নওগাঁয় কামারপট্টি টুং-টাং শব্দে মুখরিত

আপডেট: আগস্ট ২৫, ২০১৭, ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

এমআর রকি, নওগাঁ


ঈদুল আজহা উপলক্ষে ব্যস্ত সময় পার করছেন নওগাঁর কামারপট্টির কামাররা-সোনার দেশ

নওগাঁয় ঐতিহ্যবাহী কামার শিল্প নানা সঙ্কটে আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব, কারিগরদের মজুরী বৃদ্ধি, তৈরি পণ্যসামগ্রী বিক্রয় মূল্য কম, কয়লার মূল্য বৃদ্ধি, বিদেশ থেকে বড় বড় ব্যবসায়ীদের স্টীল সামগ্রী আমদানিসহ চরম আর্থিক সঙ্কট ও উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কম থাকায় বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে রাণীনগর উপজেলার কামার শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে।
ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে জেলার হাট-বাজারে কামার পট্টিতে দেশী প্রযুক্তির দা, কুরাল, বেকি, খুন্তা ও কাটারী বানাতে বেশ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে কামাররা। এলাকার বিভিন্ন জায়গায় ইতোমধ্যেই গ্রামের লোকজন গরু, মহিষ, ছাগল জবাই ও মাংস তৈরির কাজের জন্য কামারীদের কাছে প্রয়োজনীয় ধারালো দেশী তৈরি চাকু, বটি, কাটারি ও ছুরি তৈরির আগাম অর্ডার দেয়া শুরু করায় কামার পল্লী ও হাট-বাজার গুলো টুং-টাং শব্দে এখন মুখরিত। ঘুমাতে পারছে না কামার পাড়ার পাশের বাড়ির মানুষগুলো।
আধুনিকতার উৎকর্স, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে নানাবিধ সমস্যার কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে হাজার বছরের গ্রাম-বাংলার মানুষের প্রিয় এই কামার শিল্পটি। এক সময় রাণীনগর উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে প্রায় অর্ধশতাধিক কর্মকার পরিবার থাকলেও তাদের তৈরি পণ্যসামগ্রী প্রযুক্তির ছোঁয়ার কাছে টিকে থাকতে না পারায় বেশকিছু পরিবার তাদের পৈতৃক পেশা না পারছে ধরে রাখতে না পারছে বাঁচতে। কিছুটা বাধ্য হয়েই পরিবারের অভাব-অনটন ও চাহিদার তাগিদে লাভজনক পেশায় চলে যাচ্ছে। রানী নগর উপজেলার খট্টেশ্বর, রাজাপুর, ত্রীমোহনী, বেলঘড়িয়া, কাঞ্চনপুর নগরসহ বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ৩০টি পরিবারের কর্মকাররা তাদের পৈতৃক পেশা অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে হলেও চালিয়ে যাচ্ছে। যতটুকু লাভ হোকনা কেন কোন রকম দিন চললেই তারা বেজায় খুশি। অন্য পেশায় যেতে তারা নারাজ। রাণীনগর বাজার, ত্রিমহনীর হাট, কুবরাতলীর মোড়, রেলগেট, কুজাইল বাজার, বেতগাড়ী বাজার, আবাদপুকুর হাট, কাটরাশিন বাজার, লোহাচূড়া হাটসহ প্রতিটি হাট-বাজারে কোরবানী ঈদকে সামনে রেখে কামারপাড়ার কারিগররা সারা বছর অলস সময় কাটালেও বর্তমানে ঈদের কারণে রাতদিন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। এখানকার কামাররা তাদের নিপুন হাতে তৈরি বটি, ছুরি, কাটারি, দা, বেকি, কুঠার, খুন্তা ও লাঙ্গলের ফলাসহ বিভিন্ন ধরণের যাবতীয় প্রয়োজনীয় লৌহজাত দ্রব্য তৈরি করেন।
রাণীনগর উপজেলার খট্টেশ্বর গ্রামের সদয় কর্মকার ও রাজাপুর গ্রামের আসলাম কারিগর জানান, লোহা পিটিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করা আমার পেশা। বাপ-দাদার পৈতিক সূত্রে আমি এই পেশায় জড়িত। একটি মাঝারি ধরণের দা ও কাটারি তৈরি করে ওজন অনুযায়ী ৩শ ৮০টাকা থেকে ৪শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। সারাদিন হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে যে কয়টি জিনিস তৈরি করি তা বিক্রি করে খুব বেশি লাভ না হলেও পরিবার-পরিজন নিয়ে ডাল-ভাত খেয়ে বেচে থাকার স্বার্থে আদি এই পেশা আমি ধরে রেখেছি। তবে সারা বছর কাজ-কর্মের ব্যস্ততা তেমন না থাকলেও কোরবানী ঈদকে সামনে রেখে আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। সারা বছর এই রকম কাজ থাকলে ভালই হত।
ত্রীমোহনী গ্রামের নারায়ন চন্দ্র কর্মকার (৬৫) জানান, আমার বাপ-দাদার মূল পেশা ছিল এটা। তারা গত হওয়ার পর ওই সূত্রে ধরে আমার জীবনে এই পেশা ধরে রেখেছি। সাড়া দিন চাকু, বটি তৈরি করে যা আয় হয় তা দিয়েই পরিবার-পরিজন নিয়ে খেয়ে বাঁচি। কেন না এই পেশা ছেড়ে অন্য কোন ভাল পেশায় যাব এই রকম আর্থিক সংগতি আমার নেই। তবে সরকারি ভাবে এবং এনজিওর মাধ্যমে আমাদের রাণীনগরের কামাদেরকে সুদ মুক্ত ঋন দিলে পাইকারি মূল্যে উপকরণ কিনতে পারলে অবশ্যই এই দেশীয় কামার শিল্প পূর্বের মতো ঘুরে দাড়াবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ