিলাম দেখে প্রথমে দুজন এসে আমাকে চড় দেয়। আমি নিজের পরিচয় দেবার পরও সেখানে আরো কয়েকজন মিলে আমাকে মারতে থাকে।’
‘দেশ ট্রাভেলস’-এর রাজশাহীর ইনচার্জ মাসুদ রানা অভিযোগ করেন, ‘বিজয় নামে একটি ছেলে রোববার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম থেকে এফ-১ সিটে ওঠেন রাজশাহী আসার জন্য। পথিমধ্যে বিজয় বাসে ধূমপান করতে থাকলে সুপারভাইজারের তাকে বাধা দেন। এসময় তাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই সুপারভাইজারকে শায়েস্তা করার হুমকিও দেয়। পরে বাসটি ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকে পৌঁছালে তিনি বাস থেকে নামেন এবং সেখানে অবস্থানরত তার কয়েকজন বন্ধু মিলে বাস ভাংচুর করেন। এসময় বাসের ড্রাইভার ও সুপারভাইজারকেও মারধর করেন।’
এ বিষয়ে ছাত্রলীগ নেতা সাইফুল ইসলাম বিজয় বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে আসার সময় সিগারেট খাওয়া নিয়ে সুপারভাইজার খুব বাজে ব্যবহার করেন। আমি তখন বলি, ‘নিষেধ করলেও তো ভালোভাবে নিষেধ করতে পারেন।’ এসময় সে আরো বেশি উত্তেজিত হয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলতে থাকে। সারারাত জার্নি করায় অসুস্থ বোধ হচ্ছিলো। তাই কয়েকজন ছোটভাইদের প্রধান ফটকে আসতে বলি। কিন্তু সেই সুপারভাইজার প্রধান ফটকে এসে আমাকে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ছোটভাইয়েরা এবং সেখানে উপস্থিত সাধারণ শিক্ষার্থীরা বাস ভাংচুর করেন।’ সাংবাদিক মারধরের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।
মারধরকারী আরেক ছাত্রলীগ নেতা আহমেদ সজীব বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাসের সুপারভাইজারের ঝামেলা হয়। খবর পেয়ে আমরা সেখানে যাই। সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হয়ে ভাঙচুর করে।’ সাংবাদিককে মারধরের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেন। অন্যদিকে লাবনের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া প্রথমে অস্বীকার করে পুলিশ কনস্টেবল সাংবাদিককে মেরেছে বললেও পরে বক্তব্য পাল্টে বলেন, ‘ঘটনার সাথে যদি ছাত্রলীগের কেউ জড়িত থাকে তবে খোঁজ-খবর নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
এ বিষয়ে পুলিশের মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মাহবুব হাসান বলেন, ‘কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী বাস ভাংচুর করেন। পরে এক সাংবাদিককেও পেটান। পরে পুলিশ সেখানে অবস্থান নেয়। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক।’
এদিকে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকরা। রাবি সাংবাদিক সমিতি, রাবি রিপোর্টার্স ইউনিটি এবং রাবি প্রেস ক্লাব আলাদা আলাদা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মারধরের ঘটনায় নিন্দা প্রকাশ করে অতি দ্রুত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের আসামী করে মতিহার থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন রাবি রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি কায়কোবাদ আল মামুন খান।
পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিক রাবির ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি আরাফাত রাহমানের উপর মাহলার প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে, রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি (আরসিআরইউ) সভাপতি শামসুননাহার সুইটি ও সাধারণ সম্পাদক এম ওবাইদুল্লাহ। তারা সাংবাদিকের উপর হামলায় দোষীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবি করেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ