নওগাঁর রানীনগরে কিশোরকে বর্বর নির্যাতন

আপডেট: আগস্ট ২৮, ২০১৭, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

নওগাঁ প্রতিনিধি


চুরির অপবাদ দিয়ে দুই পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুলে সুঁচ ঢুকিয়ে, পায়ের পাতায় সুঁচ ফুটিয়ে ও দড়ি দিয়ে বেঁধে প্রায় ১৬ ঘন্টা ধরে দফায় দফায় মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বর নির্যাতন চালানো হয়েছে ১৫ বছরের কিশোর শরিফুল ইসলামের ওপর। এছাড়া পুরো শরীরে মারাত্মক জখম ও আঘাতে চিহ্ন রয়েছে। পা ধরে অনুনয় বিনয় করার পরও তাকে ছাড়ে নি। কিশোর শরিফুল ইসলামের বাড়ি নওগাঁর রানীনগর উপজেলার কালিগ্রাম ইউনিয়নের কালিগ্রামের মুন্সিপাড়ায়। সে ওই  এলাকার প্রবাসী জামাল উদ্দিন আকন্দের ছেলে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও কিশোরকে উদ্ধার না করেই থানায় ফিরে আসে। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসী পুলিশের এ বিষয়টিকে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে বলে মনে করেন। শরিফুল নওগাঁ সদর হাসপাতালে অর্থোপেডিক বিভাগে শিশু ওয়ার্ডের ৩৬ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে শরিফুল ইসলাম বাড়িতে শুয়ে ছিল। এ সময় প্রতিবেশী আবদুুল খালেক কাজ আছে বলে শরিফুলকে তার বাড়িতে ডেকে নিয়ে যায়। শরিফুলকে তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেয়। এরপর হাজী আক্কাস আলী, তার ছেলে জিয়ারুল ও টিপুকে বাড়িতে ডেকে নেয় খালেক। খালেক টাকা চুরির অপবাদ দিয়ে শরিফুলের বাম ডানায় লাঠি দিয়ে আঘাত করে। এরপর গলায় গামছা পেঁচিয়ে ৪-৫ মিনিট ধরে টানা হেচড়া করে এবং শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করে। শরিফুলের দুই হাত পিঠ মোড়া করে দড়ি দিয়ে বেঁধে চারজন মিলে লাঠি দিয়ে নির্যাতন করে। এ সময় শরিফুল চিৎকার চেঁচামেচি করায় কৌশলে তারা শরিফুলকে বাড়ির পাশের একটি জঙ্গলের ধারে নিয়ে যায়। এরপর সেখানে কয়েক দফা নির্যাতন চালানো হয়। প্রতিবেশিরা বিষয়টি বুঝতে পেরে তাদেরকে মারপিট করতে জন্য নিষেধ করে। এ বিষয়টি শরিফুলের  মা আয়েশাকে জানানো হলে তিনি ছুটে যান সেখানে। খালেক ও তার সহযোগীদের হাত পা ধরে তার ছেলের ওপর  নির্যাতন বন্ধ করতে অনুরোধ করেন তিনি। তাতেও থামে নি খালেকরা। এরপর রাত ৮টার দিকে তিনি থানা পুলিশে সংবাদ দেন। পুলিশের এসআই শফিকুর রহমান ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর শরিফুলকে উদ্ধার না করে রহস্যজনক ভাবে থানায় ফিরে যান তিনি। রাতে শরিফুলকে খালেকের বাড়িতে রাখা হয় এবং আবারও নির্যাতন চালানো হয়। পরদিন গত শনিবার সকালে শরিফুলের মা আয়েশা থানায় আসেন এবং পুলিশের কাছে কান্নাকাটি করেন। সারাদিন গেলেও কোন পদক্ষেপ নেয়া হয় নি। অবশেষে রাত ৮টার দিকে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শরিফুলকে উদ্ধার করে এবং রানীননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এ সময় ঘটনার মুল হোতা খালেককে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। উন্নত চিকিৎসার জন্য  গতকাল  রোববার সকালে নওগাঁ সদর হাসপাতালে অর্থোপেডিক বিভাগে ভর্তি  নেয়া হয় শরিফুলকে।
নির্যাতনে শিকার শরিফুল বলেন, কাজ করিয়ে নিবে বলে খালেক আমাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে টাকা চুরির অপবাদ দিয়ে চারজন মিলে কয়েক দফা মারপিট করে। খালেক বলে তুই আমার ২০ হাজার টাকা কখনো বলে ৫০ হাজার এবং সোনাদানা চুরি করেছিস। তার টাকা কবে হারিয়েছে সেটাও আমি জানি না বা চুরি করি নি।
শরিফুলের মা আয়েশা বলেন, মারপিটের কারণে আমার ছেলে রক্ত বমি করে। তাদেরকে আমি হাত-পা ধরেছি ছেলেকে ছেড়ে দেয়ার জন্য। তারপরও তারা নির্যাতন চালিয়েছে। প্রথম দিনে পুলিশকে জানানো হলেও পুলিশ আমার ছেলেকে উদ্ধার না করে চলে আসে। আমার ছেলেকে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।
কালিগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বাবলু বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে শরিফুলের হাত বাঁধা অবস্থায় দেখি। তার শরীরে নির্যাতনের চিহ্নি দেখা যাচ্ছিল। তাদেরকে বলার পর তারা হাতের বাঁধন খুলে দেয়। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় সেখানে পুলিশ গিয়েছিল এবং ফিরে এসেছে। আমি নিজে ডাক্তার নিয়ে এসে তার চিকিৎসা করিয়েছি। তবে গত শনিবার রাতে পুলিশ আবার গিয়ে ছেলেটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। তবে ছেলেটি চুরি করেছে কিনা এ বিষয়টি জানা নেই।
থানার এসআই (উপ-পরিদর্শক) শফিকুর রহমান বলেন, ওই এলাকায় একজন আসামিকে আটক করতে গিয়েছিলাম। বিষয়টি জানার পর ওসি স্যারকে জানিয়েছি। তবে ঘটনাস্থলে শুক্রবার আমি যাই নি। পরের দিন শনিবার শরিফুলের মাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসি।
রানীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত প্রধান আসামি আবদুুল খালেককে শনিবার আটক করা হয়েছে। শরিফুলের  মা আয়েশা বাদী হয়ে শিশু নির্যাতন আইনে খালেককে প্রধান আসামি করে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।  গতকাল রোববার তাকে আদালতের মাধ্যমে নওগাঁ জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। তবে তিনি পুলিশের দায়িত্বহীনতার বিষয়টিতে অস্বীকার করে বলেন, আমরা বিষয়টি জানার পরই ঘটনাস্থল থেকে ওই কিশোরকে উদ্ধার করে নিয়ে আসি এবং চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠাই।