নওগাঁয় মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরি পেলেন ১৮১ তরুণ-তরুণী

আপডেট: মার্চ ২৩, ২০২৪, ৯:৪০ অপরাহ্ণ

নওগাঁ ও বদলগাছী প্রতিনিধি:সরকারি চাকরি নামক সোনার হরিণ পেতে গেলে করতে হবে তদবির। গুনতে হবে কারিকারি টাকা। লাগবে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত মামা-খালু বা আত্মীয়-স্বজনের সুপারিশ। সহায় সম্বল বিক্রি কিংবা সংসারের জমানো অর্থ দিয়ে কর্তাব্যক্তিদের করতে হবে ম্যানেজ। কিন্তু এবার দেশের সীমান্তবর্তী বরেন্দ্র অঞ্চলের জেলা নওগাঁয় জনমনে এ ধারণা পাল্টেছে। সম্প্রতি মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে জেলার রাজস্ব প্রশাসনে ১১৬ জন এবং পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগ পেয়েছেন ৬৫ জন তরুণ-তরুণী। কাজে আসেনি কোনোই যোগাযোগ (তদবির)।

হয়নি অর্থের লেনদেনও মেধা ও যোগ্যতার। আর স্বচ্ছতার সাথে এসব নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জেলাজুড়ে প্রশংসায় ভাসছেন নওগাঁর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট গোলাম মওলা এবং পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রাশিদুল হক। নিয়োগে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন অনেক দরিদ্র পরিবারের স্বপ্নবাজ ছেলে-মেয়ে। এসব নিয়োগে এমনিতেই নানা অনিয়মের খবর মুখরোচক হিসেবে সমাজে প্রচলিত রয়েছে। তবে স্বচ্ছতার সাথে নিয়োগ হবে তা ছিলো কল্পনাতীত।

নওগাঁ জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার রাজস্ব প্রশাসনে ১৫ ও ১৬ তম গ্রেডে ৯টি ক্যাটাগরিতে ড্রাফটসম্যান, নাজির কাম-ক্যাশিয়ার, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার-মুদ্রাক্ষরিক, ক্রেডিট চেকিং কাম সায়রাত সহকারী, সার্টিফিকেট পেশকার, সার্টিফিকেট সহকারী, মিউটেশন কাম সার্টিফিকেট সহকারী, ট্রেসার ও কার্যসহকারী পদে মোট ৩৭টি শূণ্য পদে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ।

এতে ৬ হাজার ৭৭২ জন চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেন। এরমধ্যে লিখিত পরীক্ষায় ৩ হাজার ৪২ জন অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে উত্তীর্ণ হন ১০৬ জন। এরপর ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষে গত ১২ ও ১৩ মার্চ রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে মৌখিক পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে মোট ৩৩ জনকে সাতটি ক্যাটাগরিতে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। সরকারি নিয়ম-নীতি মেনে দ্রুত সুপারিশপ্রাপ্তদের পদায়ন করা হবে। এতে ট্রেসার ও কার্যসহকারী পদে যোগ্যপ্রার্থী না থাকায় ৩টি পদে কাউকে সুপারিশ করা হয়নি।

এছাড়াও ২০ তম গ্রেডে তিনটি ক্যাটাগরিতে অফিস সহায়ক, নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মোট ৮৩টি পদে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে নিয়োগের জন্য ৮৩ জনকে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করে সংশ্লিষ্টরা। সুপারিশপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা, উপজেলা ভূমি অফিস ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পদায়ন করা হয়েছে।

এদিকে, জেলার রাজস্ব প্রশাসনে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর গত ৫ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসনের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিষয়ে একটি লেখা পোস্ট করেন জেলা প্রশাসক মো. গোলাম মওলা। মুহূর্তের মধ্যেই পোস্টটি সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে ভাইরাল হয়। সেখানে মন্তব্যের ঘরে জেলা প্রশাসনের প্রশংসায় মেতে ওঠেন অনেকেই। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগের এই ধারা অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন নওগাঁবাসী।

এছাড়া গত ১৩ মার্চ জেলা প্রশাসনের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে জেলা-প্রশাসক মো. গোলাম মওলার দেওয়া একটি পোস্ট থেকে জানা যায় যে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি প্রশাসনের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষায় যারা চূড়ান্ত ফলাফলে নিয়োগ পেয়েছিলো, মেধা ও যোগ্যতার তাদের মধ্যে তিনজন যোগদান না করায় অপেক্ষামান তালিকা থেকে প্রথম তিনজনকে সন্তোষজনক পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং সেই পোস্টে প্রার্থীদের রোল, নাম ও ঠিকানাও প্রকাশ করা হয়।

অপেক্ষমান তালিকার মেধাক্রমের প্রথমে থাকা অফিস-সহায়ক পদে সুপারিশ পাওয়া প্রার্থী মো. ছুফি উল্লাহ তানভীর নওগাঁ সদর উপজেলার মাদরাসা পাড়া এলাকার আমান উল্লাহের ছেলে মোবাইল ফোনে অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, যেখানে সবচেয়ে ছোট পদের কোন সরকারি চাকরি পেতে লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয় সেই সময়ে এসে আমার মতো একজন দরিদ্র ঘরের ছেলে বিনা টাকায় মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরি পাবো তা কখনোও স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। প্রথমেই শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি মহান আল্লাহর দরবারে আর তারপরেই জেলা প্রশাসক মো. গোলাম মওলা স্যারের প্রতি দোয়া ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি যার সততার কারণে আজ আমি দুবেলা দুমুঠো অন্ন যোগানোর একটি সৎ পথ উপহার পেলাম। আমি যতদিন এই চাকরিতে থাকবো ততদিন দেশের সেবা এবং মানুষের উপকার করার মধ্য-দিয়ে এমন দুর্লভ উপহারের সঠিক ব্যবহার করার চেষ্ঠা করবো ইনশাল্লাহ।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. গোলাম মওলা বলেন, আমি আমার নীতিতে অটল থেকে সম্পন্ন স্বচ্ছতার ভিত্তিতে চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পেরেছি বলে মহান আল্লাহ কাছে লাখো কোটি শুকরিয়া আদায় করছি। এছাড়া শত তদবির ও বাধা-বিপত্তির মধ্যেও সঠিক পন্থায় মেধা ও যোগ্যতার প্রার্থীদের মূল্যায়ন করতে পেরেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করছি। আমি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়ার পর থেকেই প্রচার করেছি যে শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে। কেউ যেনো মিথ্যে প্রলোভনের প্রতারণার শিকার না হয়। অযথা তদবিরের পেছনে না ছুটে, সবাইকে লেখাপড়া করার পরামর্শ দিয়েছি। শেষ পর্যন্ত আমি আমার কথা রাখতে পেরেছি। আমি যতদিন এই জেলায় রয়েছি ততদিন শত-ভাগ মেধার ভিত্তিতে চাকরী দেয়া হবে বলে জানান তিনি।

তিনি আরো জানান, বর্তমানে সরকারি চাকরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এসেছে। অধিকাংশ চাকরীর ক্ষেত্রেই মেধার মূল্যায়ন করা হচ্ছে। একসময় দেশের সর্বোচ্চ চাকরি পেতেও ঘুষের প্রচলন ছিলো কিন্তু এখন তা আর নেই। বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে অনেক দিনমজুর, খেটে খাওয়া গোছের পরিবারের সন্তানরাও মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বড় বড় সরকারি চাকরি পাচ্ছে। দিন যতই যাবে ততই স্বচ্ছতার মাধ্যমে মেধার ভিত্তিতে চাকরি প্রদানের রেওয়াজ প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই আগামীতে যারা চাকরী প্রত্যাশী তারা অবশ্যই তদবিরের পিছনে না ছুটে এখন থেকেই মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করার পরামর্শ প্রদান করেন জেলা প্রশাসক মো. গোলাম মওলা।

অপরদিকে, নওগাঁর পুলিশ সুপারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় দুই হাজার ২৩১ জন প্রার্থী। প্রথম ধাপে শারীরিক, দ্বিতীয় ধাপে দৌঁড়, পুশআপ, লং ও হাই জাম্প এবং তৃতীয় ধাপে দৌঁড়, ড্রাগিং ও রোপ ক্লাইম্বিং পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে উর্ত্তীন হন ৫৪৫। গত ৬ মার্চ চর্তুথ ধাপে লিখিত পরীক্ষায় ২২০ জন উর্ত্তীণ হয়। যেখানে চূড়ান্তভাবে মৌখিক পরীক্ষায় ৬৫ জন নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়।

নওগাঁ সদর উপজেলার হাঁপানিয়া ইউনিয়নের চকতাতারু গ্রামের চা বিক্রেতার মেয়ে শ্রাবন্তী বানু তার অনুভূতি ব্যক্ত করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ছোট থেকেই স্বপ্ন ছিলো পুলিশে চাকরি করার। বান্ধবিদের কথায় পুলিশের নিয়োগে ১২০ টাকা খরচ করে আবেদন করেছিলাম। যে দোকান থেকে আবেদন করেছিলাম, অনেকেই বলেছিল এসব নিয়োগে অনেক টাকা লাগে। এতে মন ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু তারপরও মেধা ও যোগ্যতার মনোবল হারাইনি। অবশেষে সব পরীক্ষায় সফলতার সাথে উর্ত্তীণ হয়ে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। না কারো সুপারিশের দরকার হয়েছে, না কোনো টাকা লেগেছে।’

শ্রাবন্তীর মতো অনেক দরিদ্র পরিবারের স্বপ্নবাজ ছেলে-মেয়ের নাম পুলিশ ও জেলার রাজস্ব প্রশাসনে নিয়োগ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে। যারা আসলে কল্পনা করতে পারেনি এতো সহজে নিয়োগ হবে। সরকারি নিয়োগে এমনিতেই নানা অনিয়মের খবর মুখরোচক হিসেবে সমাজে প্রচলিত রয়েছে। তবে  মেধা ও যোগ্যতারস্বচ্ছতার সাথে নিয়োগ হবে তা ছিলো কল্পনাতীত। অনেকের কাছে এ নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বপ্নের মতো।