নওগাঁয় এসি-ল্যান্ডের বিরুদ্ধে ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ

আপডেট: জানুয়ারি ১৭, ২০২৪, ১২:২৯ অপরাহ্ণ


আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি:


নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার সহকারি কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের বিরদ্ধে ক্ষমতাঅপব্যবহারের অভিযোগ করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ : সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার এবং জাল দলিলের মাধ্যমে জমি খারিজ (নামজারি) করার অভিযোগ উঠেছে।
সহকারি কমিশনার (ভূমি) জেলা শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে রাণীনগর অফিসে প্রতিদিন যাতায়াত এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যবহার করছেন সরকারি গাড়ি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিসিএস ৩৬তম ব্যাচের মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান সহকারি কমিশনার (ভূমি) হিসেবে রাণীনগর উপজেলায় যোগদান করেন ২০২১ সালের ১৮ অক্টোবর। যোগদানের পর থেকে তিনি পরিবার নিয়ে রাণীনগর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে নওগাঁ শহরের মুক্তির মোড়ের দেওয়ান ভিলা নামক বহুতল ভবনের ৬ তলায় ভাড়ায় বসবাস করে আসছেন।

তিনি উপজেলায় যোগদানের পর থেকে কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য সরকারের প্রদান করা নওগাঁ-ঠ-১১-০০৪৯ নাম্বারের সাদা রঙের একটি গাড়ি ব্যবহার করে আসছেন। অথচ ২০১৭ সালে ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. মনিরুজ্জামান মিঞা স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে (স্মারক নং-৩১.০০.০০০০.০৪৬.৬৮.০২৮.১৫(অংশ).৭৭০ এবং তারিখ: ০১-১১-২০১৭) জানানো হয় যে, ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন সহকারি কমিশনার (ভূমি)/রাজস্ব সার্কেলের অনুকূলে বরাদ্দকৃত ডাবল কেবিন পিকআপ গাড়িটি শুধুমাত্র সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।

কিন্তু সরকারি যানবাহন ব্যবহারের নীতিমালা অনুসারে একজন কর্মকর্তাকে অবশ্যই তার ক্যাম্পাসের মধ্যে কিংবা কর্মস্থলের অদূরে বসবাস করতে হবে। এছাড়া কোন কর্মকর্তা সরকারি গাড়ি অবশ্যই রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে শুধুমাত্র তার কর্মস্থলের এলাকার মধ্যেই ব্যবহার করতে পারবেন। নিয়ম রয়েছে সরকারি কাজ ছাড়া উপজেলার বাইরে গাড়ি নিয়ে যেতে হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও সংশি¬ষ্ট কারণ থাকতে হবে। এমন বিধি নিষেধ থাকলেও বছরের পর বছর সহকারি কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান সরকারের নিয়মের তোয়াক্কা না করে নিজের পারিবারিক কাজেও সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে আসছেন।

এছাড়া উপজেলা ভূমি অফিস বর্তমানে দুর্নীতি আর অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অর্থের বিনিময়ে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে একজনের জমি অন্যের নামে খারিজ করার একাধিক ঘটনা উপজেলায় ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি করেছে। অর্থ না দিলে সহজে জমি খারিজ হয় না এবং অর্থ না দিলে নামজারি হয় না। অর্থ না দিলে কিংবা অফিসে থাকা দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ না করলে জমি সংক্রান্ত মামলার ফাইলে দিনের পর দিন নম্বরও পড়ে না- এমন অভিযোগ একাধিক সেবাগ্রহিতার। এই অফিসে মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের যোগদানের পর থেকে বিভিন্ন অনিয়ম আর দুর্নীতির পরিমাণ অনেকটাই বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন বিভিন্ন সময়ে অফিসে সেবা নিতে আসা সেবা গ্রহিতারা।

সম্প্রতি একটি প্রতারক চক্রের মাধ্যমে উপজেলা ভূমি অফিসে মিথ্যা তথ্য দিয়ে জাল দলিলের মাধ্যমে জমি খারিজ (নামজারি) করে দেয়ার অভিযোগটি ব্যাপক আলোনার জন্ম দেয়। আব্দুল কুদ্দুসের নামে নামজারি করা খারিজের পর ওই জমি দখলে নেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এই ঘটনায় জমির ওয়ারিশ ও ক্রয়সূত্রে ৫ জন মালিক একযোগে আব্দুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে জাল দলিলের মাধ্যমে তথ্য গোপন করে এবং ভূয়া তথ্য দিয়ে জমি খারিজ করে নেয়ার অভিযোগ এনে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর অভিযোগ প্রদান করেছেন।

ডিজিটাল যুগের এমন ডিজিটাল জালিয়াতির ঘটনায় ইউনিয়ন ও উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মকান্ড নিয়ে সাধারণ মানুষদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও ভীতির সঞ্চার হয়েছে।
জাছের আলীসহ কয়েকজন জানান, আমরা রাণীনগর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সম্প্রতি আব্দুল কুদ্দুসের ৬৮১৫ নম্বর দলিলের জাবেদা কপি (নকল) তুলে দেখি জাবেদার সাথে কুদ্দুসের দলিলের কোনো মিল নেই। দলিলের দাতা, গ্রহীতা, মৌজা এমনকি জমিরও কোনো মিল পাওয়া যায়নি। এছাড়া কুদ্দুসের ৬৩৬০ নম্বর দলিল রেজিস্ট্রি অফিসে পাওয়া যাচ্ছে না।

তারা বলেন, একটি প্রতারক চক্রের মাধ্যমে আব্দুল কুদ্দুস জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে আমাদের জমির খতিয়ানের দুই মালিক সফেজান বিবি এবং মছিরন বিবিকে দাতা বানিয়ে এবং কুদ্দুস নিজে গ্রহীতা সেজে দু’টি জাল দলিল তৈরি করেছেন। সেই দু’টি জাল দলিল দিয়ে আমাদের প্রায় ৮শতাংশ জমি কুদ্দুস ভূমি অফিস থেকে খারিজ করে নিয়েছে। এ ঘটনায় আমরা ওই খারিজ বাতিলসহ কুদ্দুসের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।

অভিযুক্ত আব্দুল কুদ্দুসের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, উপজেলার খাগড়া গ্রামের মৃত-মমিন সরদারের ছেলে হাফিজুর রহমান হাফিজ সম্পর্কে আমার শ্যালক (বউয়ের ভাই) হয়। শ্যালক হাফিজ টাকার বিনিময়ে আমাকে এই কাজ করে দিয়েছে। এর চেয়ে আমি আর বেশিকিছু জানি না। কোথায় কী করতে হয়েছে তার সবকিছু হাফিজ করেছে এবং সবকিছু সে জানে।

এই বিষয়ে হাফিজুর রহমান হাফিজ জানান, আব্দুল কুদ্দুস সম্পর্কে আমার ফুফাতো দুলাভাই। সেই সূত্রে ওই এলাকায় আমার যাওয়া-আসা। কুদ্দুস দুলাভাই আমার কাছে জমির খারিজ করার কাজে সহযোগিতা চেয়েছিলো বলেই আমি তাকে একটু সহযোগিতা করেছি মাত্র। আমার কোনো চক্র নেই। আমি জমি সংক্রান্ত কোনো বিষয়ই তেমন জানি না। একটি কুচক্রি মহল আমাকে সামাজিক ভাবে হেয় করার জন্য আমার বিষয়ে এমন মিথ্যে অভিযোগ তুলেছে।

এই বিষয়ে সহকারি কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান মুঠোফোনে জানান, আমার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ মিথ্যা। এই কথা বলেই তিনি লাইন কেটে দেন।
জেলা প্রশাসক মো. গোলাম মওলা মুঠোফোনে জানান ওই এসি-ল্যান্ডের স্ত্রী পেশায় একজন চিকিৎসক হওয়ার কারণে তাকে নওগাঁ শহরে থাকতে হয়। তাই হয়তো বা সরকারি গাড়িটি একটু ব্যবহার করে। তবে আমি তাকে নিষেধ করে দিবো।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ