নওগাঁয় ভুয়া বাবা-মা পরিচয়ে মুক্তিযোদ্ধা

আপডেট: জুলাই ২৯, ২০২১, ১২:৩৭ অপরাহ্ণ

নওগাঁ প্রতিনিধি:


নওগাঁ সদর উপজেলার ৩নং বক্তারপুর ইউনিয়নের মোক্তারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য নজরুল ইসলাম (৭৪)। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি বাবার পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। শিক্ষা ও কর্ম জীবনের সকল কাগজপত্রে চাচাকে বাবা ও চাচিকে মা বানিয়ে সুবিধা ভোগ করছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ প্রয়োজনে তিনি বাবাকে বাবা আবার কখনো চাচাকে বাবা বানিয়ে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছেন। তার মুক্তিযোদ্ধা হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী।
জানা গেছে, মৃত মনির উদ্দীনের ঔরসজাত সন্তান নজরুল ইসলাম। তার মায়ের নাম করপুল। মনির উদ্দীন ছিলেন একজন কৃষক। মনির উদ্দীনের ছোট ভাই ইয়াকুব হোসেন। তিনি রেলওয়েতে চাকরি করতেন। তার কোনো সন্তান ছিল না। এ সুবাদে নজরুল ইসলাম তার চাচার কাছে থেকেই বড় হতে থাকেন। এরই মধ্যে ইয়াকুব হোসেনের ঘরেও জন্ম নেয় দুই সন্তান আব্দুল হামিদ ও আব্দুল হালিম। নজরুল ইসলাম তার শিক্ষা জীবনের মেট্টিক পরীক্ষায় বাবার নামের জায়গায় চাচার নাম ইয়াকুব হোসেন এবং মায়ের নামের জায়গায় চাচি হামিদা খাতুনের নাম লিখা হয়। সেই থেকে তার শিক্ষা ও কর্ম জীবনের সকল কাগজপত্রে বাবার নামের জায়গায় চাচাকে বাবা ও চাচীকে মা বানিয়ে রাখা হয়েছে। নজরুল ইসলাম একজন সরকারি চাকরিজীবীর ছেলে হিসেবে বেড়ে উঠেন। একসময় সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি চাকরি থেকে অবসরে এসেছেন।
নজরুল ইসলাম বক্তারপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ১২/০১/১৯৪৭ জন্ম তারিখ দিয়ে ১৬/৯/২০১৩ তারিখে ইস্যুকৃত ইউপি চেয়ারম্যান নাজমুল হুদা জুয়েল স্বাক্ষরিত একটি জন্মনিবন্ধন সনদপত্র গ্রহণ করেন। যেখানে তার আসল বাবা মৃত মনির উদ্দীন এবং মা করপুল বেওয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আবার একই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ৩০/১০/১৯৪৭ জন্ম তারিখ দিয়ে ১৯/১১/২০১৩ তারিখে ইস্যুকৃত একই চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত একটি জন্মনিবন্ধন সনদপত্র গ্রহণ করেন। যেখানে তার বাবা ইয়াকুব হোসেন এবং মা হামিদা খাতুন এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তিতে বিষয়টি জানাজানি হলে চেয়ারম্যান নাজমুল হুদা জুয়েল এ দুটি জন্মনিবন্ধন বাতিল করে ১/৪/১৫ তারিখে প্রত্যয়ণপত্র দেন। ৯/৩/২০২১ তারিখে নজরুল ইসলাম এর বাবা মৃত মনির উদ্দীন এবং মা মৃত করপুল উল্লেখ করে বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান মোরশেদুল আলম প্রত্যয়ণপত্র দেন। যেখানে বলা হয়েছে ‘নজরুল ইসলাম তার চাচা মৃত ইয়াকুব হোসেন কে পিতা ও চাচি মৃত হামিদা খাতুন কে মাতা মর্মে যে সমস্ত কাগজপত্র ব্যবহার করছেন সেগুলো সম্পূর্ণ ভূয়া/অবৈধ।’
স্থানীয় মোক্তারপাড়া গ্রামের মৃত মোবারক হোসেনের ছেলে শিক্ষক আতাউর রহমান, মৃত এছাহাক আলী মন্ডলের ছেলে নজরুল ইসলাম ও সাবেক ইউপি মেম্বার শফিকুল ইসলাম ফাইন সহ কয়েকজন বলেন, নজরুল ইসলামকে তার চাচা পালক ছেলে হিসেবে বড় করেছেন। এখন তার সকল কাগজপত্রে চাচাকে বাবা হিসেবে নাম রয়েছে। তিনি ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে সেনাবাহিনীতে চাকরিরত অবস্থায় ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় ৬ মাস পর তিনি দেশে আসেন। তাহলে তিনি কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা হলেন। অথচ তিনি মুক্তিযোদ্ধার সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন।
তারা আরো অভিযোগ করে বলেন, নজরুল ইসলাম এলাকায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। যখন যেখানে যে বাবার নামে সুবিধা নেয়া দরকার সেখানে সেই বাবার নাম দিয়ে চেষ্টা করেন। এর একটা সমাধান হওয়া দরকার বলে মনে করছেন তারা।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত নজরুল ইসলাম বলেন, ১৯৯৩ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকার থেকে সুযোগ সুবিধা ভোগ করছি। আমার সকল কাগজপত্রে পিতা হিসেবে ইয়াকুব হোসেন (চাচা) এর নাম আছে। আর যে দুটো জন্মনিবন্ধন ছিল ইউপি চেয়ারম্যান প্রত্যয়ণপত্র দিয়ে তা বাতিল করেছেন। প্রকৃতপক্ষে মনির উদ্দীন বাবা হলেও কাগজপত্রে বাবার জায়গায় চাচার নাম রয়েছে।
মৃত ইয়াকুব হোসেন এর ছোট ছেলে আব্দুল হালিম বলেন, নজরুল ইসলাম আমার বড় আব্বুর ছেলে (বাবার বড় ভাই)। আমরা জন্মের আগে বাবা তাকে কাছে রেখে মানুষ করেছেন। তার ম্যাট্টিকের সময় বাবার নামের জায়গায় আমার বাবার নাম ও মায়ের নাম লিখে দেয়। তখন থেকেই তার কাগজপত্রে আমার বাবা-মার নাম রয়েছে।