নওগাঁয় অবাধে বিক্রি হচ্ছে অনুমোদনহীন মশার কয়েল ।। ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

আপডেট: জুলাই ৯, ২০১৭, ১:৪১ পূর্বাহ্ণ

ছবি: প্রতীকী

এমআর রকি, নওগাঁ


নওগাঁর বাজারে অনুমোদনহীন মশার কয়েল প্রকাশ্যে বিক্রি করলেও কোন রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। দ্রুত এই কয়েল বিক্রি বন্ধ করতে না পারলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
চিকিৎসকরা বলছেন, নি¤্নমানের কয়েল মানুষ দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে দূষিত ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টসহ কিডনি, লিভার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শহরসহ গ্রামের বিভিন্ন দোকানে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে অনুমোদনহীন ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর এসব মশার কয়েল। ওইসব কয়েলের বিষ ক্রিয়ায় বিকলাঙ্গ, ক্যান্সার, শ্বাসনালীর প্রদাহসহ দীর্ঘমেয়াদী জটিল রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। এমনকি গর্ভের শিশুর বিকলাঙ্গ হয়ে জন্ম হতে পারে। বাড়তি লাভের আশায় দোকানিরা ওইসব কয়েল বিক্রি করলেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না কর্তৃপক্ষ।
বাজারগুলোতে নি¤্নমানের কয়েলের ব্যবসা ছড়িয়ে পড়লেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি বা কোন মনিটরিং করা হচ্ছে না। অন্যদিকে এসব কয়েল কোম্পানিগুলো ভুয়া পিএইচপি নম্বর ও বিএসটিআই’র লোগো ব্যবহার করে আকর্ষণীয় মোড়কে এসব কয়েল বাজারে ছাড়াছে। বিএসটিআই’র নকল ব্রান্ডের ট্রেডমার্ক দিয়ে কয়েল উৎপাদন করে দেশিয় কয়েলের প্যাকেট ব্যবহার করে তা বাজারজাত করে আসছে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিদ্যমান বালাইনাশক অধ্যাদেশ- (পেস্টিসাইড অর্ডিন্যান্স ১৯৭১ ও পেস্টিসাইড রুলস ১৯৮৫) অনুসারে, মশার কয়েল উৎপাদন, বাজারজাত ও সংরক্ষণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। অধ্যাদেশ অনুযায়ী- অধিদফতরের অনুমোদন পাওয়ার পর পাবলিক হেলথ প্রোডাক্ট (পিএইচপি) নম্বর ও বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিয়েই সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে বালাইনাশক পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করতে হবে।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মশার কয়েলে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৩ মাত্রার ‘অ্যাকটিভ ইনটিগ্রেডিয়েন্ট’ ব্যবহার নির্ধারণ করেছে। এই মাত্রা শুধুমাত্র মশা তাড়াতে কার্যকর, মারতে নয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনুমোদনহীন এসব কয়েলে শুধু মশাই নয়, বিভিন্ন পোকামাকড়, তেলাপোকা এমনকি টিকটিকি পর্যন্ত মারা যায়।
শহরের তিব্বত মার্কেট, আল আমিন মার্কেট, ধর্মতলা রোডসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ‘নাইট রোজ, অতন্দ্র প্রহরী জাম্বো, অতন্দ্র প্রহরী মিনি, ফ্যামিলি, ওয়ান টেন, সান পাওয়ার, তুলসি পাতা, সাঝের তারা, বস ও রকেটসহ অনুমোদনহী কয়েলে বাজার সয়লাব।’
শহরের সুলতানপুরের বাসিন্দা সোহরাব বলেন, ‘মশা নয় মানুষ মারার কয়েল। স্বল্প দামের কয়েলের ধোয়াতে ঘর অন্ধকার হয়ে যায়। যেন দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। মশাও মরে, সঙ্গে তেলাপোকাও।’
শহরের তিব্বত মার্কেটের মেসার্স মাহমুদ হাসান ট্রেডার্সের স্বত্তাধীকারী মাহমুদ হাসান বলেন, ‘তিনি কয়েকটি কয়েলের ডিলার (ডিস্ট্রিবিউটর)। অনুমোদনহীন দেশিয় কয়েলের কারণে ব্যান্ডের কয়েল কম বিক্রি হচ্ছে। আর দিন দিন ব্যান্ডের কয়েলের চাহিদাও কমছে। আর দেশিয় কয়েল বাজারে বেশি বিক্রি হচ্ছে।’
প্রহরী কয়েলের বাজারজাতকারক মেসার্স আবদুুল হাই ট্রেডার্সের স্বত্তাধীকারী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘সবধরনের প্রক্রিয়া শেষে কয়েলটি বাজারজাত করা হচ্ছে। আমাদের কেমিকেল চায়না থেকে আমদানি করা হয়। কয়েলে কোন ধরনের মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হয় নি। তবে কতিপয় কিছু ব্যবসায়ীরা সুবিধা না পেয়ে এ গুজব ছড়াচ্ছেন।’
এটুজেড মশার কয়েলের ডিলার আবদুুল মজিদ বলেন, ‘আমাদের কয়েলের রেজিস্ট্র্রেশন আছে। ভ্যাট, ট্রাক্স দিয়ে এক কার্টুন (৬০ প্যাকেট) কয়েল উৎপাদন করতে দুই হাজার ২০ টাকা খরচ হয়। যেখানে অনুমোদনহীন মশার কয়েল বাজারে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৯২০ টাকা। আমরা তো লোকসান দিয়ে বাজারে কয়েল বিক্রি করতে পারবো না। আর তাদের কারণে আমরা প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বাজারে টিকতে পারছি না। এ ব্যাপারে বিএসটিআই প্রশাসনকে জানানো হলেও তারা কোন পদক্ষেপ নেয় নি।’
জানতে চাইলে নওগাঁ সিভিল সার্জন ডা. রওশন আরা খানম বলেন, ‘মশার কয়েল এমনিতেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। প্রতিটি কয়েল স্বাস্থের উপর প্রভাব ফেলবে। এটি ক্ষতিকর একটি দিক। আর অনুমোদনহীন মশার কয়েল তো বেশি ক্ষতিকর। অতিমাত্রায় রাসায়নিক কীটনাশক মিশ্রিত কয়েল মানুষ দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহার করলে শ্বাসকষ্ট, লিভার, কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ উপপরিচালক মনজিত কুমার মল্লিক বলেন, ‘কয়েল স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর। তবে যে লিকুইড আছে সেটার কোন সমস্যা নেই। কয়েলের ক্ষেত্রে কীটনাশকের বিষয়টি ঢাকার হেড অফিস দেখেন। তবে বাজারে অভিযান চালিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব অনুমোদনহীন নি¤্নমানের কয়েলের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’